বুঝতে হলে আপনি এখনই গোবর্ধন সর্বাধিকারীর কাছে গিয়ে কালো ছাতাটি দাবি করুন।
অ্যাঁ? আমার তো ছাতা হারায় নাই।
—ধরুন, হারিয়েছে। এমন লোক নেই, জীবনে যে কখনও ছাতা হারায়নি। প্রাইভেট ডিটেকটিভ হাঁ করে তাকিয়ে ছিলেন। বললেন, কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণ?
–ধরুন, বেঁটে কালো একটা ফোল্ডিং ছাতা, মেড ইন জাপান এবং কোম্পানির নাম তাকামিও আকামা।…বিখ্যাত কোম্পানি হালদারমশাই।
হালদারমশাই কেন যেন উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তাঁর গোঁফ তিরতির করে কাঁপতে লাগল। বললেন, কী কোম্পানি কইলেন য্যান? তাকাচ্ছি না—
—তাকামিও আকামা।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ বিড়বিড় করে আওড়ে নামটা মুখস্থ করে ফেললেন। তারপর তার মুখে কৌতুক ফুটে উঠল। বললেন, তবে যাই গিয়া!
—হ্যাঁ। এখনই চলে যান। গিয়ে হয়তো দেখবেন নস্কর লেনে লম্বা লাইন পড়ে গেছে।
হালদারমশাই উঠে দাঁড়ালেন। তারপর সবেগে বেরিয়ে গেলেন। দরজার পর্দা বেশ কিছুক্ষণ ধরে দুলতে থাকল।
আমি অবাক হয়ে আমার প্রাজ্ঞ বন্ধুর কাণ্ডকারখানা লক্ষ্য করছিলাম। এতক্ষণে বললাম, হালদারমশাইকে এভাবে একটা কালো ছাতার পেছনে লেলিয়ে দিলেন যে? খামোকা বেচারা
কর্নেল আমার কথার ওপর বললেন, খামোকা নয় ডার্লিং। ইদানীং হালদার মশাইয়ের ডিটেকটিভ এজিন্সির ওপর শনির দৃষ্টি পড়েছে। না—কথাটা আমার নয়, ওঁরই। তুমি আসার আগে উনি তাই নিয়ে দুঃখ করেছিলেন। কোনও রহস্যময় ঘটনা কোথাও ঘটছে না। উনিও তাই হাতে কেস পাচ্ছেন না।
শুনে চমকে উঠেছিলাম। বললাম, এই কালো ছাতার বিজ্ঞাপনে কি আপনি কোনও রহস্যের গন্ধ পেয়েছেন?
বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ তার সাদা দাড়ি থেকে চুরুটের ছাই ঝেড়ে বললেন, জয়ন্ত! তোমাকে একবার বলেছিলাম, কালো জিনিস সবসময় রহস্যময় বলে মনে করা হয়। কালো বেড়াল, কালো কুকুর, কালো
হঠাৎ থেমে উনি টাকে হাত বুলোতে থাকলেন। কালো জিনিসকে মানুষ ভয় পায়। গোবর্ধনবাবুর ভয় পাওয়া স্বাভাবিক।
এইসময় ভেতরের ঘরের পর্দা তুলে ষষ্ঠীচরণ বলল, -বাবামশাই। আর কফি খাবেন নাকি? আমাকে এখনই বাজারের জন্য বেরুতে হবে।
-কফি দিয়ে তুই গোল্লায় গেলেও আপত্তি করব না।
বলে উনি ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে অভ্যাসমতো চোখ বুজলেন। বললাম, কর্নেল। তা হলে মনে হচ্ছে, বিজ্ঞাপনদাতা গোবর্ধন সর্বাধিকারী আপনার কাছে এসেছিলেন এবং আপনার পরামর্শেই বিজ্ঞাপন দিয়েছেন।
কর্নেল মাথা নাড়লেন, নাহ, সশরীরে আসেননি। কদিন আগে উনি টেলিফোন করেছিলেন। একটা কালো ছাতা কুড়িয়ে পেয়ে ভদ্রলোক নাকি সমস্যায় পড়েছেন।
—কী সমস্যা?
কর্নেল চোখ খুলে একটু হাসলেন, সমস্যাটা ভৌতিক।
–তার মানে?
–ছাতাটা বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে নাকি ভূতের উপদ্রব শুরু হয়েছে।
অস্থির হয়ে বললাম, আহা! খুলে বলুন না শুনি।
ষষ্ঠী যে কেটলিতে জল চাপিয়েই পর্দা তুলে কফি খাওয়ার কথা জানতে চাইছিল, সেটা বুঝলাম কারণ সে খুব শিগগির কফি নিয়ে হাজির হল। কফিতে চুমুক দিয়ে কর্নেল বললেন, কোনও বাড়িতে ভূতের উপদ্রবের কতকগুলো ধরাবাঁধা লক্ষণ আছে। রাতদুপুরে ছাদে ধুপধুপ পায়ের শব্দ, কিংবা দরজায় নক করা, কখনও কিছু অদ্ভুত শব্দ—তুমি ভূতের ব্যাপারে নতুন কিছু আশা কোরো না ডার্লিং! এই মহাকাশযুগেও ভূতেদের চরিত্র বদলায়নি।
-হ্যাঁ। আপনি হালদারমশাইকে দেখছি আসলে ভূতের পেছনেই ছোটালেন?
—কী আর করা যাবে? উনি চৌত্রিশ বছর গোয়েন্দা পুলিশে চাকরি করেছেন। অবসর নিয়েও গোয়েন্দগিরির অভ্যাস ছাড়তে পারেননি! তাই আজও অনেক আশা নিয়ে আমার কাছে এসেছেন মনে হচ্ছিল। দেখা যাক, উনি ভূতকে জব্দ করতে পারেন কি না।
হেসে ফেললাম, বরাবর দেখে আসছি, হালদারমশাই গোয়েন্দাগিরি করতে বিভ্রাট বাধিয়ে ফেলেন। নিজেও কম নাকাল হন না। এবারও দেখব, উনি ফেঁসে গেছেন।
কর্নেল আমার কথায় কান না দিয়ে আবার প্রজাপতির ফোটোতে মন দিলেন। এবার ড্রয়ার থেকে আতস কাচ বের করে ফোটোগুলো দেখতে থাকলেন।
কিছুক্ষণ পরে ডোরবেল বাজল। ষষ্ঠী বেরিয়ে গেছে। দরজায় ইন্টারলকিং সিস্টেম আছে। ভেতর থেকে নব ঘুরিয়ে খুলে বেরুনো যায়। কিন্তু বাইরে থেকে ঢুকতে হলে চাবির দরকার হয় কর্নেল বললেন, জয়ন্ত। দেখ তো কে এল?
ড্রয়িংরুমের পর ছোট্ট ওয়েটিংরুম। তারপর বাইরের দরজা। সেটা খুলে দেখি, একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে সাদাসিধে ধুতিপাঞ্জাবি, কাঁধে একটা ব্যাগ ঝুলছে। নমস্কার করে বললেন, আমি একটু কর্নেলসাহেবের সঙ্গে দেখা করতে চাই। জরুরি দরকার আছে।
ওঁকে কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ পেলাম না। উনি আমাকে পাশ কাটিয়ে ঢুকে পড়লেন। তারপর ড্রয়িং রুমের পর্দা তুলে বললেন, বড় বিপদে পড়ে ছুটে এসেছি সার। আমাকে বাঁচান।
ওঁর পেছন পেছন গিয়ে আমি সোফার কোনার দিকে বসলাম। কর্নেল ওঁকে না দেখেই বললেন, বসুন গোবর্ধনবাবু তারপর কথা হবে।
ভদ্রলোক ধপাস করে বসেই বললেন, আপনি আমাকে কী করে চিনলেন সার?
—আপনার কণ্ঠস্বর শুনে। আপনার কণ্ঠস্বরের একটা বৈশিষ্ট্য আছে। সম্ভবত এর কারণ আপনার টনসিলের অসুখ। কিন্তু আপনি অপারেশন করাতে ভয় পাচ্ছেন।
—আপনি সাক্ষাৎ অন্তর্যামী সার।
নাহ।–কর্নেল এবার ওঁর দিকে ঘুরে বসলেন। বলুন, আবার আপনার কী বিপদ হয়েছে? এই বিপদটা নিশ্চয় ভূতের নয়?
—আজ্ঞে না। মানুষের।
—যেমন?
—আমার বাড়ির সামনে সকাল থেকে লম্বা লাইন পড়ে গেছে। আপনার কথায় বিজ্ঞাপন দিয়ে এই বিপদে পড়েছি সার। কী ভাবে এতলোকের সঙ্গে কথা বলব বলুন? একে তো আমার টনসিলে ব্যথা। তাই পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে তালা এঁটে চলে এসেছি। এতক্ষণ হয় তো ওরা হুলস্থূল বাধিয়েছে। আজকাল লোকেদের মতিগতি তো জানেন সার। একটুতেই ভাঙচুর শুরু করে দেয়।
