প্রথমজন বলল, বাবুজির বন্দুক?
বললুম, এই যে!
রাইফেলটা আমার হাতে দেখামাত্র সে হাত বাড়াল। দিন স্যার! বাবুজির খুব শখের বন্দুক ওটা!
এই সময় কাছাকাছি কোথাও জঙ্গলের ভেতর বাঘটা ডাকল, আ-উ-ম। তারপর চাপা গরগর গজরানিও শোনা গেল। আমি পাথর থেকে নামতেই রাইফেলটা প্রায় ছিনিয়ে নিল প্রথম লোকটা। আবার বাঘের গরগর গর্জন শুনতে পেলুম। রাইফেল বগলদাবা করে প্রথম লোকটি তাড়া দিল, বাঘটা এসে পড়েছে। বডি ওঠাও।
দুজনেই তাগড়াই চেহারার লোক। গায়ে জোর আছে বোঝা গেল। শিকারি ভদ্রলোকের রক্তাক্ত মৃতদেহ কাঁধে তুলে ওরা ব্যস্তভাবে হাঁটতে শুরু করল।
আমি ওদের অনুসরণ করলুম। জঙ্গলের ভেতর ততক্ষণে আবছা আঁধার ঘনিয়েছে। ওরা লম্বা পায়ে দৌড়চ্ছে। নাগাল পাচ্ছি না। খানিকটা এগিয়ে গেছি, ডানদিকে আবার বাঘের গরগর গজরানি শুনতে পেলুম। একখানে গাছপালার ফাঁক গলিয়ে একটু ফিকে আলো এসে পড়েছে। সেখানে একটা ঝোঁপের ফাঁকে বাঘের মাথা দেখতে পেলুম।
অমনি আমার মাথা খারাপ হয়ে গেল। হ্যাঁ, মাথা খারাপই বটে। নইলে কী করে গাছে চড়ে বসলুম এর ব্যাখ্যা হয় না।
গাছটা অবশ্য তত উঁচু নয় এবং কয়েকটা ডাল নিচুতে নাগালের মধ্যেই ছিল। যতটা উঁচুতে পারা যায়, উঠে গেলুম। হাত ছড়ে গেল। জামাও একটু-আধটু ফদাফাঁই হল। ডালে বসে নিচের দিকে লক্ষ্য রাখলুম, বাঘটা মড়া হাতছাড়া হওয়ার রাগে এবার আমাকেই খাওয়ার জন্য ফন্দিফিকির করছে কি না। শিকারের বইয়ে বাঘের গাছে চড়ার কথাও পড়েছি। সেটাই দুর্ভাবনার ব্যাপার।
কিন্তু বাঘটা আর গজরাচ্ছে না। হয়তো মড়াবাহী লোকদুটোকেই চুপি-চুপি অনুসরণ করেছে। এখন কথা হল, কর্নেলের কাছেই ওরা ওদের বাবুজির খবর শুনেছে, অথচ, কর্নেল ওদের সঙ্গে এলেন না কেন? সম্ভবত ওরা দৌড়ে এসেছে এবং কর্নেল তাই ওদের নাগাল পাননি। এবার যে-কোনও মুহূর্তে এসে পড়বেন। কান খাড়া করে বসে রইলুম।
কতক্ষণ কেটে গেল। জঙ্গল অন্ধকারে ছমছম করতে থাকল। চারদিকে নানারকমের ভূতুড়ে শব্দ। কাঠ হয়ে বসে আছি, হঠাৎ নিচের দিকে টর্চের আলোর ঝলক এবং কর্নেলের গলা শুনতে পেলুম। এই যে! এদিকে।
সঙ্গে-সঙ্গে সাড়া দিলুম, কর্নেল! কর্নেল!
নিচে থেকে আমার ওপর আলো এসে পড়ল। কর্নেল বললেন, তুমি গাছের ডগায় কী করছ, জয়ন্ত? তারপর ওঁর স্বভাবসিদ্ধ হা-হা অট্টহাসি।
রাগ চেপে অতি কষ্টে গাছ থেকে নেমে বললুম, কোনও মানে হয়? লোকদের খবর দিয়ে এতক্ষণে এসে জিগ্যেস করছেন, গাছের ডগায় কী করছি!
কর্নেলের সঙ্গে একজন পুলিশ অফিসার আর জনা-দুই কনস্টেবল এসেছেন। কর্নেল আমার কথা শুনে বললেন, লোকদের খবর দিয়ে মানে? যাঁদের খবর দিতে গিয়েছিলুম, তারা তো আমার সঙ্গে।
অবাক হয়ে বললুম, দুজন লোক বডি তুলে নিয়ে গেল! তারাই বলল…
আমাকে থামিয়ে কর্নেল বলে উঠলেন, মাই গুডনেস! আমারই বুদ্ধির ভুল! আমাকে নির্ঘাত বাহাত্তুরে ধরেছে, আগাগোড়া খুলে বললো তো জয়ন্ত!
সব শোনার পর কর্নেল বললেন, জয়ন্ত এমন বোকামি করে বসবে, ভাবিনি, যাই হোক, চলুন মিঃ সিনহা। আগে ঘটনাস্থলটা দেখাই।
পুলিশ অফিসারটির নাম মিঃ সিনহা। তিনি পা বাড়িয়ে বললেন, জয়ন্তবাবু বললেন, সত্যিই বাঘটাকে দেখেছেন। গজরানিও শুনেছেন। কাজেই ব্যাপারটা বড্ড গোলমেলে হয়ে গেল দেখছি।
কর্নেল এদিকে-ওদিকে টর্চের আলো ফেলেছিলেন। একখানে আলো পড়তেই বাঘের মাথাটা ঝোঁপের ফাঁকে দেখা গেল। সবাই থমকে দাঁড়ালেন। কনস্টেবলরা বন্দুক তাক করল। কর্নেল তাদের বললেন, সবুর! খামোকা গুলি খরচ করে লাভ নেই।
তারপর নির্ভয়ে এগিয়ে গেলেন ঝোঁপটার দিকে। বাঘটা আর একটুও গর্জন করছিল না। কর্নেল সোজা গিয়ে বাঘের মাথাটা খামচে ধরলেন এবং হা-হা করে হেসে উঠলেন।
মিঃ সিনহা বললেন, এ কী কর্নেল!
হ্যাঁ–একটা নিছক ডামি মুন্ডু। নকল মুন্ডু। কর্নেল বাঘের মুন্ডুটা উপড়ে নিয়ে আমাদের কাছে এলেন। আসলে জয়ন্তকে ভয় দেখাতেই এই চালাকি করেছিল।
বললুম, কিন্তু বাঘের ডাক?
ওটাও নকল। কর্নেল সেই খোলা ঘাসজমিটায় পৌঁছে ফের বললেন, অনেক শিকারি অবিকল বাঘের ডাকের নকল করে বাঘকে আকৃষ্ট করেন। জিম করবেট বা অ্যান্ডারসনের শিকার-কাহিনিতে পড়েছি। তা ছাড়া জয়ন্ত যে অবস্থায় পড়েছিল, শেয়ালের ডাককে বাঘের ডাক বলে ভুল হতো ওর!
ক্ষুব্ধ হয়ে বললুম, আমি অত বোকা নই।
কর্নেল বললেন, মজাটা এই যে নিজের বোকামি নিজেই টের পাওয়া যায় না। ডার্লিং, কেউ এসে মড়াটা দাবি করলে সেটা না হয় দেওয়া চলে, হাতের সাংঘাতিক অস্ত্র-মানে, রাইফেলটা দেওয়া যায় না।
খোলা জায়গাটায় কিছু আলো আছে তখনও। মিঃ সিনহা ঘাসের ওপর রক্তের ছাপ টর্চের আলোয় খুঁটিয়ে দেখেছিলেন। বললেন, হুঁ তলার মাটিটা নরম। কিন্তু সত্যিই বাঘের পায়ের ছাপ নেই।
নেই। কর্নেল বললেন। সেটাই আমার সন্দেহের কারণ!
মিঃ সিনহা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। বডিটা কোথায় পুড়িয়ে নষ্ট করে ফেলবে–এখনই ব্যবস্থা করা দরকার।
এতক্ষণে লক্ষ্য করলুম, তার হাতে একটা ওয়াকি-টকি রয়েছে। বেতারে চাপা গলায় থানায় মেসেজ পাঠালেন। তারপর বললেন, চলুন কর্নেল ফেরা যাক। আপনাদের বাংলোয় পৌঁছে দিয়ে যাব।
সামান্য দূরে জঙ্গলের একটেরে পিচের রাস্তা। সেখানে পুলিশের জিপ অপেক্ষা করছিল।…
