ফরেস্ট বাংলোয় আরাম করে বসে কর্নেল বললেন, জয়ন্ত, সবার সামনে আমাকে বুড়ো ঘুঘু বলাটা তোমার বদ অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। না—আমি রাগ করিনি। কিন্তু কথাটা তোমার তলিয়ে। দেখা উচিত। তুমি কি এলিয়ট রোডে আমার ফ্ল্যাটের নতুন নেমপ্লেটটা লক্ষ্য করোনি?
একটু হেসে বললুম, করেছি। লেখা আছে : কর্নেল নীলাদ্রি সরকার, প্রকৃতিবিদ। বুড়ো-ঘুঘুর বাসা বলে পরিচিত ফ্ল্যাটের মধ্যে এখন কাচের জার-ভর্তি। তাতে প্রজাপতি-পোকামাকড়েরা ডিম পাড়ছে। হরেক পাখপাখালির মমি সাজানো রয়েছে। দুর্লভ এবং বিরল প্রজাতির নমুনা। কিন্ত হে বৃদ্ধ, চেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। তাছাড়া অভ্যাস যায় না মলে। দশ কিলোমিটার দূরে লিটনগঞ্জে হেভিওয়াটার প্ল্যান্টের রহস্যময় দুর্ঘটনা আর ভারুণ্ডি ফরেস্ট বাংলোয় এক প্রাক্তন গোয়েন্দার অবস্থিতি কি নেহাত কাকতালীয় ব্যাপার? দুয়ের মধ্যে কোনও যোগাযোগ নেই? আমি মোটেও বিশ্বাস করি না।
কর্নেল জোরে মাথা দুলিয়ে বললেন, একেবারে কাকতালীয়। আমাকে সরকার ওসব ব্যাপারে কোনও অনুরোধ করেনি। আমি এসেছি, উড-ডাকের খবর পেয়ে। খবরের কাগজের লোক হলেও ওসব খবরে তোমার মাথাব্যথা থাকে না। নইলে সম্প্রতি ভারুণ্ডির জঙ্গলে উড-ডাকের আবির্ভাবের খবর তোমার চোখে পড়ত। যাক গে, এবার খাওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। তোমার নিশ্চয় খুব খিদে পেছেছে। আমি চৌকিদারকে দেখি। ততক্ষণ তুমি ফায়ারপ্লেসের অগ্নিকুণ্ডটার দায়িত্ব নাও। কাঠ গুঁজে দিতে ভুলো না।
উনি বেরিয়ে গেলেন। তারপর আমি বসে আছি তো আছি। আর ওঁর পাত্তা নেই। বাংলো গোরস্থানের মতো স্তব্ধ। একা বসে থাকতে গা ছমছম করছে। প্রায় দুঘন্টা পরে কর্নেল ফিরলেন। বললুম, এত দেরি যে?
কর্নেল বললেন, রাতের কাজটুকুও সেরে এলুম। আশা করি, আমার সে অত্যদ্ভুত ক্যামেরার কথা তুমি ভোলোনি।
হ্যাঁ, অত্যদ্ভুত ক্যামেরাই বটে। প্রতাপগড় জঙ্গলে ওটা পেতে রাখতে দেখেছিলুম সেবার। জন্তুদের জল খেতে যাওয়ার পথে গাছের ডালে বেঁধে রেখেছিলেন। একটা তার নিচে মাটিতে পোঁতা ছিল। ক্যামেরার লেন্সের সামনে দিয়ে পঞ্চাশ গজ অব্দি মাটিতে কেউ হেঁটে গেলেই অতিসূক্ষ্ম ইলেকট্রনিক সিস্টেমে সেই স্পন্দন ধরা পড়বে এবং আপনাআপনি শাটারটা ক্লিক করবে। ফ্লাশ বাল্ব জ্বলবে এবং ছবি উঠে যাবে। কর্নেলের মতে, জন্তুদের স্বাভাবিক চেহারার ছবি এভাবেই তোলা সহজ।
বললুম, কোথায় ক্যামেরা পেতে এলেন।
চাপা হেসে কর্নেল বললেন, ডঃ গিন্তির কুমড়োখেতে। কারণ, তখন ওখানে কয়েকটি অদ্ভুত পায়ের ছাপ দেখছিলুম। ওটা কী প্রাণী দেখা দরকার।
বুড়োর বাতিকের কোনও তুলনা নেই। ও নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। এখন একমাত্র ভাবনা, সকাল হলেই আমাকে কেটে পড়তে হবে। লিটনগঞ্জ হেভিওয়াটার প্লান্টের রিপোর্ট কীভাবে লিখব, তাই ভাবতে থাকলুম। কর্নেলও অবশ্য আর মুখ খুললেন না। কেমন গম্ভীর হয়ে চুরুট টানতে থাকলেন।
খেয়েদেয়ে শুতে রাত প্রায় দশটা বেজে গেল। ক্লান্তির ফলে কখন ঘুমিয়ে গেছি! সেই ঘুম ভাঙল কর্নেলের ডাকে। দেখি, সকাল হয়ে গেছে। কর্নেল অভ্যাসমতো কখন এই প্রচণ্ড শীতের ভোরে বাইরে ঘুরে এসেছেন। গায়ে ওভারকোট, মাথায় হনুমান টুপি, হাঁতে ছড়ি। বললেন, গুড মর্নিং! আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে। এখন উঠে পড়ো এবং দ্রুত চোখমুখ ধুয়ে এসো।
বললুম, দ্রুত কেন? কোথাও বেরুবেন বুঝি?
বেরুব। অবশ্য তাতে তোমার লাভই হবে। কথা দিচ্ছি।
লাভের দরকার নেই। আমি সোজা গিয়ে ট্রেন ধরব। বলে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলুম।
কিছুক্ষণ পরে বেরিয়ে এসে দেখি কর্নেল বিছানায় গুচ্ছের ফোটোর ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছেন। আমাকে দেখে বললেন, জয়ন্ত, আমার রাতের ফসল! দেখে যাও, তোমার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যাবে।
একটা ফোটো তুলে নিয়ে সত্যি সত্যি চক্ষু চড়কগাছ আমার। এ কী দৃশ্য! কুমড়োখেতে একটা বিশাল কুমড়োর ওপর ঝুঁকে ডঃ গিন্তি কী যেন করছেন, এক হাতে ক্ষুদে টর্চ রয়েছে। বললুম, কী ব্যাপার?
কর্নেল হাসলেন। ডঃ গিন্তি নিশ্চয় রাতদুপুরে নিজের কুমড়ো নিজে চুরি করছেন না।
তাহলে কী করছেন? নিশ্চয় কোনও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-টরীক্ষা করছেন।
ঠিক তাই। অসাধারণ ওঁর গবেষণা কর্নেল তারিফ করে বললেন। খুব অধ্যবসায়ী লোক ও বলব, জয়ন্ত। যাগগে। সেই অদ্ভুত পায়ের ছাপের রহস্যই থেকে গেল। সম্ভবত জন্তুটা ওঁকে দেখে আর ওখানে পা বাড়ায়নি।
চৌকিদার কফি দিয়ে গেল। কফি খাওয়ার পর কর্নেল ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। জয়ন্ত, দেরি হয়ে যাচ্ছে। বলে আমাকে আপত্তির সুযোগ না দিয়ে হাত ধরে টানতে-টানতে বেরুলেন। কুয়াশার ফাঁকে হাল্কা রোদ ফুটেছে। কিন্তু ঠাণ্ডার কথা না বলাই ভাল। বাংলো থেকে উতরাই রাস্তায় আমরা নেমে গেলুম কিছুদূর। তারপর সমতলে আরও কিছুটা এগিয়ে চমকে উঠলুম! গাছপালার আড়ালে একটা জিপ দাঁড়িয়ে রয়েছে। জিপে কারা বসে আছে। কর্নেল তাদের দিকে হাত ইশারা করে আমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে ঝোপে ঢুকলেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন, এবার হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে হবে জয়ন্ত। একটু কষ্ট করো।
কিন্তু ব্যাপারটা কী?
স্বচক্ষে দেখবে। চলো।
পাগলের পাল্লায় পড়া গেছে, উপায় কী! ঝোপঝাড় পাথরের আড়ালে এগোচ্ছি। ঠাণ্ডায় হাত পা জমে যাচ্ছে। গাড়ির এঞ্জিনের শব্দ শুনছি। কতক্ষণ পরে কর্নেল একটু উঁচু হয়ে চোখে বাইনোকুলার রেখে বললেন, এসে গেছে! দেখবে নাকি জয়ন্ত? দেখই না।
