সুজন বলল, “না না, এখনই তোবড়া-তুবড়ি কেন? এখন কিছুদিন ব্লকেড চলুক। তারপর সময় বুঝে পুশ।”
অষ্টমী পুজোর দিন শাঁটুলের প্ল্যান মতন গোবিন্দ বিশেষ জায়গায় বিউটিকে পাকড়াবার চেষ্টা করল। পারল না। পাত্তা পেল না বিউটির। রাত্রে শাঁটুল বলল, “ভড়কে গিয়েছে রে। রিট্রিট। এক দিনেই।”
নবমী পুজোর দিন সকালে গোবিন্দ ডাক্তারখানায় আসার পথে দূরে বিউটির গাড়ি দেখতে পেল। মিশিরকে বলল, তাড়া করতে। কাছে গিয়ে গোবিন্দ দেখল, গাড়ির মধ্যে প্রবীণা মহিলা, গরদের শাড়ি পরনে, পুজোর জিনিসপত্র রয়েছে পাশে। সামনে বিউটি, স্নান করে সাদা সিল্কের শাড়ি পরেছে, লাল ব্লাউজ। সঙ্গে তার ছোট ভাই। গোবিন্দ বুঝতে পারল, দাসগিন্নি বাজার ঘুরে পুজোমণ্ডপে যাচ্ছেন পুজো দিতে। গোবিন্দ সংকোচ বোধ করল। এখানে কিছু করা যায় না। মিশিরকে বলল, গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে। অবশ্য ওরই মধ্যে বিউটির সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেছে গোবিন্দর। বিউটি কড়া চোখে তাকিয়েছে, নাক সিঁটকেছে, তারপর মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে।
রাত্রে পুজোমণ্ডপে দলবল নিয়ে গিয়েছিল গোবিন্দ। দাস-পরিবারকেও দেখল তারা ; কর্তাগিন্নি ছেলেমেয়ে সবাই এসেছে। দাসসাহেবের চারপাশে জোঁকের মতন লেগে আছে পুজো কমিটির মাতব্বররা। বিউটি মেয়েদের স্টলে হাসাহাসি করছে। বেলুন ফাটাচ্ছে।
শাঁটুল বড় শয়তান। কোথা থেকে দু’ পাতা কালী পটকা এনে একসঙ্গে ফাটিয়ে দিল। বিউটি স্টলের মধ্যে ঢুকে পড়ল লাফ মেরে।
তারপর আচমকা মুখোমুখি। গোবিন্দকে দেখেই বিউটি দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “স্কাউড্রেল। ”
গোবিন্দ বলল, “লবেজান বিবি।”
বিউটি লাল হয়ে বলল, “বিস্ট। বিস্ট।”
পুজোটা এইভাবে কাটল। গোবিন্দ তার নোট বুকে একটা চার্ট তৈরি করেছিল। ফুটবলের লিগ টেবিলের মতন। তাতে লেখা ছিল, ক’বার এনকাউন্টার হয়েছে বিউটির সঙ্গে, কে জিতেছে, কে হেরেছে, ক’বার দুপক্ষই সমান গিয়েছে। বন্ধুদের চার্টটা দেখাত গোবিন্দ। তাতে শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, চব্বিশবার মুখোমুখি হয়েছে গোবিন্দ আর বিউটি ; ওপক্ষ জিতেছে দশবার, গোবিন্দ আটবার। ছ বার ড্র।
শাঁটুল বলল, “তুই বেটা পিছিয়ে আছিস। শেম। মেক ইট ইক্যুয়াল। ”
এই সব করতে করতে পুজো পেরিয়ে দেওয়ালি এসে গেল। এর মধ্যে গোবিন্দর গাড়ি শহরের মানুষের কাছে বিখ্যাত হয়ে গেছে। নানা রকম নাম দিয়েছে লোকে গাড়িটার। কেউ বলে, গোবিন্দর রথ, কেউ বলে ঠেলাগাড়ি, কেউ বলে শালা ট্যাংক যেন। গাড়িটা চলছে বটে, তবে তার নানা ব্যাধি। যখন তখন বন্ধ হয়। যেতে যেতে ঝাঁকি মারে, যেন পেছনের পা তুলে ঘোড়া নাচছে। বিস্তর ধোঁয়া ছাড়ে। গর্জনও বিরাট। মাখন মিস্ত্রি ঠকঠাক করেই যাচ্ছে অনবরত। মিশির বলেছিল, ডাক্তারবাবুকে গাড়ি চালানো শিখিয়ে দেবে। সেই শিক্ষাপর্ব চলছিল।
একদিন সকালের দিকে ফুটবল মাঠে নিয়ে গিয়ে মিশির গোবিন্দকে গাড়ি চালানো শেখাচ্ছে, হঠাৎ ধূমকেতুর মতন বিউটির আবিভাব। রাস্তা থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখল। হর্ন মারল তারপর পালাল।
গোবিন্দ বড়ই মর্মাহত হল। আবার দু’ পয়েন্ট নষ্ট হল।
রাত্রে বন্ধুরা এলে গোবিন্দ বিমর্ষ হয়ে বলল, “শাঁটুল, আমার দ্বারা হবে না।”
শাঁটুল বলল, “বলিস কি! উদ্যম বিহনে কার পুরে মনোরথ?”
“বাট আই অ্যাম লুজিং দি গেম।”
“নেভার। আমরা রয়েছি কেন!…শোন জিজি, দাসগিন্নির সঙ্গে আমরা ভাব হয়ে গেছে। বাতের রুগি। হাঁটুতে বাত। আমি বলেছি, আমার বন্ধু জিজিকে দেখান মাসিমা। ও হল আর এস।”
“আর এস?”
“রিউম্যাটিজম স্পেশ্যালিস্ট।”
“শালা!”
“না রে, শালা নয়। গিন্নি ইজ ভেরি গুড। কর্তাও লোক ভাল। কর্তার একটু অর্শের ব্যামো আছে। তোকে দু’ দিক দিয়ে অ্যাটাক করতে হবে।”
মানিক বলল, “যাকে মিলিটারির ভাষায় বলে সাঁড়াশি আক্রমণ।”
গোবিন্দ মাথা নাড়ল। “না ভাই, আমি বাত কিংবা অর্শ স্পেশ্যালিস্ট নই। আমি উইথড্র করব। লেট হার উইন।”
সুজন বলল, “বংশের নাম ডোবাবি তা হলে!”
ছয়
দেওয়ালির পর সন্ধেবেলায় একদিন ডাক্তারখানায় ফোন পেল গোবিন্দ।
“জিজি, মাসিমার বাড়ি থেকে কথা বলছি।”
“মাসিমা?”
“মিসেস দাস! মাসিমার হাঁটু ফুলে গেছে। পা নাড়াতে পারছেন না। একবার দেখে যা।”
“আমি?”
“সিরিয়াস ব্যাপার। দু’ রাত্রি ঘুম হয়নি। চলে আয় ভাই, গাড়ি নিয়ে।”
গোবিন্দ কিছু বলার আগেই শাঁটুল ফোন ছেড়ে দিল।
সামান্য ভেবেচিন্তে গোবিন্দ বেরোব বেরোব করছে ; আবার ফোন।
“হ্যালো, এইচ ডি?”
“এইচ. ডি?”
“হর্সেস ডক্টর। প্লিজ ডোন্ট কাম।” বিউটির গলা।
গোবিন্দর কান মুখ গরম হয়ে উঠল। “হু আর ইউ প্লিজ?”
“দিস ইজ বিউটি স্পিকিং।”
“অ্যান্ড দিস ইজ বিস্ট অ্যানসারিং, আই অ্যাম কামিং।”
“ডোন্ট কাম।”
“আই মাস্ট।” গোবিন্দ ফোন ছেড়ে দিয়ে গলগল করে ঘামতে লাগল।
নিতান্ত কপালই বলতে হবে, গোবিন্দ দাসগিন্নির হাঁটু ফোলা এবং ব্যথা কমিয়ে ফেলতে পারল। দাসগিন্নি বললেন, “কী লক্ষ্মী ডাক্তার তুমি। ওগো শুনছ—তুমিও গোবিন্দকে দেখাও।”
দাসসাহেব বললেন, “তাই ভাবছি।”
চেম্বারে বসে আড্ডার সময় মানিক বলল, “গোবিন্দ, তুই হবু শাশুড়ির বাত আর শ্বশুরের অর্শ নিয়ে পড়লি?”
গোবিন্দ বলল, “মানে? ওরা আমার শ্বশুর শাশুড়ি হবে কেন?”
