জয়ন্ত! চলে এসো। আলাপ করিয়ে দিই।
ডাক শুনে বেড়া গলিয়ে ঢুকে পড়লুম। খামারের মালিক অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন। বেড়ার ফাঁকটা বেড়ে গেছে। সম্ভবত সেদিকেই ওঁর নজর।…
খামারের মালিকের পরিচয় পেয়ে আমি অবাক। ভদ্রলোক আসলে একজন কৃষিবিজ্ঞানী। নাম ডঃ রঘুনাথ গিতিওয়ালা। সংক্ষেপে ডঃ গিন্তি। অনেককাল পশ্চিমবঙ্গে ছিলেন। ভাল বাংলা বলেন। এই খামার তার ল্যাবরেটরি। গাছগাছড়া নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। তাছাড়া এক ঋতুর ফসল কীভাবে অন্য ঋতুতে ফলানো যায়, তা নিয়েও মাথা ঘামান। আমার কৌতূহল ওঁর ফলানো কুমড়ো সম্পর্কে। প্রশ্ন শুনে হাসতে-হাসতে বলনে, আপনার বাঙালিরা কুমড়োর ছক্কা খেতে খুব ভালবাসেন। ওদিকে লিটনগঞ্জের কলকারখানা এলাকায় অজস্র বাঙালি আছেন। বলতে পারেন, তাদের মুখ চেয়েই আমি এই উৎকৃষ্ট জাতের কুমড়ো ফলিয়েছি। ওখানকার অফিস ক্যান্টিনগুলোতে তরিতরকারি জোগায় একটা এজেন্সি। তারা আমার খেতের কুমড়ো ট্রাকবোঝাই করে কিনে নিয়ে যায়। আপনার বন্ধু কর্নেলসাহেবকেই জিজ্ঞেস করুন, সত্যি না মিথ্যে।
কর্নেলসায়েব অথাৎ বুড়ো ঘুঘু বলে পরিচত কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। এই খামারবাড়ির পাশের ঘর থেকে ভিজে পোশাক ছেড়ে ডঃ গিন্তি বেঁটে পাজামা-পানজাবি এবং একখানা আস্ত কম্বল জড়িয়ে এতক্ষণ এলেন। ফায়ারপ্লেসের সামনে আরাম করে বসে বললেন, জয়ন্ত, ডঃ গিন্তির ওই কুমড়োগুলো কিন্তু অকাল-কুম্মাণ্ড!
ডঃ গিন্তি হো-হো করে হেসে উঠলেন। কী বললেন? অকাল-কুম্মাণ্ড?
কর্নেল বলেন, তাছাড়া আর কী বলব? সচরাচর কুমড়ো পরিণত আকার পেতে এবং পাকাপোক্ত হতে অনেক দিন লেগে যায়। আপনার এই কুমড়ো মাত্র তিনমাসেই প্রকাণ্ড হয়ে ওঠে। ভেতরটা লাল টুকটুকে।
ডঃ গিন্তি হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন যেন। বললেন, না, না। লাল বলা ঠিক নয়, হলদে। আপনি তো ভেতরটা দেখার সুযোগ পাননি এখনও। বরং কাল সকালে আপনার ফরেস্টবাংলোয় খানিকটা পাঠিয়ে দেব। তখন…
বাধা দিয়ে কর্নেল বললেন, সরি! ভেতরটা তো এখনও দেখিইনি। তবে যেন মনে হচ্ছে, ভেতরটা লাল হওয়াই উচিত।
কেন বলুন তো?
বুঝলেন ডঃ গিন্তি, আমার ইদানীং উদ্ভিদ বিজ্ঞানের দিকেও ঝোঁক চেপেছে। সেদিন একটা পত্রিকায় দেখছিলুম, অবিকল এই জাতের কুমড়ো পলিনেশীয় দ্বীপপুঞ্জে ফলে। প্রশান্ত মহাসাগরের ওই সব দ্বীপে দুশো বছর আগে কুমড়ো কী তা কেউ জানই না। ১৭৩৯ সালে বিখ্যাত অভিযাত্রী টমাস কুক প্রথম তাহিতি দ্বীপে বিলিতি কুমড়োর কিছু বীজ পুঁতে এসেছিলেন। তার প্রায় একশো বছর পরে বিবর্তনবাদের প্রবক্তা চার্লস ডারউইন গিয়ে দেখেন, মাটির গুণে বিশাল আকারের কুমড়ো ফলেছে। তো তখনও দ্বীপের লোকেরা ভয়ে কুমড়ো ছোঁয় না। ওখানকার একটা দ্বীপের নাম ইস্টার দ্বীপ। সেখানে লোকেরা যে পক্ষিদেবতার পুজো করে এ বুঝি তারই ডিম। বুঝুন
অবস্থা!
আমি ও ডঃ গিন্তি হেসে উঠলুম। এই সময় কফি এল। আমরা আরাম করে কফিতে চুমুক দিলুম। কর্নেলবুড়ো কোনও ব্যাপারে একবার মুখ খুললে তো থামতে চান না। আবার পলিনেশীয় দ্বীপপুঞ্জে ফিরেছেন। গতিক দেখে ডঃ গিন্তি আমার দিকে চোখ ইশারা করে বললেন, ইয়ে, এবার জয়ন্তবাবুর ব্যাপারটা শোনা যাক। বলুন জয়ন্তবাবু, কী দেখে এলেন লিটনগঞ্জে?
কর্নেল চিমটেয় অগ্নিকুণ্ড থেকে এক টুকরো অঙ্গার তুলে চুরুট ধরাতে ব্যস্ত হলেন। আমি বললুম, ব্যাপার সত্যি সাংঘাতিক। হেভি ওয়াটার প্ল্যান্টের প্রায় অর্ধেকটা বিস্ফোরণে গুঁড়ো হয়ে গেছে। সরকারি গোয়েন্দারা এখনও তদন্ত করছেন। কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। কিন্তু আঁচ করা যাচ্ছে না যে, অত কড়াকড়ি নিরাপত্তা ব্যবস্থা সত্ত্বেও কীভাবে অন্তর্ঘাত ঘটল!
ডঃ গিন্তি শিউরে উঠলেন। বলেন কী! অন্তর্ঘাত? তাহলে ফিরে গিয়ে আপনাদের পত্রিকায় কড়া করে লিখবেন জয়ন্তবাবু।
কর্নেল আমার দিকে ঘুরে দুষ্টু হেসে বললেন, রিপোর্টার হিসেবে জয়ন্তের খুব সুনাম আছে। ডঃ গিন্তি। ওর কলমের জোরে সরকারি অফিসের চেয়ারগুলো কেঁপে ওঠে শুনেছি।
পালটা খোঁচা মেরে বললুম, আর আপনার? আপনারও তো বুড়ো ঘুঘু বলে যথেষ্ট নাম আছে।
কর্নেল আচমকা কাশতে শুরু করলেন। সর্বনাশ! জলে নাকানিচোবানি খাওয়ার ফলাফল। ডঃ গিন্তি আমাকে কী প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন, উদ্বিগ্ন হয়ে থেমে গেলেন। কিন্তু না, কর্নেল সামলে নিয়েছেন। বুড়ো হাড়ে ভেল্কি দেখানোর ক্ষমতা আছে ওঁর। রুমালে নাক মুছে বললে, এবার ওঠা যাক। বাংলোয় ফিরতে রাত হয়ে যাবে।
ডঃ গিন্তি বললেন, সঙ্গে লোক দেব। আলো দেব। কিছু ভাববেন না। তা জয়ন্তবাবু, ওই হেভিওয়াটার প্ল্যান্ট ব্যাপারটা আদতে কী বলুন তো? বুঝতেই পারছেন, আমি নিছক কৃষিবিদ্যার চর্চা করি।
কর্নেল হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। এবার উঠি ডঃ গিন্তি। আপনার আতিথ্য এবং সাহায্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। কাল সকালে আপনার এই কাপড়-চোপড় আর কম্বল ফেরত পাঠাব! এসো জয়ন্ত।
বলে উনি সটান বেরিয়ে গেলেন। বাইরে এতক্ষণে চাঁদ উঠেছে। কিন্ত কুয়াশাও ঘন হয়ে জমেছে, আর কনকনে ঠাণ্ডার কথা না তোলাই ভাল। মনে হচ্ছিল, কর্নেলবুড়োর পাল্লায় পড়াটা ঠিক হয়নি। সোজা ভারুণ্ডি স্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরলে ভাল করতুম।
এই জঙ্গলের পথে হাড়কাঁপানো শীতে ফরেস্ট বাংলোর দিকে হাঁটতে হাঁটতে এবার বাঘভালুকের ভয় হচ্ছিল। শুনলুম বারুণ্ড জঙ্গলে বুনো হাতিরও উৎপাত আছে। তবে ডঃ গিন্তির লোকটির হাতে আলো আছে।
