এতক্ষণে আমায় ঘিলু চাঙ্গা হল এবং আমিও দৌড়ে চললুম। বালিয়াড়ির খাঁজ থেকে কর্নেলের টুপিটি কুড়িয়ে নিয়ে গেলুম।
হরদয়ালবাবুর মাথার পেছনে গুলি করা হয়েছিল। হোটেলের পরিচারক গোবিন্দরাম আমরা বেরিয়ে আসার আন্দাজ মিনিট পনেরো পরে জিজ্ঞেস করতে যায়, ব্রেকফাস্টে কী কী খাবেন বাবুরা। দরজায় তালা দেওয়া ছিল না। প্রথমে সে কলিং বেলের বোতাম টেপে। তারপর সাড়া না পেয়ে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে। সে হরিচরণকে বেরোতে দেখেছিল। কাজেই সে জানত, হরদয়ালবাবু ভেতরে আছেন। বাথরুমে আছেন ভেবেই সে অপেক্ষা করেছিল। শেষে অধৈর্য হয়ে দরজা খোলে এবং হরদয়ালবাবুকে চিত হয়ে শুতে থাকতে দ্যাখে। বাবুর সাড়াশব্দ না পেয়ে তার সন্দেহ হয়। তখন সে ওঁর দিকে ঝুঁকে কপালে হাত রাখে। কপাল ভীষণ ঠাণ্ডা ছিল। তারপর তার চোখে পড়ে বালিশের ওপর রক্তের ছোপ। মাথার পেছন দিকটা থেকে সামান্য একটু রক্ত গড়িয়ে এসে বালিশে ছোপ ফেলেছিল।
পুলিশ এসে যথারীতি মৃতদেহ বহরমপুর শহরের মর্গে নিয়ে গেল। সবাইকে তন্নতন্ন জেরা করে বিবৃতিও লিখে নিয়ে গেল। হরিচরণ বন্ধুর শোকে কাঁদতে-কাঁদতে পুলিশের গাড়িতে বহরমপুর চলে গেলেন। সেখান থেকে ট্রাংকল করে হরদয়ালের আত্মীয়স্বজনকে খবর দেবেন।
হরিচরণের মুখেই আমরা জানতে পেরেছিলুম, হরদয়ালের অ্যাটাচিকেসে প্রচুর টাকা ছিল। সেটা উধাও হয়ে গেছে।
পুলিশের গাড়িতে উনি চলে যাওয়ার পর আমাদের স্যুইটে ফিরে কর্নেলকে বললুম, আপনার সঙ্গে আর কোথাও যাচ্ছি না। যেখানে আপনি, সেখানেই খুনখারাপি। ব্যাপারটা কী?
কর্নেল একটা চাপা শ্বাস ছেড়ে বললেন, ব্যাপার তত কিছু গুরুতর নয়।
অবাক হয়ে বললুম, গুরুতর নয়? কী বলছেন! যে-হোটেলে এভাবে খুনে চোর-ডাকাত ঢোকে, সেই হোটেলে আমার আর একটুও থাকতে ইচ্ছে করছে না!
কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, সাড়ে এগারোটা বাজে। ব্রেকফাস্ট খাওয়া হয়নি। চলো, দেখি, ক্যান্টিনে একটু সকাল-সকাল লাঞ্চ পাওয়া যায় কি না।
সূর্যাস্তের পরও কর্নেল ও আমি সি-বিচে গিয়ে বসে আছি, সেই সময় পিছনের বালিয়াড়িতে কয়েকটি ছায়ামূর্তি ভেসে উঠল। ডান দিকে বিচের মাথায় কতকগুলো পাথরের ভাঙাচোরা বাড়ি। খুব পুরনো আমলের বাড়ি। ছায়ামূর্তিগুলো বালিয়াড়ি থেকে সোজা না নেমে সেই ভাঙা বাড়িগুলোর ভেতর ঢুকে পড়ল। অমনি ভয় পেয়ে চাপাস্বরে বলে উঠলুম, কর্নেল, নির্ঘাত চোর ডাকাতের দল!
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, আমরা তো ব্যবসায়ী নই। টাকাকড়ি-ওয়ালাও নই। চোর-ডাকাত লোক চেনে ডার্লিং!
তাহলে ওরা কারা?
যারাই হোক, আমাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
একটু পরে সমুদ্রের ভেতর থেকে লাফ দিয়ে উঠল ঝলমলে এক বিশাল লাল-হলুদ রঙের গোলা। ওটা যে চাদ, বুঝতে সময় লাগল। তারপর পিছন থেকে কে গম্ভীর স্বরে বলে উঠল, কর্নেলসায়েব নাকি?
কর্নেল ঘুরে বললেন, হরিচরণবাবু? আসুন, আসুন। কখন ফিরলেন বহরমপুর থেকে?
এইমাত্র, বলে হরিচরণ এসে আমাদের পাশে বসলেন।
কয়েক মিনিট চুপচাপ থাকার পর ফেঁস ফেঁস করে নাক ঝেড়ে ভাঙাগলায় বললেন, আপনি কী বলবেন বলছিলেন, তাই চলে যাওয়ার আগে দেখা করতে এলুম।
কর্নেল আমাকে ভীষণ চমকে দিয়ে বললেন, আচ্ছা হরিচরণবাবু, আপনি কি প্রেতাত্মা বিশ্বাস করেন?
হরিচরণও চমক-খাওয়া গলায় বললেন, কেন বলুন তো?
কর্নেল বললেন, আমি অনেকদিন যাবৎ তন্ত্রসাধনা করেছি। প্রেতাত্মাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। আপনার বন্ধু হরদয়ালবাবুর আত্মার সঙ্গে যদি আপনি বাক্যালাপ করতে চান। করতে পারেন। ডাকব তাকে?
হরিচরণ বললেন, এ-কথা বলতেই ডেকেছিলেন কি?
কর্নেল জবাব না দিয়ে ডাকলেন, হরদয়ালবাবু, আপনার বন্ধু এখানে উপস্থিত আছেন। কিছু বলার থাকলে বলুন ওঁকে।
সামনে সমুদ্রের প্রচণ্ড আলোড়ন এবং সেই আলোড়নের মধ্যে ফিকে জ্যোৎস্নার রং দুলছে। ঝকমক করছে। যেন এক বিশাল অলৌকিক দৃশ্যের সামনে বসে আছি। আর সেই অলৌকিকতাকেও তুচ্ছ করে দিয়ে ভেসে এল হরদয়ালবাবুর ভূতুড়ে কণ্ঠস্বর, কী হরি, এখনও কী করছ এখানে? শিগগির কলকাতা চলে যাও। আমার তো ছেলেপুলে নেই। এখন তোমারই সব। হরিহর এন্টারপ্রাইজের একচ্ছত্র মালিক হতে অসুবিধেও নেই।
হরিচরণ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, এই চালাকির অর্থ কী?
কথাটা বললেন কর্নেলকে। জবাল এল হরদয়ালের প্রেতাত্মার কাছ থেকে। চালাকি তুমিও কম জানো না হরি, ও কী পালাচ্ছ কেন? আরে শোনো, শোনো।
হরিচরণ সত্যি পালাচ্ছিলেন। আমি তো হতভম্ব হয়ে বসে আছি। হঠাৎ ডান দিকের সেই ভাঙা পাথুরে বাড়িগুলো থেকে একঝক টর্চের আলো এসে পড়ল এবং একদল ছায়ামূর্তি ঘিরে ধরল হরিচরণকে। তখন বুঝতে পারলুম, সেই ছায়ামূর্তিগুলো পুলিশ। হরিচরণকে গ্রেফতার করছে।
কর্নেল বললেন, কী ডার্লিং, বোবা হয়ে গেলে যে? বললুম, কিচ্ছু মাথায় ঢুকছে না।
কর্নেল হাসলেন, স্রেফ ভেন্ট্রিলোকুইজিম! আমি এই স্বর-জাদু বিদ্যাটি সম্প্রতি শিখেছি। যাই হোক, হরদয়ালের মাথার পিছনে সাইলেন্সার-লাগানো পিস্তল দিয়ে গুলি করে মেরে হরিচরণ ওঁকে বিছানায় শুইয়ে রেখেছিল। আমরা ওঁদের সুইটের দরজার ফাঁক দিয়ে ওঁকে দেখেছিলুম ঠিকই। তখন আসলে উনি মৃত। কিন্তু এই হরিচরণ ভেন্ট্রিলোকুইজিমে খুব পাকা। বিশেষ করে হরদয়ালবাবুর টলসিলের ত্রুটি থাকায় হরিচরণের সুবিধে হয়েছিল। আমাদের সাক্ষী রাখতে চেয়েছিল যে, হোটেল থেকে বিচে আসার সময় আমরা হরদয়ালকে জীবিত দেখেছি, কারণ, ওঁর কথাবার্তা শুনেছি।
