ঠিক বলেছ ডার্লিং! বুড়ো সাদা দাড়ি খামচে ধরে হাসলেন। তারপর অভ্যাসমতো টাকে সেই হাতটা বুলিয়ে কী একটা ফেলে দিলেন। দেখলুম লাল রঙের একটা পোকা, অনেক সময় টাকে মাকড়সার জাল বা পাখির বিষ্ঠাও দেখেছি। বুড়ো পোকাটার গতিবিধিতে নজর রেখে বললেন, বাঘের ছবিই দেখাব। তবে এটা যে সে বাঘ নয়, সেই কুখ্যাত মানুষখেকো বাঘ! সরকার যাকে মারার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছে।
বিরক্ত হয়ে বললুম, ধরুন তাই না হয় হল। মানুষখেকো বাঘটার ছবি আপনার ক্যামেরার সামনে এসে হাজির হবে, তাহলে ওই শিকারি ভদ্রলোকদের বললেন না কেন? ওঁরা তো বাঘটাকে। মারার জন্য হন্যে হচ্ছেন। আজ বিকেলে আপনার সামনেই ওঁরা দুজনে বেরিয়ে গেলেন। কোথায় মোষের বাচ্চা বেঁধে রেখে গাছের ওপর মাচান করে বসে থাকবেন সারা রাত। খামোকা ওঁরা কষ্ট পাবেন ঠাণ্ডায়!
আমার কথার জবাব দেবার জন্যে ঠোঁট ফাঁক করেছেন, এমন সময় চৌকিদার দরজায় উঁকি মেরে একটু কেশে বলল, হুজুর কর্নেলসাব! খানা তৈয়ার হ্যায়। হুকুম হোগা তো আভি লাবে গা।
জরুর। বলে হুজুর কর্নেলসাব অর্থাৎ আমার বৃদ্ধ বন্ধু কর্নেল নীলাদ্রি সরকার ওরফে বুড়ো ঘুঘু অভ্যাসমতো বুকে ক্রস এঁকে যথার্থ ধার্মিকের মতো খাদ্য গ্রহণে প্রস্তুত হলেন।
বাংলোটা একেবারে জঙ্গলের মধ্যে। তাই সতর্কতার জন্য বারান্দা জুড়ে গ্রিল এবং এই শীতে গোটাটা রেলে ঢাকা রয়েছে। বারান্দার একদিকে কিচেন। চৌকিদার কিচেনের সামনে খাটিয়া পেতে ঘুমোয়। সম্প্রতি মানুষখেকো বাঘের উপদ্রব হওয়াতে সে আরও সতর্কতার জন্য পাশে একটা টর্চ আর বল্লমও রাখে। কর্নেলবুড়ো মানুষখেকোর ভয় তুচ্ছ করে এত রাত অব্দি জঙ্গলে ঘোরেন এবং নিরাপদে ফিরে আসেন। বারান্দায় গ্রিলের একটা অংশ খুলে সে হুজুর কর্নেলসাবকে ভেতরে আসতে দেয় এবং সঙ্গে সঙ্গে ফের সেই ফাঁকটা অর্থাৎ দরজা বন্ধ করে তালা এঁটে সন্দিগ্ধদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। আমার ধারণা, সে ভূত দেখছে, না মানুষ, তার দৃষ্টিতে এরকম একটা চাঞ্চল্য থাকে। কর্নেলের ওপর তার ভক্তি ক্রমশ বেড়ে গেছে।
জেলিমাখানো মোটা মোটা চাপাটির সঙ্গে বুনো মুরগির মাংস বেশ জমিয়ে খাওয়া গেল। খেতে খেতে কর্নেল আমার সেই কথাটার জবাব দিলেন। ঠিকই জয়ন্ত! মিঃ সেন এবং মিঃ দত্তকে আমার বলা উচিত ছিল, আপনারা ঝরনার ভাটিতে টোপ না বেঁধে আরও একটু উজানে এসে বাঁধুন। কারণ আমার ধারণা, বাঘটা ওখানেই টিলার ওপর একটা গুহায় থাকে। তার পায়ের দাগও খুঁটিয়ে দেখেছি। জঙ্গলবিদ্যায় আমারও কিঞ্চিৎ জ্ঞানগম্যি আছে।
তাহলে বললেন না কেন?
কর্নেল হাসলেন। যেচে পড়ে বলাটা সঙ্গত মনে করিনি। তাছাড়া লক্ষ্য করেছ নিশ্চয়, বিশেষ করে মিঃ দত্ত কেমন যেন অভদ্র প্রকৃতির লোক। এসেই আমাদের এখানে দেখে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছিলেন না? মিঃ সেনও কেমন আমাদের শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন, দু-দুটো মানুষ-টোপ থাকতে আর মোষের বাচ্চা কিনতে খামোকা পয়সা খরচ কেন? ব্যাপারটা আমার গায়ে লেগেছে। জয়ন্ত!
ওঁর দুঃখ দেখে ঠাট্টা করে বললুম, আহা! ওঁরা তো কর্নেল নীলাদ্রি সরকার নামক প্রখ্যাত বুড়ো ঘুঘুকে চেনেন না! চিনলে নিশ্চয় সমীহ করে কথা বলতেন। তাছাড়া, যে জঙ্গলে মানুষখেকো বাঘ রয়েছে, সেখানে যারা বেড়াতে এসেছে শখের বশে, তারা নিছক টোপ হতেই এসেছে বৈকি!
কর্নেল কিন্তু হাসলেন না। গোমড়ামুখে গ্লাসের কনকনে ঠাণ্ডা জলটা পুরো গিলে ফেললেন।
শেষ রাতে কী একটা গণ্ডগোলের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। জেগে কয়েক সেকেন্ড ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম। লণ্ঠনের দম বাড়িয়ে কর্নেল ব্যস্তভাবে ডাকছেন, জয়ন্ত! জয়ন্ত! বাইরে চৌকিদার দুর্বোধ্য ভাষায় চেঁচামেচি করছে। আর কেউ হাউমাউ করে কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছে।
কম্বল ছেড়ে বেরুনো সহজ কথা নয়। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সহজাত বোধ কাজ করে। হুড়মুড় করে উঠে পড়লুম। তারপর দেখি, কর্নেল লণ্ঠন হাতে এগিয়ে দরজা খুললেন। তার পিছন-পিছন দৌড়ে গেলুম। বারান্দায় বেরিয়ে এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য চোখে পড়ল। মেঝেয় পা ছড়িয়ে বসে আছেন সেই শিকারি মিঃ দত্ত এবং দু-হাতে মুখ ঢেকে ছেলেমানুষের মতো কাঁদছেন। তাঁর পোশাকে চাপ-চাপ টাটকা রক্ত লেগে রয়েছে। পাশে দুটো রাইফেল পড়ে রয়েছে। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে চৌকিদার বেচারা জড়ানো গলায় ক্রমাগত কী বলছে, বোঝা যাচ্ছে না।
কর্নেল মিঃ দত্তের কাধে হাত রেখে ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, মিঃ দত্ত শান্ত হোন, বলুন কী হয়েছে। কর্নেলের কথা শুনে মিঃ দত্ত একটু শান্ত হলেন। তারপর ফ্যাচ করে নাক ঝেড়ে বললেন, ও হো হো হো! আমি কী করব? কী করব আমি? আমার সারাজীবনের সঙ্গী আমার প্রাণের বন্ধু। অমল……ও!
কর্নেল বললেন, প্লিজ মিঃ দত্ত! শান্ত হোন, শান্ত হোন। কী হয়েছে বলুন তো?
মেজাজি মিঃ দত্ত বিকৃত মুখে বললেন, বুঝতে পারছেন না মশাই কী হয়েছে? অমলকে বাঘে মেরে ফেলেছে। ও হো হো! কেমন করে ওর স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের সামনে এ-মুখ দেখাব?
এটাই অনুমান করেছি ততক্ষণে। কর্নেল ওঁর কাঁধ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, সর্বনাশ! মিঃ সেনকে মানুষখেকো বাঘটা মেরে ফেলেছে! কিন্তু কীভাবে ব্যাপারটা ঘটল বলুন। তো মিঃ দত্ত? আপনারা কি একই মাচানে ছিলেন?
দত্ত সাহেব রুমালে চোখ নাক মুছে বললেন, একই মাচানে তো ছিলুম। কখন বাঘটা চুপিচুপি গাছে উঠেছিল টের পাইনি। আমার একটু তন্দ্রামতো এসেছিল। হঠাৎ অমলের আর্তনাদে জেগে গেলুম। টর্চ জ্বালতেই দেখি, ওঃ! সে এক বীভৎস দৃশ্য। বাঘটা অমলের গলা কামড়ে ধরে ঝাঁপ দিল।
