গোবিন্দর মা বললেন, “ভাঙাচোরা গাড়ি কিনবি কেন? কিনলে ভাল দেখে কেন। ডাক্তার মানুষ একটা গাড়ি থাকলে দূরেও রোগী দেখতে যেতে পারবি।”
সুজন ফক্কুড়ি করে বলল, “ভাল গাড়ি শ্বশুর দেবে, গোবিন্দর বয়ে গেছে কিনতে।”
তিন
দিন পনেরো বিশ পরে এক ট্রাকের পিছনে দড়ি বেঁধে একটা গাড়ি এনে হাজির করল সুজন। যেন মালগাড়ি একটা। ডজ গাড়ি। বেশ পুরনো। চাকা চারটে ঠিকই আছে। একবার গ্যারাজে দিলেই গাড়ি গর্জন করে উঠবে।
গোবিন্দ গাড়ির বহর দেখে খুশি হলেও চেহারা দেখে সন্তুষ্ট হল না। বলল, “সুজন, সামনে দুটো মোষ জুততে হবে নাকি রে? এ গাড়ি চলবে?”
“ওর বাপ চলবে। তবে এ সব গাড়ির নিয়ম হল মাঝে মাঝে চলা, চলতে চলতে থামা। একনাগাড়ে চলতে পারবে না। বুড়ো হাড়। ম্যানেজ করে নেবে।”
শাঁটুল আর মানিক গাড়ি দেখে বলল, “ও শালা, একেবারে সার্কাসের হাতি। খাসা হয়েছে। খুঁটিতে বেঁধে রাখলেও আনন্দ। নে গোবিন্দ, মাখনকে ডাক। জলদি ঠিক করে ফেলুক।”
ডাক পড়ল মাখনের। ঝানু মিস্ত্রি। দেখে-টেখে বলল, “এ হল বনেদি গাড়ি। কলকবজা মেরামত করে নিলে চলবে। তবে খাবে বেশি। দিন, ঠিক করে দি। তবে বাবু, গদি আর রং পালটে নিতে হবে। নষ্ট হয়ে গেছে।”
গোবিন্দ সেদিন সকালেই আবার বিউটির হাসি শুনেছে রাস্তায় ; মেজাজ গরম ছিল। বলল, “কুছ পরোয়া নেই। এ গাড়ি রাস্তায় চালাতেই হবে মাখনদা, তোমার হাতে কোন গাড়ি না চলেছে।”
বাজার থেকে কুলিকাবারি ডেকে এনে মাখন মিস্ত্রি গাড়ি নিয়ে চলে গেল। বলল, মাসখানেক সময় লাগবে। মানে, পুজোর আগে দিয়ে দেবে গাড়ি।
ইতিমধ্যে কিছু কিছু ঘটনা ঘটেছে। বিউটি দাসের সঙ্গে গোবিন্দর দেখা হয়েছে দু বার। একবার গোবিন্দর বাড়ির সামনেই, কোথাও গিয়েছিল বিউটি। একলা। ফেরার পথে তার গাড়ির চাকা পাংচার হয়ে রাস্তায় পড়ে আছে। বিউটি রাস্তায় দাঁড়িয়ে। পরনে মেয়ে প্যান্ট আর শার্ট। মাথার চুল কাঁধ পর্যন্ত। পায়ে চটি। চোখে সানগ্লাস। রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিউটি লোক খুঁজছিল। চাকা পালটাতে হবে। গোবিন্দ সবে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সাইকেলে উঠবে, বিশ পঁচিশ গজ দূরে বিউটিকে দেখে থ। বিউটির এমন বেশও আগে দেখেনি। ব্যাপারটা বুঝে গোবিন্দর বগল বাজিয়ে নাচতে ইচ্ছে হল। কিন্তু তা তো সম্ভব নয়। কাজেই সে সটান চলে যাচ্ছিল। বিউটি রাস্তায় লোক খুঁজছে। গোবিন্দকে হাতে তালি বাজিয়ে ডাকল। গোবিন্দ শুনল না। সাইকেলের ঘন্টি বাজাতে বাজাতে চলে গেল।
আর একবার দেখা হয়েছিল গোবিন্দর ডিসপেনসারির কাছে। বিউটির গাড়ির হর্ন আটকে গেছে। থামছে না! বেজেই চলেছে তারস্বরে। গাড়ির বনেট খুলে বিউটি নিজেই কি যেন করছে। লোক জমে গেছে আশেপাশে। গোবিন্দকে দেখে বিউটি কড়া চোখে তাকাল।
এই দুটো ঘটনাই গোবিন্দকে যৎপরোনাস্তি খুশি করেছিল। বন্ধুদের কাছে বলেছিল—জোর জব্দ হয়েছে বিউটি।
শাঁটুল করিতকর্মা ছেলে। সে এর মধ্যে বিউটি দাসের ঠিকুজি কোষ্ঠী জেনে ফেলেছে। দাসসাহেবের দুই মেয়ে বিউটি আর আংটি। একটি ছেলে। বিউটি সবার বড়। সত্যি সত্যি মেয়েটা আর্কিটেক্ট, কোথা থেকে যেন পাসও করেছে। বিয়ে হয়নি, হব হব করছে। দাসসাহেব আর দাসগিন্নি দুজনেই, মানুষ ভাল। তবে মেয়ে অন্ত প্রাণ। মেয়ে যা চায় তাই পায়। দাসগিন্নি মোটেই পছন্দ করেন না মেয়ে গাড়ি চালিয়ে ঘুরে বেড়াক, কোথায় কি অঘটন ঘটবে—তখন বিয়ে দিতে পারবেন না মেয়ের। তার চেয়ে ভোঁদা ড্রাইভারকে নিয়ে ও ঘুরুক না কেন। মেয়ে সে-কথা শোনে না। গাড়ি সে নিজেই চালাবে। তিন বছর ধরে চালাচ্ছে। লাইসেন্স পেয়েছে একবারে।
সব শুনে-টুনে মানিক বলল, “শাঁটুল, তুই কোনো রকমে একটা এনট্রি নিয়ে ফেল দাস ফ্যামিলিতে। তারপর জাল ছিঁড়ে বের হয়ে আসবি।”
শাঁটুল বলল, “খুব চেষ্টা করছি। আমার মার মাসির মামাতো বোনের ভাশুর-ঝি গোছের একটা সম্পর্ক পাচ্ছি দাসগিন্নির। কিছু একটা পাতাতে না পারলে ঢুকি কি করে?”
চার
মাখন মিস্ত্রির গ্যারেজে গোবিন্দর ডজ তৈরি হচ্ছিল। গোবিন্দ বন্ধুবান্ধব নিয়ে প্রায়ই দেখতে যেত। ছেলেবেলায় দুর্গাপুজোর আগে প্রতিমার খড় বাঁধা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে যেমন গোবিন্দরা রোজ ছুটে ছুটে ঠাকুর তৈরি দেখতে যেত, একেবারে সেই ভাবে গোবিন্দ আর শাঁটুলরা আসা যাওয়া শুরু করল গ্যারাজে।
মাখন মিস্ত্রি মিথ্যে বলেনি ; খুঁজে খুঁজে, জোড়াতালি মেরে মালপত্র জুটিয়ে গাড়িটাকে চালু করে দিল। মানে রীতিমত আওয়াজ করে গাড়ির ইঞ্জিন চলল। ইঞ্জিন আওয়াজ মারতেই শাঁটুল মাথার ওপর হাত তুলে নাচতে লাগল। গোবিন্দ বেজায় খুশি। মানিক বলল, “ফেরার সময় বাজারে কালীতলায় পুজো দিয়ে যাব।”
এখনও কিছু কাজ বাকি যন্ত্রপাতির। রং বাকি, গদি বাকি। এদিকে মহালয়া এসে পড়েছে। গোবিন্দ বলল, “মাখনদা, কুছ পরোয়া নেই ; যা চাও পাবে, ফিনিশ করে দাও। ষষ্ঠীপুজোর আগের দিন গাড়ি চাই।”
মাখন বলল, “রং কি হবে বাবু?”
মানিক বলল, “ব্রাইট রং। লাল, নীল।”
শাঁটুল বলল, “না না, লাল-ফাল নয়। কেলো ষাঁড় লাল দেখলে ভাববে তার . কমপিটিটার এসেছে। হলুদ হোক।”
গোবিন্দ বলল, “হলুদ আবার রং নাকি?”
শাঁটুল বলল, “গাত্রহরিদ্রা বলে একটা কথা আছে না—তাই বলছিলাম।”
