প্রীতি কাছাকাছি আসতেই অতুল আবার বড় করে নিশ্বাস ফেলল। খুঁটিয়ে দেখতে লাগল প্রীতিকে। অতুলের মতন লণ্ডভণ্ড চেহারা নয়, মোটামুটি ফিটফাট। ছাপা শাড়ি, কলাপাতা রঙের ব্লাউজ, চোখমুখ পরিষ্কার। বাঃ, বেশ! তোফা আরামে আছ মাইরি! সত্যি, মেয়েরা একটা জিনিস। এত বড় একটা কাণ্ড ঘটে গেল, তারপরও যেমনকে তেমন, মুখে পাউডার মাখতেও ভোলেনি। অতুলের রীতিমতো অভিমান হল, কিংবা হয়তো ক্ষুব্ধই হল সে।
প্রীতি এসে সামনে দাঁড়াল। নজর করে দেখতে লাগল অতুলকে। তারপর একটা ‘ইস’ শব্দ করল, দুঃখে না বিরক্তিতে বোঝা মুশকিল।
অতুল বলল, “যাক, তা হলে এসেছ? আমি ভাবছিলাম, আসবে না।” ক্ষোভের গলাতেই বলল অতুল।
প্রীতি বলল, “বাঃ, কাজকর্ম সেরে আসব না। তা ছাড়া আমি খবরই পেলাম দুপুরে। যোগেন গিয়ে বলল, তুমি স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দেখা করতে বলেছ! এত জায়গা থাকতে এই প্ল্যাটফর্ম তোমার মাথায় এল কেন জানি না , বাবা। বাড়ি থেকে কম দূর?”
অতুল গম্ভীর মুখে বলল, “প্ল্যাটফর্মই ভাল। অনেক মালগাড়ি যাচ্ছে। দু পা এগিয়ে গলাটা বাড়িয়ে দিলেই চলবে।”
প্রীতি টেরা চোখ করে কটাক্ষ হানল। বলল, “আহা—কী কথা রে।”
অতুল একটা সিগারেট ধরিয়ে নিল। প্রীতি ততক্ষণে পাশে বসেছে।
“তোমার মার খবর কী?” অতুল জিজ্ঞেস করল।
“মা ভাল হয়ে গেছে। …তবে বেশ গম্ভীর। কথাবার্তা বেশি বলে না।”
অতুল একটু চুপ করে থেকে বলল, “কেরাসিন তেলের এফেক্ট। বোধ হয় এখনও স্টমাক থেকে তেলের গন্ধ উঠছে।”
প্রীতি আড়চোখে দেখল অতুলকে। বলল, “তোমার বাবার খবর রাখ?”
“শুনেছি ভাল আছে।”
“শুধু ভাল কেন, সেই বুড়ো তো লাফ মেরে মেরে নাচছে..বগল বাজাচ্ছে।”
অতুল ঘাড় ফিরিয়ে প্রীতির দিকে তাকাল। শ্লেষের গলায় বলল, “কথাগুলো কে শিখিয়ে দিয়েছে? তোমার মা?”
প্রীতির মাথা গরম হয়ে উঠল। “আমার মা যা শিখিয়েছে তোমার বাবা তোমাকে তার চেয়েও বেশি শিখিয়েছে।”
অতুল সিগারেটের টুকরোটা রাগের মাথায় ছুড়ে ফেলে দিল। “আমার বাবা সম্পর্কে একটা রেসপেক্ট আমি তোমার কাছে আশা করি। নিজের শ্বশুর সম্পর্কে তোমার যে সব কথাবার্তা, বুড়ো লাফ মেরে মেরে নাচছে, বগল বাজাচ্ছে…ছি ছি…এসব কথা কানেও শোনা যায় না।”
প্রীতি বাঁ হাতটা মুঠো করে বুড়ো আঙুল দেখাল। “তোমার বাবা আমার শ্বশুর? বয়ে গেছে আমার। তোমার বাবা আমার ইয়ে—” বলে বুড়ো আঙুল নাড়াতে লাগল।
অতুল একেবারে থ’। কান কপাল গরম হয়ে উঠতে লাগল। সামান্য তোতলানো জিবে অতুল বলল, “আমার বাবা তোমার শ্বশুর নয়?”
‘না।’
“অফিসিয়ালি নয়, কিন্তু আন-অফিসিয়ালি তো বটে।”
“মোটেই নয়। অমন লোককে আমি শ্বশুর করব না। একটা সত্তর বছরের বুড়ো—দুটো ঘুমের বড়ি খেয়ে ন্যাকামি করে বাড়ি মাথায় করল—ওই লোককে আমি শ্বশুর করব। কখখনো নয়।”
অতুল বেশ চটে গিয়েছিল, কিন্তু অবস্থাটা যা তাতে পুরোপুরি ঝগড়া করাও যায় না। সে তো মেয়ে নয়, পুরুষ। তার খানিকটা সংযম ও কাণ্ডজ্ঞান থাকা দরকার। অতুল বলল, “আমার বাবা সম্পর্কে তুমি যা-তা বলছ! সত্তর বছরের বুড়ো আমার বাবা নয়। সিক্সটি ফাইভ সিক্স হবে। ন্যাকামি করার জন্যে কেউ স্লিপিং ট্যাবলেট খায় না…”
“ভীমরতি হলে খায়”, প্রীতি বেঁকা গলায় বলল।
“তোমার মা-ও কেরাসিন তেল খেয়েছিল”, পালটা ঠোক্কর দিল অতুল, “তোমার মা কচি খুকি নয়। বয়সটাও ষাটের কাছাকাছি। আমিও তো বলতে পারি তোমার মা ন্যাকামি করে কেরাসিন তেল খেয়েছিল।”
প্রীতি রুক্ষ গলায় বলল, “আমার মাকে তুমি ছেড়ে কথা বলছ নাকি? প্রথম থেকেই তো যা তা বলছ! …তুমি বলোনি, মার স্টমাক থেকে এখনও কেরাসিন তেলের গন্ধ উঠছে?”
অতুল আর এগুলো না ; হল্ট মেরে গেল। চেঁচামেচি ঝগড়া বচসা করে লাভ হবে না। অতুল বলল, “সরি! আমার অন্যায় হয়েছে! আসলে আমার মাথার ঠিক নেই। কটা দিন যা যাচ্ছে! কিন্তু তুমি এটা বুঝে দেখো, তোমার মা যদি আগে কেরাসিন তেল না খেত—আমার বাবা স্লিপিং ট্যাবলেট খেত না। এই কেলেঙ্কারির শুরু তোমার মা করেছে, আমার বাবা নয়।”
প্রীতি পিছিয়ে যাবার পাত্রী নয়। বলল, “আমার মা কেরাসিন খেয়েছিল তোমার বাবার জন্যে। তোমার বাবা দোতলায় খোলা বারান্দায় এসে আমার মাকে শুনিয়ে শুনিয়ে গালাগাল দিত। বলত, ছেলেচোর ডাইনি, সর্বনাশিনী, আমার মার জিব নাকি মা কালীর মতন লকলক করছে। এসব কথা শুনলে কার মাথার ঠিক থাকে। আমার মা ছেলেচোর? তুমি কোন রাজপুত্তুর যে তোমাদের ওই ধ্যাড়-ধেড়ে দেড়খানা বাড়ির লোভে তোমায় চুরি করবে! নিজেকে তুমি রাজপুত্ত্বর ভাব নাকি? বেঁটে বাঁটকুল চেহারা, বিদ্যে তো বি. কম, চাকরি করো ব্যাঙ্কে—কেরানির। তোমার মতন রাজপুত্ত্বর এ-শহরে গড়াগড়ি যাচ্ছে। বেশি কথা বোলো না। ”
অতুল একেবারে স্তম্ভিত হয়ে প্রীতির দিকে তাকিয়ে থাকল। এ মেয়ে না রক্ষেকালী? জিবটা শান দিয়ে এসেছে নাকি প্রীতি? এতটা দেমাকই বা কিসের? তুমি কোথাকার রাজকুমারি গো? হাইট তো পাঁচ এক, মোটা হিলের জুতো পরলে ইঞ্চিখানেক বাড়ে। গায়ের রংটা একরকম ফরসা তা বলে তুমি সোনার বরণ নও। চ্যাপ্টা-ধ্যাবড়া চেহারা, ভোঁতা নাক, ছোট কপাল, খরখরে চোখ। নিজের চেহারাটা আয়নায় গিয়ে দেখো না সখি, দেমাক ভেঙে যাবে। লেখাপড়াতেই বা কী? কোনো রকমে টুকে-টাকে বি-এটা পাস করেছ।
