গদাই দড়ি নিয়ে এল। হালদারমশাই পুলিশি কায়দায় নকুলকে পিঠমোড়া করে বেঁধে টানতে
টানতে বারান্দায় ওঠালেন।
কুমারসায়েব বললেন, নকুল হারামজাদা রাণুকে মারতে গেল কেন? কিছু তো বুঝতে পারছি না।
কর্নেল বললেন, ঘরে চলুন। কফি খেতে খেতে সব বলছি।
হালদার মশাই বললেন—আমি আসামিরে পাহারা দিচ্ছি। একখান চেয়ার চাই। চেয়ারে বসে কফি খাব আর পাহারা দেব।
গদাই তাঁকে একটা চেয়ার এনে দিল। তারপর একপেয়ালা কফি দিয়ে এল। হালদারমশাই পুলিশি কায়দায় আসামিকে উপুড় করে দিয়ে তার পিঠে জলে ভেজা দুই পা চাপিয়ে রাখলেন। তার প্যান্টশার্টও ভেজা। কিন্তু গ্রাহ্য করলেন না। এক হাতে রিভলভার, অন্য হাতে কফির পেয়ালা।
কর্নেল বললেন—রাণু আজ গন্ধর্বমূর্তি চুরি করে ঝিলের জলে ড়ুবিয়ে রেখেছিল। তার দোষ নেই। প্রথমত, আপনাদের বংশের রীতি অনুসারে এ বিগ্রহ বাড়ির মেয়েদেরই পূজ্য। দ্বিতীয়ত, রাণু বুঝতে পেরেছিল, কেউ বা কারা ওটার জন্যই আপনাকে ভয় দেখাচ্ছে। ভয় পেয়ে আপনি যদি দৈবাৎ বিগ্রহ কোথাও ফেলে দেন, এমন আশঙ্কাও অমূলক ছিল না।
যাই হোক, ব্যাপারটা দৈবাৎ আমার চোখে পড়ে যায়। ছিপে মাছ ধরার ছলে ঘাটে গিয়ে মূর্তিটা খুঁজে বের করেছিলুম। এই নিন সেই বিগ্রহ। এই যুগ্ম গন্ধর্ব আর পেছনকার প্লেট নিরেট সোনার বলে মনে হচ্ছে।
কুমারসায়েব হাত বাড়িয়ে বিগ্রহ নিয়ে বললেন, হ্যাঁ, নিরেট সোনা।
-নকুল নিশ্চয় কোথাও ওত পেতে ছিল। রাণু জলে কিছু লুকিয়ে রাখছে এটা ওর চোখে পড়েছিল। কিন্তু দিনের বেলা ঘাটের দিকে আসতে সাহস পায়নি। এদিকে ঘাট থেকে আমরা উঠে আসার পর রাণু গিয়েছিল। আমি বিগ্রহের বদলে দড়িতে একটুকরো পাথর বেঁধে জলে ড়ুবিয়ে রেখেছিলাম। রাণু সেটা টেনে তুলে নিশ্চয় হতবাক হয়ে বসেছিল। সেই সময় মওকা বুঝে শ্রীমান নকুল গিয়ে হানা দেয়। রাণু অবশ্য ভূত দেখেই চেঁচিয়ে উঠেছিল। আমি গিয়ে দেখি, বজ্জাতটা একটা কাঠ তুলে ওকে মারতে যাচ্ছে। আমি ওকে ধরে ফেলার আগেই হালদারমশাই ওর ওপর ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। ফলে দুজনেই জলে পড়ে মল্লযুদ্ধ শুরু হয়েছিল।
কর্নেল হেসে উঠলেন।
বাইরে থেকে হালদারমশাই বললেন, বান্দরটা আমারে শ্মশান থেকে তাড়াইয়া দিছিল ক্যান?… এই ভূত! ক্যান ঢিল ছুড়ছিলি?
কর্নেল বললেন, ওখানে ওর এই ভূতের পোশাক লুকোনো থাকত। কাজেই আপনাকে তাড়ানোর দরকার ছিল ওর। বিকেলে সে পোশাকটা অন্য নিরাপদ জায়গায় রাখতে গিয়েছিল। আপনি গিয়ে না পড়লে কী সাংঘাতিক কাণ্ড হত!
বারান্দা থেকে নকুল চি চি করে বলল, আর কক্ষনও এমন হবে না কুমারসায়েব!
কুমারসায়েব লাঠি তুলে গর্জন করলেন, শার্ট আপ ভূত কোথাকার!
তারপর ভেতরে চলে গেলেন।
হালদারমশাই!-কর্নেল বারান্দায় গেলেন। আপনি এক কাজ করুন। জয়ন্তের পাজামা-পাঞ্জাবি পরে ভেজা প্যান্টশার্ট ছেড়ে ফেলুন। ঠাণ্ডায় কতক্ষণ বসে থাকবেন? পুলিশ আসতে একটু দেরি হবে। থানা প্রায় দু-কিলোমিটার দূরে।
আসামিকে কর্নেলের জিম্মায় রেখে প্রাইভেট ডিটেকটিভ ঘরে ঢুকলেন। করুণ হেসে বললেন, বড় হিম জয়ন্তবাবু!…..
১.০৭ কালো ছাতার উৎপাত
প্রাইভেট ডিটেকটিভ কৃতান্ত কুমার হালদার, সংক্ষেপে কে কে হালদার ওরফে আমাদের প্রিয় হালদারমশাই মন দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। হঠাৎ খি খি করে হেসে বললেন, খাইছে।
কোনও মজার খবর পড়লেই উনি এই কথাটি নিজের দেশোয়ালি ভাষায় সহাস্যে উচ্চারণ করেন। এবং আমিও ওঁর সঙ্গে মজা করার জন্য বলে থাকি, কে কাকে খেল হালদারমশাই?
এদিন আমার কৌতুকের মেজাজ ছিল না। সল্টলেক থেকে আসার পথে ইস্টার্ন বাইপাসে একটা পাজির পাঝাড়া ট্রাক আমার ঝকমকে গাড়িটার গা ঘষে দিয়ে গেছে। বেশ কিছু টাকা খরচের ধাক্কা। তাই হালদারমশাইয়ের দিকে মন ছিল না।
হালদারমশাই প্যান্টের পকেট থেকে নস্যির কৌটো বের করে একটিপ নস্যি নিলেন। তারপর বললেন, জয়ন্তবাবু কিছু জিগাইলেন না?
এতএব জিজ্ঞেস করতেই হল, খবরটা কী হালদার মশাই?
ছাতা।-বলে তিনি তার লম্বা তর্জনী দিয়ে বিজ্ঞাপনের পাতায় একটা ছোট্ট বিজ্ঞাপনের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। লিখেছে : কার্জন পার্কে একটি কালো ছাতা কুড়াইয়া পাইয়াছি। মালিক উপযুক্ত প্রমাণ দিয়া লইয়া যান। গোবর্ধন সর্বাধিকারী। ৩৩/১ নস্কর লেন। কলিকাতা—৬১।
—এতে তো মজার কিছু দেখছি না হালদার মশাই। তা ছাড়া এটা তো বিজ্ঞাপন।
প্রাইভেট ডিটেকটিভ আবার একচোট হেসে বললেন, ছাতার উপযুক্ত প্রমাণ মানে কী? ছাতা নানা সাইজের হয়। একই সাইজের ছাতা অসংখ্য লোকের আছে। আবার সেই অসংখ্য লোকের মধ্যে অনেকেরই কালো ছাতা হারাইতে পারে।…. কী কন কর্নেলসার?
কর্নেল নীলাদ্রি সরকার চুরুট কামড়ে কয়েকটা পোস্টকার্ড সাইজের ছবি নাড়াচাড়া করছিলেন। ওঁর এই জাদুঘর সদৃশ ড্রয়িংরুমে ঢোকার সময়ই দেখে নিয়েছি, ছবিগুলো রংবেরঙের প্রজাপতির। হালদারমশাইয়ের কথা শুনে উনি বললেন, হালদারমশাই কি সুকুমার রায়ের বিখ্যাত সেই গোঁফচুরি পদ্যটা পড়েছেন?
গোঁফচুরি? হালদারমশাই খুব অবাক হয়ে বললেন, গোঁফ চুরি যায় ক্যামনে?
-বলেছিলেন, গোঁফের আমি, গোঁফের তুমি, গোঁফ দিয়ে যায় চেনা। কাজেই ছাতা দিয়েও মানুষ চেনা যায়। ছাতার আমি, ছাতার তুমি, ছাতা দিয়ে যায় চেনা।
হালদারমশাই গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন, বুঝলাম না।
