বনবাংলোর বারান্দায় বসে কফিতে চুমুক দিয়ে কর্নেল বললেন, ছিপটা আর মাছটার কথা ভেবে এ রাতে আমার ঘুমের বারোটা বেজে যাবে ডার্লিং! সকালে…
কথা কেড়ে বললুম, কিন্তু ওই শিকারি ভদ্রলোক পাণ্ডেজির ব্যাপারটা আমার ঘুমেরও বারোটা বাজাবে। কর্নেল হাসলেন। হুঁ, ব্যাপারটা অবশ্য রহস্যময়। তবে স্রেফ তোমার বোকামির জন্যই রহস্যটা ঘনীভূত হল। তোমার হাতে একটা রাইফেল ছিল জয়ন্ত। পাঁচটা গুলির তিনটে ভরা ছিল। তুমি ওদের বডি তুলে নিয়ে যাওয়া ঠেকিয়ে রাখতে পারতে–যতক্ষণ না আমি পৌঁছচ্ছি!
কিন্তু আপনি কোনও আভাস দিয়ে যাননি!
ঘটনার আকস্মিকতায়, ডার্লিং!কর্নেল সাদা দাড়ি চুলকে বললেন।দুবার গুলির শব্দ। তারপর পান্ডেজি বা বলেই শেষ-নিঃশ্বাস ফেললেন। বাঘের কথাই ভাবা সে-মুহূর্তে স্বাভাবিক। তারপর মনে হল, গুলি-খাওয়া বাঘ শিকারির ওপর ঝাঁপ দিলেও গর্জন করবে ক্রমাগত। অথচ গর্জনের শব্দ শুনিনি তো! তখনই প্রথম সন্দেহ জাগল। এটা কোনও হত্যাকাণ্ড নয় তো? সম্ভবত আমাদের হঠাৎ গিয়ে পড়ায় খুনিরা গা ঢাকা দিয়েছে। তা ছাড়া ঘাসের তলায় বাঘের পায়ের ছাপ নেই!
পান্ডেজি ভদ্রলোক কে?
কর্নেল কফি শেষ করে চুরুট ধরালেন। তারপর অভ্যাসমত চোখ বুজে বললেন, শিবচরণ পাণ্ডে হাথিয়াগড়ের বনেদি বংশের মানুষ। শিকারে প্রচণ্ড নেশা ছিল। আমার একজন পুরানো বন্ধুও বলতে পার ওঁকে। তারপর চোখ খুলে চাপাস্বরে বললেন, ফের, আসলে পাভেজির চিঠি পেয়েই এবার আমার এখানে আসা এবং প্রপাতের জলায় মাছ ধরতে যাওয়া।
চমকে উঠে বললুম, কী চিঠি?
গোয়েন্দাপ্রবর জ্যাকেটের ভেতর পকেট থেকে একটা ভাজ করা চিঠি বের করে দিলেন। চিঠিটা পড়ে আরও অবাক হয়ে গেলুম। ইংরেজিতে লেখা চিঠিটার বাংলা করলে এই দাঁড়ায় :
প্রিয় কর্নেল,
সম্প্রতি হাথিয়াগড় এলাকার একটা ধূর্ত মানুষখেকো বাঘের উপদ্রব দেখা দিয়েছে। মানুষখেকো বাঘ ধূর্ত হয়। কিন্তু এ বাঘটা এমনই ধূর্ত যে, তার মানুষ মারার খবরই শুধু শুনি। কিন্তু মড়ার পাত্তা পাই না। খুব খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু এটা কোনও ব্যাপার নয়। আসল ব্যাপারটা হল : কোদণ্ড পাহাড়ের জলপ্রপাতের নিচে যে জলটা আছে, সেখানে বাঘটা জল খেতে আসবে ভেবে পরপর তিনটে রাত ওঁত পেতে ছিলুম। প্রতি রাতেই একটা অদ্ভুত জিনিস দেখছি। প্রপাতের দিকটাতে একটা উঁচু পাথর জল থেকে মাথা তুলেছে সেটা দেখতে কাছিমের খোলের মতো। ওখানে হঠাৎ একটা আলো জ্বলে ওঠে। আলোটা কিছুক্ষণ নড়াচড়া করে। তারপর নিভে যায়। এখন কৃষ্ণপক্ষ চলছে। মাঝরাতে জ্যোৎস্নায় সব দেখতে পাই। প্রথমে আলোটা জ্বলে তারপর দেখি, একটা ছোট্ট নৌকো এগিয়ে চলেছে আলোটার দিকে। প্রথম দুটো রাত ভেবেছিলুম জেলে-নৌকো মাছ ধরছে। কিন্তু মানুষখেকো বাঘের উপদ্রব চলছে। কাদের এত সাহস হতে পারে? তৃতীয় রাতে জোরাল টর্চের আলো ফেলে নৌকোর লোকগুলোকে ডাকলুম। অমনি ওরা নৌকো অন্যদিকে ঘুরিয়ে দক্ষিণপাড়ে চলে গেল। অনেকটা ঘুরে পিচ রাস্তার ব্রিজ হয়ে সেখানে গেলুম। নৌকোটা বাঁধা আছে। লোক নেই। ব্যাপারটা রহস্যময়। সকালে আবার গেলুম সেখানে। নৌকোটা নেই। আমি এর মাথামুন্ডু কিছু বুঝতে পারছি না। অনুগ্রহ করে রহস্যটা ফাস করে যান। শুভেচ্ছা রইল।
শিবচরণ পান্ডে
চিঠিটা ফেরত দিয়ে বললুম, রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি বটে!
হুঁ, রহস্য! কর্নেল দাড়ি নেড়ে সায় দিলেন এবং চওড়া টাকে হাত বুলিয়ে বললেন, তোমার কী মনে হয়, শুনি জয়ন্ত!
একটু হেসে বললুম, আমি তো বোকা।
না না। বোকারা গাছে চড়তে পারলেই বুদ্ধি খোলে–চীনা প্রবাদ। তুমি গাছে চড়তে পেরেছ, ডার্লিং!
কথার ভঙ্গিতে আরও হাসি পেল। বললুম,তা ঠিক। তারপর থেকে আমার মাথা সত্যি খুলে গেছে। এখন বুঝতে পারছি, ওই জলায় কেউ বা কারা গোপনীয় কিছু করছে এবং পান্ডেজি সেটা দেখতে পেয়েছিলেন বলেই তাকে মেরে ফেলা হল।
আমরা গিয়ে না পড়লে-সরি, আপনি গিয়ে না পড়লে ওটা মানুষ-খেকো বাঘের হাতে মৃত্যু বলে চালানো সোজা ছিল।
বাঃ! অপূর্ব! খাসা বলেছ ডার্লিং! বৃদ্ধ ঘুঘুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
প্রশংসায় খুশি হয়ে বললুম, মানুষখেকো বাঘের ব্যাপারটাও রটনা বলে মনে হচ্ছে। যাতে জঙ্গলে লোকেরা না ঢোকে।
কর্নেল সায় দিলেন। ঠিক, ঠিক! বিশেষ করে ওই জলায় জেলেরা মাছ ধরতে যায়। তারাও বাঘের ভয়ে যাতায়াত বন্ধ করেছে। যাই হোক, সকাল ছাড়া আপাতত আর কিছু করার নেই। তবে সত্যি জয়ন্ত, আমার ছিপটাও খুব দামি। আর মাছটাও নিশ্চয় বড়। দেখা যাক, ঘন্টারাম মাছটার লোভে আমার ছিপটা উদ্ধার করে দেয় নাকি। ঘন্টারাম! ঘন্টারাম! ইধার আও তুম!
কর্নেল ঘন্টারামকে ডাকতে থাকলেন। ঘন্টারামের সাড়া পাওয়া গেল কিচেন থেকে। সেই রাতের খাবার তৈরি করছিল। এই সময় হঠাৎ কর্নেল মুচকি হেসে চাপা গলায় বললেন, কিন্তু জয়ন্ত, তোমার থিওরিতে একটা খটকা থেকে যাচ্ছে। পান্ডেজির শেষ কথাটি বা…। এ সম্পর্কে তোমার কী বক্তব্য?
এবার একটু ঘাবড়ে গেলুম। বললুম, বা-রহস্য সত্যিই গোলমেলে। ওকে যদি মানুষেই হত্যা করে থাকে, বা… মানে, বাঘ বলছে চাইলেন কেন? বলেই ফের বুদ্ধি খুলে গেল। উত্তেজিতভাবে বললুম, হাঁ-বুঝেছি। পান্ডেজি এই নকল বাঘের মুন্ডুটা ঝোঁপের ফাঁকে দেখেছিলেন। মুন্ডুটা….
