কর্নেল বললেন, আপনি নিশ্চয় গুলি করেননি? ওঁর রাইফেলটাও তো নিয়ে এসেছেন দেখছি।
দত্তসায়েব শ্বাস টেনে বললেন, আমার গায়ে ধাক্কা লেগেছিল। টর্চ আর রাইফেল নিচে পড়ে গিয়েছিল তক্ষুনি। ওঃ! ও হো হো হো! অমল!
তারপর? তারপর? আমি দম-আটকানো গলায় প্রশ্ন করলুম।
মিঃ দত্ত বললেন, তারপর কীভাবে যে পালিয়ে এসেছি আমিই জানি। এই দেখুন, কত জায়গায় ছড়ে গেছে। আর এই দেখুন, কত রক্ত। অমলের রক্ত! ও হো হো হো!
কর্নেল একটু ভেবে নিয়ে বললেন, বড্ড দেরি হয়ে গেছে। এতক্ষণে নিশ্চয় বাঘটা শিকার নিয়ে সরে পড়েছে। সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া কোনও উপায় নেই…
বাকি রাত আর ঘুমোনো গেল না। পাশের ঘরে দত্তসায়েব সমানে বিড়বিড় করে শোকপ্রকাশ করছেন শোনা যাচ্ছিল। কর্নেল ও আমি ফায়ারপ্লেসের কাছে বসে রইলুম। কর্নেলবুড়ো একেবারে চুপচাপ। কোনও প্রশ্ন করেও জবাব পেলুম না। অভ্যাসমতো দাড়ি বা টাকে হাত বুলোচ্ছেন, কখনও চোখ বুজে বুকে ক্রস আঁকছেন।
জঙ্গল ও পাহাড় জুড়ে ঘন কুয়াশা। রোদ বাড়লে সেটা কাটল। তখন কর্নেল আমাকে নিয়ে বেরুলেন। দত্তসায়েবকে দেখলুম লনে রোদে বসে আছেন। হাতে রাইফেল। হিংস্র চেহারা। লাল চোখ। কর্নেল ডাকলেন, আসুন মিঃ দত্ত। দেখি, আপনার বন্ধুর ডেডবডি খুঁজে পাই নাকি।
দত্তসায়েব উঠলেন। ওই শয়তানটাকে খতম না করে আর আমি কলকাতা ফিরছি না। এই আমার প্রতিজ্ঞা।
যেতে যেতে কর্নেল বললেন, প্রথমে আমাদের মাচানের ওখানে যাওয়াই উচিত।
মিঃ দত্ত শুধু বললেন, হুঁ!
বাংলো থেকে ঝোপজঙ্গলে ভরা ঢাল বেয়ে নেমে আমরা ছোট্ট একটা সোঁতার ধারে পেঁৗছলুম, যেটা একটু দূরে ঝরনা থেকে বয়ে এসেছে। পাথরের ওপর দিয়ে ঝিরঝিরে স্বচ্ছ জল বইছে। ধারে ধারে কিছুটা যাওয়ার পর মিঃ দত্ত বললেন, ওই যে ওখানে।
চারপাশে ঘন গাছপালা, মধ্যিখানে এক টুকরো ফাঁকা ঘাসজমি। একটা বাচ্চা মোষ মনের সুখে এখন ঘাস খাচ্ছে। বুঝলুম, ওটাই টোপ। জমিটায় পৌঁছেই আমরা থমকে দাঁড়ালুম। মাচানের ঠিক নিচেই একটা ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ পড়ে রয়েছে। তারপর বিকট চিৎকার করে মিঃ দত্ত ছুটে গিয়ে মৃতদেহটার কাছে হাঁটু মুড়ে বসলেন এবং রাতের মতোই বুকফাটা কান্না জুড়ে দিলেন।
কর্নেল ও আমি এগিয়ে গেলুম। শিকারি মিঃ সেনের গলায় গভীর ক্ষতচিহ্ন এবং বুকে ওপরটা তীক্ষ্ণ নখের আঘাতে ফালাফালা। পুরু পুলওভার ফেঁড়েফুঁড়ে গেছে। জমাট কালচে রক্তের ছোপ সবখানে। কর্নেল মুখ তুলে মাচানের দিকে তাকালেন। তারপর বেমক্কা গাছে চড়তে শুরু করলেন। গাছটার গুড়ি ও ডালে রক্তের ছোপ দেখতে পাচ্ছিলুম।
একটু পরে কর্নেল মাচান থেকে নেমে এসে বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন মিঃ দত্ত। বাঘটা ওঁকে আচমকা মাচানের ওপরেই আক্রমণ করেছিল। উনি আত্মরক্ষার ফুরসত পাননি। তো ইয়ে ডেডবডিটা……
দত্তসায়েব শান্তভাবে বললেন, চৌকিদারকে বলেছি কজন লোক ডেকে আনতে। জিপে করে কলকাতা নিয়ে যাব। কিন্তু জানি না, অমলের স্ত্রীর সামনে দাঁড়াব কোন মুখে। ওঃ!
কর্নেল অন্যমনস্কভাবে মাচানের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ ঘুরে বললেন, দেখুন মিঃ দত্ত, আমার মনে হচ্ছে, আপনার বন্ধু মিঃ সেনকে যে বাঘটা মেরে ফেলেছে, সেটা মানুষখেকোটা নয়।
মিঃ দত্ত ভুরু কুঁচকে বললেন, আপনি কি শিকারি? কীভাবে বুঝলেন যে মানুষখেকোটা নয়? মানুষখেকো না হলে ওভাবে কোনও বাঘ চুপিচুপি গাছে উঠে শিকারির ওপর হামলা করে না।
কর্নেল বললেন, তা ঠিক। তবে এ-জঙ্গলে আরও বাঘ থাকাও তো সম্ভব।
ধমকের সুরে দত্তসায়েব বললেন, যা জানেন না, তা নিয়ে বাজে বকবেন না।
কর্নেল ধমক খেয়ে কাঁচুমাচু মুখে সরে এলেন। চলো জয়ন্ত, ডেডবডি তো পাওয়া গেছে। আমরা নিজের কাজে যাই।
ঝরনার ধারে এসে বললুম, লোকটা অভদ্র। গোঁয়ার। একটা হামবাগ!
কর্নেল হেসে বললেন, শিকারিদের একটু রাগ হওয়া স্বাভাবিক। যাক গে, জয়ন্ত! তুমি বাংলোয় গিয়ে বিশ্রাম করো গে! এ-বুড়োর পিছনে ছোটাছুটি করা তোমার পোষায় না জানি।
সে আর বলতে? কিন্তু আপনি যাবেনটা কোথায়?
আপাতত ক্যামেরাটা নিয়ে আসি।বলে কর্নেল হনহন করে এগিয়ে গেলেন। আমি বাংলোয় ফিরলুম।….
কর্নেল ফিরলেন একেবারে দুপুর গড়িয়ে। তারপর খেয়েদেয়ে ফিল্ম ডেভলপ করতে বাথরুমে ঢুকলেন। ওটাই ওঁর ডার্করুম। রাতে ঘুম হয়নি। তাই আমি কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লুম। সেই ঘুম ভাঙল কর্নেলের ডাকাডাকিতে। জয়ন্ত জয়ন্ত! শিগগির সব গুছিয়ে নাও। আমরা এক্ষুনি রওনা দেব। জিপ এসে গেছে।
বললুম, সে কী! অরণ্যপিপাসা এরই মধ্যে মিটে গেল? না কি মানুষখেকো বাঘের আতঙ্কে? আর জিপ কোথায় পেলেন? আমরা এই অবেলায় যাবই বা কোন চুলোয়?
বুড়ো ঘুঘু রহস্যময় হেসে বললেন, ওয়েট, ওয়েট ডার্লিং। সব প্রশ্নের জবাবে আপাতত আমার রাতের ফসল তোমাকে উপহার দিতে চাই। নাও।
হাত বাড়িয়ে যা পেলুম, তা একটা ছোট্ট ফটোগ্রাফ। কিন্তু দেখামাত্র চমকে উঠলুম। এ! কী এ যে দেখছি মিঃ দত্ত হাঁটু দুমড়ে পাথরের খাঁজে হাত পুরে কী একটা করছেন! অবাক হয়ে বললুম, এর মানে? কাল রাতে তো ওঁরা দুজনে মাচানে ছিলেন?—মানে মিঃ দত্ত এবং মিঃ সেন! অথচ মিঃ দত্ত দেখছি একা এখানে কী যেন করছেন।
কর্নেল বিদঘুটে ভঙ্গিতে ফের হাসলেন। রেডি হয়ে নাও ঝটপট। তোমায় যা দেখাব বলেছিলুম, তা দেখালুম। বাকিটা প্রতাপগড় টাউনশিপে গিয়ে দেখাব।
