মানিক ধমক দিয়ে বলল, “শালা, এটা কি গোবিন্দর গায়ে হলুদের তত্ত্ব। যত সব মাথামোটা ব্যাপার।”
শেষ পর্যন্ত ঠিক হল, মালটিকালার রং হবে। মানে লাল, হলুদ, কালো, নীল—সব মিলিয়ে। এমন রং হবে—যাতে এক মাইল দূর থেকেও মনে হবে—একটা গাড়ি আসছে। আজকাল আমেরিকায় এ রকম বেখাপ্পা রং করে ডিজাইনের পুরনো ধারণা ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
গোবিন্দ বলল, “ঠিক আছে, লাগাও। তবে একটু দেখেশুনে।”
শাঁটুল বলল, “তুই ভাবিস না ; আমি রং দেখব। জেব্রা ডিজাইনের মতন রং লাগাব।”
ষষ্ঠীপুজোর দিন গাড়ির ট্রায়াল হল ফাঁকায় গিয়ে। একেবারে জাত গাড়ি। আওয়াজে সেটা মালুম দিল। লম্ফ-ঝম্ফও করল মন্দ নয়। রাস্তার কিছু কুকুর অবশ্য বহু রঙের সংমিশ্রণে তৈরি গাড়ির ডিজাইনটা বোঝেনি। তারা দলে দলে ভিড় করেছিল, চেঁচামেচি করেছিল। কিন্তু কুকুরদেরও বোধবুদ্ধি আছে। যে মুহূর্তে বুঝল, ওটা গাড়ি, আকাশের দিকে মুখ করে সমস্বরে ডাক দিল, যেন অভ্যর্থনা জানাল গাড়িটাকে। তারপর লেজ গুটিয়ে পালাল। একটা অসুবিধে অবশ্য থেকে গেল। হর্ন পাওয়া গেল না। একটা প্যাক প্যাক হর্ন লাগাতে হল। তাতেই সুবিধে।
বাড়িতে গাড়ি আসতেই গোবিন্দর মা বললেন, “ছি ছি, টাকাগুলো নষ্ট করলি।”
গোবিন্দ বলল, “দেখো না কেমন চলে। এ শহরে এত বড় গাড়ি কারুর নেই। যাও তুমি পুজো দিয়ে এসো গাড়ি চেপে। …সুজন এসেছে?”
“না।”
“ইডিয়েট, আজ তার আসার কথা। এখানে থাকবে দেওয়ালি পর্যন্ত।”
“আসবে হয়তো বিকেলে। “
গাড়ির কিছু ধোওয়া-ধুয়ি বাকি ছিল। চাকরবাকর দিয়ে গাড়ি ধোওয়াল মিশির। শাঁটুল ড্রাইভার হিসেবে মিশিরকে জুটিয়ে দিয়েছে। মিশির মস্ত ড্রাইভার, ভাড়া লরি চালাত ; এখন বয়স হয়ে গিয়েছে, আর তেমন খাটতে পারে না। মিশিরের সঙ্গে শর্ত, এক মাসের মধ্যে গোবিন্দকে গাড়ি চালানো শিখিয়ে দেবে।
গোবিন্দর মা গাড়ি চেপে পুজো দিয়ে এসে বললেন, “তোর গাড়ি দেখতে মেলা বসে গেল রে গোবিন্দ।”
গোবিন্দ বলল, “কেমন চলল?”
“চলতে চলতে বন্ধ হয়ে যায়।”
“নতুন নতুন হবে।”
মা আর কিছু বললেন না।
সুজন বিকেলের দিকে এসে পৌঁছল। গাড়ি দেখে বলল, “ফেরোসাস। বন থেকে বাঘের মতন বেরিয়ে এসেছে। কী শো?..সেই বিচুটি দেখেছে?”
“না ; এইবার দেখাব। ..আয় তোর গাড়ি নিয়ে, মারব ধাক্কা ছিটকে পড়বি।”
“একেবারে মেরে ফেলিস না, পুলিশ কেস হয়ে যাবে।”
গোবিন্দ বলল, “দেখ না, বিচুটির কী হাল করি।”
রাত্রে রোগী দেখার পাট চুকিয়ে চা খেতে খেতে বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ হল, বিউটিকে কোথায় কোথায় কখন ধরা যায়। শাঁটুল কাগজ কলম নিয়ে একটা চার্ট এঁকে ফেলল রাস্তাঘাটের। কোন কোন রাস্তায় বিউটি গাড়ি ছুটিয়ে ঘুরে বেড়ায়, কোথায় কখন তাকে দেখা যায়। পুজোর সময় কোথায় কোথায় পাওয়া যেতে পারে।
শাঁটুলের প্ল্যানই শুধরে সাব্যস্ত হল, কাল থেকেই গোবিন্দ তার গাড়ি নিয়ে বিউটিকে গুঁতোতে বেরুবে। অবশ্য কখনও গুঁতোবে, কখনও রাস্তা আটকে দেবে, কখনও মুখোমুখি তেড়ে যাবে।
শাটুল বলল, “জিজি, এবার তোর কেরামতি দেখব।”
গোবিন্দ গোপাল বলল, “দেখে নিবি।”
পাঁচ
সপ্তমী পুজোর দিন সকালেই প্রথম সংঘর্ষ। বাজারের বাইরে। বিউটির ছোট গাড়ির মুখোমুখি তেড়ে গিয়ে গোবিন্দর সেই বিচিত্র গাড়ি থেমে গেল। শুধু থেমে গেল নয়, বার কয়েক এমনভাবে দুলল যে মনে হল বলছে, আয় ছুঁড়ি তোর রং দেখি।
বিউটি গাড়িতে বসেই বিরক্তভাবে হর্ন দিল। গাড়ি সরাও।
গাড়ি সরল না। নড়ল না। ড্রাইভারের পাশে বসে গোবিন্দ দেখতে লাগল বিউটি কী করে।
মিশির বার কয়েক চেষ্টা করল গাড়ি নড়াবার। গাড়ি নড়ল না।
দরজা খুলে বেরিয়ে এল বিউটি। পরনে আজ শাড়ি ব্লাউজ। ফাঁপানো বব চুল। সটান গোবিন্দর গাড়ির কাছে এসে বলল, “গাড়ি না গন্ধমাদন?”
গোবিন্দ বলল, “ডজ!”
“ডজ না গজ! গাড়ি সরান।”
“আপনি আপনারটা সরিয়ে নিয়ে যান না।”
“কোথায় সরাব! একটা আদ্যিকালের লজঝড় গাড়ি এনে রাস্তা বন্ধ করে রেখেছেন দেখতে পাচ্ছেন না! যেমন মালিক তার তেমনি গাড়ি।”
গোবিন্দ স্মার্টভাবে বলল, “ওটা দু’ পক্ষই সমান।”
“মানে?”
“বুঝে নিন।”
“হ্যাং ইওর বুঝে নিন। ননসেন্স।”
“ইডিয়েট।”
“শাট আপ।”
“ইউ শাট আপ।”
লোক জমে যাচ্ছিল রাস্তায়। হঠাৎ মিশির আবার স্টার্ট দিতেই গাড়ি যাব যাব ভাব করল। গাড়ি সরিয়ে নিল মিশির।
বিউটি চড় দেখিয়ে চলে গেল। বলল, “দেখে নেব আপনাকে। অসভ্য ব্রুট!”
গোবিন্দ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলল, “যাও যাও আমার কাঁচকলা করবে। আমার দু’ পুরুষের বাস এই শহরে। ”
ডিসপেনসারিতে এসেই গোবিন্দ শাঁটুলদের খবর দিতে লোক পাঠাল। সুজনকে ডাকল ফোনে।
রোগীদের চটপট ছেড়ে দিল গোবিন্দ। মিক্সচারগুলো রিপিট করে দিল। কারও কাছ থেকে একটা পয়সা নিল না। পুজোর ক’দিন সে ফ্রি দেখে।
সামান্য বেলায় শাঁটুল সুজন মানিক চলে এল।
গোবিন্দ সকালের ঘটনা বলল।
শাঁটুল নাচতে লাগল। জয় মা জগদম্বা। দুর্গা মাই ফেভার করেছে রে জিজি। লেগে যা শালা। পেছনে লেগে থাক।
মানিক বলল, “না, কোনো মেয়ের পেছনে লাগার জন্যে আমরা নয়। আমি বলি কি গোবিন্দ, এবার তুই পাশ থেকে লাগ।”
“মানে?”
“পাশে গিয়ে পুশ করবি।”
“ওর গাড়ি তুবড়ে যাবে।”
“দে না, তুবড়ে দে।”
