ভাবলুম, এই লাগসই উপমাটি ওঁকে শুনিয়ে দিই। কিন্তু উনি বাইনোকুলার নামিয়ে রেখে গম্ভীর মুখে বললে, জয়ন্ত, তুমি তো একজন সাংবাদিক। ওদের সম্পর্কে তোমার কাগজে কিছু লেখা উচিত।
অবাক হয়ে বললুম, কাদের সম্পর্কে?
এখানকার মৎস্যজীবীদের, কর্নেল দুঃখিত মুখে বললেন, দূরের সমুদ্রে জলটা তত অশান্ত নয়। সেখানে মাছও প্রচুর। কিন্তু লক্ষ্য করো, বিচের কাছাকাছি অনেকটা দূর পর্যন্ত সমুদ্রের কী সাংঘাতিক অবস্থা! ভেবে দ্যাখো, জয়ন্ত, ছোট্ট সব নৌকো নিয়ে এই অংশটা পেরোতে বেচারাদের কী লড়াই না করতে হয়। প্রতিদিন ওরা এই লড়াই করে তবে সামান্য কিছু মাছ ধরতে পারে। ফেরার সময় আবার সেই লড়াই। তাছাড়া দেখতেই পাচ্ছ, সমুদ্রে কতসব পাথরও মাথা উঁচিয়ে আছে। দৈবাৎ ধাক্কা লাগলে নৌকো ভেঙে গুড়িয়ে তো যাবেই, ওরাও বাঁচবে না! ওদের এই প্রচণ্ড জীবনসংগ্রামের কথা তোমার লেখা উচিত ডার্লিং। আমরা ডাইনিং টেবিলে বসে যখন বিশেষ বিশেষ সামুদ্রিক মাছের সুস্বাদ নিয়ে প্রশংসা করি, তখন কি চিন্তা করে দেখি যে…
আমার বৃদ্ধ বন্ধুর সারগর্ভ ভাষণে বাধা পড়ল দরজার কলিংবেলের বাজনায়। গিয়ে দরজা খুলে দেখি, হরিচরণবাবু, একেবারে সমুদ্রস্নানের জন্য তৈরি হয়ে আমাদের ডাকতে এসেছেন। বললেন, আসুন কর্নেল, সমুদ্রস্নান করে খিদে চাঙ্গা করা দরকার, নইলে ব্রেকফাস্ট জমবে না। জয়ন্তবাবু দেরি করবেন না! পোশাক বদলে নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। বাই দা বাই আপনারা বাথ-সুট সঙ্গে এনেছেন তো? এখানে সমুদ্র কিন্তু বিপজ্জনক।
কর্নেল একটু হাসলেন, বাথ-সটের দরকার হবে না হরিচরণবাবু! কারণ, এ-বেলা আমি সমুদ্রে নামছি না। তবে জয়ন্তের কথা আলাদা। ইয়াংম্যানরা সমুদ্রের সঙ্গে লড়তে ভয় পায় না। কী বলো ডার্লিং?
ঝটপট বললুম, আমার একটুতেই ঠাণ্ডা লেগে যায়।
হরিচরণ হাসতে হাসতে বললেন, সমুদ্রের জলে ঠাণ্ডা লাগার ভয় নেই। আসুন না, নুলিয়া পাওয়া যাবে। পুরীর সমুদ্রে কি কখনও স্নান করেননি?
আমাকে টেনে ঘর থেকে বের করলেন হরিচরণবাবু। টের পেলুম, ভদ্রলোকের গায়ের জোর আছে বটে! কর্নেলও বেরোলেন। করিডোরে দাঁড়িয়ে বললেন, হরদয়ালবাবু স্নান করতে যাবেন? নাকি আমার মতোই জলকাতুরে মানুষ?
হরিচরণবাবু বললেন, যা বলছেন! ওকে টেনে ওঠাতে পারলুম না বিছানা থেকে। দাঁড়ান, আবার চেষ্টা করে দেখি।
উল্টোদিকে চার নম্বর স্যুইটের দরজা উনি ফাঁক করে ডাকলেন, হর, ও হর, স্নান না-ই বা করলে। অন্তত বিচে বসে আমাদের স্নান করা দেখবে। সমুদ্র দেখলে খিদে বাড়বে হে, রাক্ষসের মতো খেতে পারবে!
দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলুম, খাটে হরদয়ালবাবু চিত হয়ে শুয়ে আছেন। মাথার ওপর একটা হাত। এই অবস্থায় শুয়ে থেকেই সেই ভূতুড়ে কণ্ঠস্বরে বললেন, আরে ট্রেন-জার্নির ধকল সামলে নিতে দাও আগে। বরং দুপুরের দিকে দেখব। .
হরিচরণ সহাস্যে বললেন, তুমি তো বরাবর এখানে এসে আগে স্নান না করে ব্রেকফাস্ট করতে না! এবার হলটা কী? বলে কর্নেলের দিকে ঘুরলেন। আমার ফ্রেন্ড, বুঝলেন তো, বড্ড খামখেয়ালি! গত বছর ও আমাকেই টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে সমুদ্রে ছেড়েছিল। সত্যি বলতে কী, এখানকার সমুদ্রকে আমারও বড্ড ভয় করত। ওর পল্লায় পড়েই সে-ভয়টা কেটে যায়।
কর্নেল ডাকলেন, হরদয়ালবাবু কি অসুস্থ বোধ করছেন? ও হরদয়ালবাবু!
হরদয়াল সেইরকম মেয়েলি এবং খোনা গলায় জবাব দিলেন, আরে না, না, আপনারা যান। না, আমি দুপুরে স্নান করবখন।
হরিচরণ রাগ করে দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে বললেন, ছেড়ে দিন। ও বরাবর ওইরকম একগুঁয়ে!
হোটেল থেকে বেরিয়ে সি-বিচে নামার সময় কর্নেল বললেন, হরদয়ালবাবুর টনসিলের গণ্ডগোল আছে। কাল রাত্রে সে নিয়ে আলোচনা করছিলুম। উনি বললেন, দুবার অপারেশন করিয়েও কিছু হয়নি।
হরিচরণ বললেন, আসল গণ্ডগোল থাইরয়েড গ্ল্যান্ডে। ডাক্তারদের মতে, ওই গ্ল্যান্ডে অপারেশন না করলে গলার স্বর বদলাবে না, তাছাড়া ক্রমশ বডিটাও আরও মোটা হয়ে যাবে। কিন্তু সার্জারিতে হর-র বড় আতঙ্ক। দুবার যে টনসিল অপারেশন করিয়েছিল, সে একরকম আমারই চেষ্টায়। বড় জেদি ও।
সমুদ্রের বিচ ভাটার সময়ও তত কিছু চওড়া নয়। খানিকটা ঢালুও। আমাকে টানাটানি করে হরিচরণ সমুদ্রে নামাতে পারলেন না। কর্নেল বিচে বসে বাইনোকুলারে লাইটহাউস কিংবা অন্য কিছু দেখতে থাকলেন। হরিচরণ ভাল সাঁতারু নিঃসন্দেহে। একদল কাচ্চাবাচ্চাও ওর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাঁতার কাটতে থাকল। ছোট্ট ছেলেমেয়েগুলো মৎস্যজীবী বস্তির। এখন থেকেই ওরা এমনি করে এই সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই শুরু করে। ভবিষ্যতের বড় লড়াইয়ের জন্য তৈরি হয়। কর্নেল ঠিকই বলেছেন, এদের কথা দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় আমার লেখা উচিত।
কিছুক্ষণ পরে কর্নেল সবে উঠে দাঁড়িয়েছেন, বিচের ওপরদিকের বালিয়াড়ি থেকে প্রায় আছাড় খেতে নেমে এলেন সি-ভিউ হোটেলের সেই ম্যানেজার ভদ্রলোক। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, সর্বনাশ হয়েছে স্যার! হরদয়ালবাবু খুন হয়েছেন। বলে সাঁতারু হরিচরণের উদ্দেশে হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগীর মতো হাত ছোড়াছুড়ি এবং লম্ফঝম্ফ করে ডাকাডাকি করতে লাগলেন।
কর্নেল তৎক্ষণাৎ হন্তদন্ত হয়ে বালিয়াড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। বালিয়াড়ি দিয়ে ওঠার সময় তাঁর টুপি খসে পড়ল। প্রশস্ত টাকটি ঝকঝক করে উঠল। কিন্তু টুপির দিকে মনই দিলেন না। অদৃশ্য হয়ে গেলেন বালিয়াড়ির ওধারে।
