ব্রেকফাস্টের পর বারান্দায় বসে চুরুট টানতে-টানতে কর্নেল বললেন,–আচ্ছা নাখুলাল। তোমার খ্রিস্টান নাম কী?
চৌকিদার সবিনয়ে বলল,–যোশেফ নাখুলাল সার!
–তোমাদের ফাদার স্যামুয়েল কি এখন বস্তিতে স্কুল চালাচ্ছেন?
না সার! ফাদার স্কুলের স্যামুয়েল কি এখন বস্তিতে স্কুল চালাচ্ছেন?
না সার! ফাদার স্কুলের ভার দিয়েছেন আমার ভাইপো ফিলিপকে। ফিলিপসুরেন ওর নাম। দুমকা মিশন স্কুল থেকে পাশ করে এসেছে। বলে চৌকিদার কণ্ঠস্বর চাপা করল : সুরেন মাস্টারমশাইয়ের ছেলে দীপুর বন্ধু ছিল সার! দীপু যেদিন জঙ্গলে হারিয়ে যায়, সুরেনই তো সাহস করে বাবুদের ছেলেদের ডেকে তাকে খুঁজতে ঢুকেছিল।
–আচ্ছা নাখুলাল, ওদের যে ফুটবলটা জঙ্গলে হারিয়ে গিয়েছিল, সেটা কি খুঁজে পেয়েছিল ওরা?
নাখুলাল বুকে ক্রস এঁকে ভয়পাওয়া মুখে বলল,সেদিন বলটার দিকে কারও মন ছিল না। পরদিন সকালে সুরেন বলটা দেখতে পেয়েছিল। বলটা কোনও জানোয়ার ছিঁড়ে ফালাফালা করে রেখেছিল। ব্লাডারও ছিঁড়ে ফেলেছিল। সুরেনকে আপনি জিগ্যেস করবেন।
–করব। তোমাদের বস্তিটার কী নাম যেন?
–রংলিডিহি। আপনি দেখে থাকবেন, বস্তির মাটির রং একেবারে লাল। বুড়োদের কাছে শুনেছি, রংলিডিহিও জঙ্গলের মধ্যে ছিল। আর এই জঙ্গল ছিল একেবারে রেললাইন পর্যন্ত। এখন ওদিকটা ফাঁকা।
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–নাখুলাল! তুমি আমাদের খাওয়ার জন্য বাজার করে আনো। বাজার তো সেই রায়গড়ে। তুমি কি পায়ে হেঁটে যাবে?
–না সার! সাইকেল আছে। বাংলোর পিছনে আমার থাকার ঘর। সেখানে আছে। আপনারা আসবেন শুনে আমি সাইকেল এনে রেখেছি।
কর্নেলের কাছে টাকা নিয়ে যোশেফ নাখুলাল সাইকেলে থলে ঝুলিয়ে ঢালু রাস্তায় নেমে গেল এবং একটু পরে গাছপালার আড়ালে অদৃশ্য হল।
বাংলোটা উঁচুতে বলে শীতের হাওয়া এসে হুলস্থূল বাধাচ্ছে। আমি ঘরে ঢুকে বিছানায় বসে পড়লুম। নতুন তৈরি ঘরে পেন্ট আর চুনকামের গন্ধ পাচ্ছিলুম। পশ্চিমের জানালা খোলা ছিল। চোখে পড়ল ঢেউখেলানো অনাবাদি, কোথাও আবাদি প্রান্তর। তার শেষে নীল পাহাড়ের উঁচু-নিচু শিখর। বুঝলুম, ওদিকটা বিহার এবং ওই পাহাড় ছোটনাগপুর রেঞ্জের একটা অংশ।
কর্নেল ঘরে ঢুকে বললেন,রায়গড়-রাজাদের পুরনো দুর্গের ধ্বংসাবশেষ দেখতে হলে পশ্চিম-উত্তর কোনে তাকাও। যে নদীটা পেরিয়ে এলুম, ওখানে তা জলে ভরা। কারণ দুর্গের নিচে দহ ছিল একসময়। এখন দহ বুজে গেছে। তবে জলের স্রোত সাংঘাতিক তীব্র।
বললুম,–এখনও কুয়াশা আছে। আপনার বাইনোকুলারটা দিন।
বাইনোকুলার অ্যাডজাস্ট করে নিতেই চোখে পড়ল, অনেকখানি জায়গা জুড়ে ধ্বংস্তূপ ছড়িয়ে আছে। এবং একটা অংশ হাড়মটমটিয়ার জঙ্গল পর্যন্ত এগিয়ে আছে।
হঠাৎ দেখলুম, ধ্বংসস্তূপের আড়াল থেকে দুজন লোক বেরিয়ে খোলা জায়গায় দাঁড়াল। দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার। কিন্তু কর্নেলের বাইনোকুলারে তাদের অবয়ব স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল। একজনের পরনে প্যান্ট-শার্ট-জ্যাকেট ও মাথায় টুপি। তার কাঁধে একটা কিটব্যাগ ঝুলছে। অন্যজন বেঁটে এবং মোটাসোটা। তার পরনে প্যান্ট, গায়ে সোয়েটার আর মাথায় মাফলার জড়ানো। দুজনের মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। তারা অঙ্গভঙ্গি করে সম্ভবত কথা বলছে।
কর্নেলকে বললুম কথাটা। অমনি তিনি বাইনোকুলার প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে দেখতে থাকলেন। তারপর বললেন, কী আশ্চর্য! পুরাতত্ত্ববিদ ডঃ দেবব্রত চট্টরাজ আর কৃষ্ণকান্ত অধিকারী ওখানে কী করছেন?
কথাটা শুনে চমকে উঠেছিলুম। বললুম,–দুজনেই জঙ্গলে ঢুকে গেলেন।
–যাকগে। এখন এ নিয়ে মাথাব্যথার মানে হয় না। ট্রেনজার্নির ধকল সামলাতে তুমি গড়িয়ে নাও। নাখুলাল ফিরে এলে স্নান করে ফ্রেশ হওয়া যাবে।
নাখুলাল ফিরল ঘণ্টাদেড়েক পরে। সে বলল,–সুরেনকে আসতে বলেছি কর্নেলসায়েব!
কর্নেল বললেন, ঠিক আছে। তুমি আমাকে আরেক পেয়ালা কফি খাইয়ে দাও।
নাখুলাল হাসল,জানি সার! রেঞ্জারসায়েব বলেছেন, আপনি হরঘড়ি কফি খান।
–এখানে স্নানের জলের ব্যবস্থা আছে তো?
–আছে সার! বাংলোর পিছনে নিচে একটা কুয়ো আছে। কুয়োর মুখ ঢাকা। ওই দেখুন, টিউবেল। টিউবেলের নল কুয়োর মধ্যে ঢোকানো আছে। আমি জল তুলে দেব। এক বালতি জল গরম করে দেব।
বলে সে বাংলোর পিছনদিকে কিচেনে চলে গেল। তারপর দশমিনিটের মধ্যেই একপট কফি এনে দিল। অনিচ্ছাসত্ত্বেও কর্নেলের কথায় কফি পান করতে হল। কর্নেলের বরাবর ওই এক কথা : কফি নার্ভকে চাঙ্গা করে।
কফি খেয়ে আমি পোশাক বদলে বিছানায় গড়িয়ে পড়লুম। কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বাংলোর পিছনে গেলেন। ভাবলুম, হাড়টমটিয়া নামক অদ্ভুত এবং ভয়ঙ্কর প্রাণীটিকে বাইনোকুলারে আবার খুঁজতে গেলেন। চৌকিদার প্রাণীটাকে দেখে ভালুক ভেবেছিল। কিন্তু আমি প্রাণীটাকে না দেখতে পেলেও কোনও হাড়মটমট-করা শব্দ শুনিনি। এদিকে কর্নেল গম্ভীরমুখে বলছিলেন, প্রাণীটা ভালুকের মতো দেখতে হলেও ভালুক নয় এবং ওটাই হয়তো সেই হাড়মটমটিয়া! সে নাকি ওত পেতে আমাদের কথা শুনতে এসেছিল! কী অদ্ভুতুড়ে ব্যাপার!
এই দিনদুপুরে কথাগুলো ভাবতে-ভাবতে গা ছমছম করে উঠল! ঘুমের রেশ ছিঁড়ে গেল। কিছুক্ষণ আগে পুরাতত্ত্ববিদ ডঃ দেবব্রত আর বিখ্যাত ব্যবসায়ী কৃষ্ণকান্ত অধিকারীকে দুর্গের ধ্বংসস্তূপে দেখার কথাও মনে পড়ল। ওঁদের আচরণও অদ্ভুত।
