মানিক রহস্যময় হাসি হেসে বলল, “হবে হবে।”
সাত
শীত নয়, তবে শীত শীত ভাব এসে গিয়েছে তখন। হেমন্তের মাঝামাঝি। রাত্রের আড্ডায় মানিক আর শাঁটুল এল। সুজন নেই। সে ফিরে গেছে।
শাঁটুল এসে বলল, “জিজি, পরশু দিন একবার মহাবীর পাহাড়ে যাবি? মেলা দেখে আসব।”
“না।”
“পরশু তো রবিবার। সকাল ছাড়া তোর কাজ নেই।”
“অনেক দূর ; দশ বারো মাইল।”
“তাতে কি! গাড়ি নিয়ে যাবি তুই। এখন তো তুই নিজেই বেশ চালাস।”
“অনেক তেল পুড়বে।”
“নেভার মাইন্ড। আমি তেলের দাম দেব।”
“তোর মতলবটা কি?”
শাঁটুল প্রথমে ভাঙল না। তারপর বলল, “কলকাতা থেকে বিউটির এক ফ্রেন্ড এসেছে। শুনলাম—বিউটি ফ্রেন্ডকে নিয়ে মহাবীর পাহাড়ে যাবে।”
“কোন ফ্রেন্ড?”
“বয় ফ্রেন্ড।”
“তাতে আমার কি?”
“বাঃ, তোর কি! তোরই তো সব। আমার মনে হয় বিউটিকে এভাবে ফাঁকায় ছেড়ে দেওয়া যায় না। ”
“সে তার মা বাবা বুঝবে।”
“মা বাবা রাজি নয়। বিউটি শুনছে না।”
“তা আমি কি করব।”
“আমার মনে হয়, আমাদের থাকা উচিত। বিউটি যেভাবে গাড়ি ফাড়ি চালায়—একটা অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে। ফাঁকা রাস্তা। তুই ধরে নে না—আমরা অ্যামবুলেন্স ভ্যান হয়ে যাব।”
মানিক চোখ টিপে বলল, “আমারও তাই মনে হয়। হাজার হোক, অ্যামবুলেন্স তো হতেই হবে একদিন।”
গোবিন্দ খেপে গিয়ে বলল, “তোমাদের ভাল তোমাদের থাক। আমাকে কুকুর-বেড়ালের মতন ট্রিট করে। আই হেট হার।”
শাঁটুল বলল, “তুই এ-সব বললে বড় দুঃখ পাই। জিজি, তুই কত বড় বংশের ছেলে। তোর কত গুণ। তুই দয়ামায়া ভুলে যাবি, জিজি।”
শেষ পর্যন্ত গোবিন্দ রাজি হয়ে গেল।
রবিবার বিকেলে যথারীতি গোবিন্দ তার গাড়ি নিয়ে শাঁটুল মানিককে সঙ্গী করে মহাবীর পাহাড়ে গেল। যাবার পথে বিউটিকে দেখতে পেল না। মেলায় পৌঁছতে না পৌঁছতেই চোখে পড়ল বিউটি ফিরছে। ভাল করে দেখা গেল না। ভিড়ের আড়ালে পড়ে গিয়েছিল।
মেলায় একটু অপেক্ষা করেই শাঁটুল বলল, “জিজি, লেট আস গো।”
গোবিন্দ বলল, “এই তো এলাম।”
“আমার কিন্তু ভয় করছে। চল ফিরে যাই। বিউটি যেভাবে বেরিয়ে গেল।”
বাধ্য হয়েই গোবিন্দ বলল, “চল।”
গাড়িতে বসে গোবিন্দ কোথাও বিউটিকে দেখতে পেল না। কত দূর চলে গেছে কে জানে! গোবিন্দ গাড়িতে স্পিড় ওঠাতে ভয় পাচ্ছিল। একে কাঁচা হাত, তায় গাড়ি বিকল হয়ে যাবার ভয়।
পাঁচ সাত মাইল রাস্তায় গরুর গাড়ি, টাঙা, দেহাতি-বাস ছাড়া কিছু চোখে পড়ল না । মনে হল, বিউটি চলেই গেছে।
শহরে পৌঁছতে আর মাইল দুই। সেখানে এসে দেখা গেল, রাস্তার এক পাশে বিউটির গাড়ি পড়ে আছে। রাস্তায় বিউটি দাঁড়িয়ে।
গোবিন্দদের গাড়ি দেখতে পেয়েই হাত তুলল বিউটি।
শাঁটুল বলল, “দাঁড়া।”
গোবিন্দ খানিকটা এগিয়ে এসে দাঁড়াল। বলল, “আমি যাব না। তুই যা।”
নেমে গেল শাঁটুল।
মানিক বলল, “গোবিন্দ, দাসগিন্নিকে দেখছি যেন রে!”
গোবিন্দ বলল, “দাসগিন্নি কোথা থেকে আসবে?”
“দেখছি যে। বিউটির বোনও যেন আছে।”
“শাঁটুল যে বলল—”
“শালা বাজে কথা বলেছে।”
ততক্ষণ শাঁটুল ফিরে এসেছে। বলল, “জিজি, বিউটির গাড়ি আর চলছে না। অনেক চেষ্টা করেও কিছু হয়নি। গাড়িটাকে টেনে নিয়ে যেতে হবে। তোর গাড়িতে দড়ি আছে?”
গোবিন্দ বলল, “দড়ি নেই, বালতি আছে।”
“তা হলে?”
“পেছনটা দেখ। কিছু পেতেও পারিস।”
পিছনে কিন্তু দড়ি পাওয়া গেল। কেমন করে পাওয়া গেল গোবিন্দ বুঝল না।
সামনে গোবিন্দর গাড়ি। পেছনে বিউটির। দুটো গাড়িতে গাঁটছড়া বাঁধা। যেতে যেতে শাঁটুল বলল, “জিজি, তোর এত মুখ গোমড়া কেন?”
“বাজে বকিস না।”
“বাজে বকছি কোথায়! তুই কাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছিস, বোঝ। দাসগিন্নি, বিউটি, আর তোর শালা শালীকে।”
“শাট আপ, শালা। তুই আমায় ব্লাফ ঝাড়লি। ”
শাঁটুল হোহো করে হাসতে লাগল। বলল, “আমি ঝাড়লাম না বিউটি ঝাড়ল। তোকে যে কি লাভ করে বিউটি!”
গোবিন্দ চেঁচিয়ে বলল, “লাভের নিকুচি করেছে। ও আমায় বিস্ট বলেছে—তা জানিস।”
“সো হোয়াট। বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট!”
বিয়ের পর গোবিন্দ গাড়িটাকে ফেলে দিতে চেয়েছিল। বিউটি বলেছিল, পাগল। ওটা যত্ন করে সাজিয়ে গুজিয়ে রেখে দাও। ও জিনিস না দেখলে কে তোমায় বিয়ে করত!
গোবিন্দ গাড়িটাকে সযত্নে রেখে দিয়েছে।
বিচিত্র প্রেম
দিন চারেক হল অতুল বাড়ি ছাড়া। পাড়া ছেড়েই পালিয়ে এসেছে। যে-রকম কেচ্ছা হয়ে গেল বাড়িতে তারপর কোনো ভদ্রলোকই আর মুখ দেখাতে পারে না। অতুলও মুখ দেখাচ্ছে না। অবশ্য এই মুখ আর দেখার মতনও নেই, চারদিনেই চুপসে গেছে, গালে দাড়ি জমেছে বিস্তর, চোখে হলুদ হলুদ ছোপ ধরেছে, মাথার চুলে জটের গন্ধ। তবু এই মুখই একজনকে অন্তত না দেখালেই নয় বলে অতুল রেল স্টেশনের ডাউন প্ল্যাটফর্মের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে বসে আছে।
এখন এদিকে কোনো গাড়িটাড়ি নেই। কখনো সখনো দু একটা মালগাড়ি যাচ্ছে। যাক । অতুল প্ল্যাটফর্মের কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় গোল করে বাঁধানো সিমেন্টের বেদিতে বসে। বসে বসে বিকেলের আকাশ দেখছে উদাস চোখে, মাঠঘাট নজর করছে বিষন্নভাবে, লম্বা লম্বা নিশ্বাস ফেলছে, সিগারেট টানছে ঘন ঘন। আর থেকে থেকে দূরে ওভারব্রিজের দিকটা লক্ষ করছে।
অতুলের অপেক্ষার অবসান হল আরও খানিকটা পরে, বিকেলের আলো যখন মাঠঘাট ছেড়ে শূন্যে উঠে পড়েছে এবং ক্রমশই ফিকে হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে—তখন।
