সন্ধের পর, রাত্রের দিকে গোবিন্দর রোগীপত্র বড় থাকে না। সে নতুন ডাক্তার। এই শহরের ছেলে বলে একেবারে মাছি তাড়াবার অবস্থা হয়নি, নয়ত পুরনো চার পাঁচজন ডাক্তারের খপ্পর থেকে রোগী ছিনিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। অবশ্য গোবিন্দর বন্ধুরা তাকে সাহায্য করেছিল খুব। এখনও করে যাচ্ছে। গোবিন্দর ঢাক পিটিয়ে বেড়ানোই তাদের কাজ।
রাত্রের দিকে এই বন্ধুরা গোবিন্দের ডিসপেনসারিতে আড্ডা মারতে আসে। চা, মুড়ি, তেলেভাজা, সিগারেট, তাস খোশগল্প চলে প্রায় দশটা পর্যন্ত। তারপর যে যার বাড়ি ফিরে যায়।
সেদিন মানিক, শাঁটুল আর কল্যাণ এসেছিল। সুজন তো ছিলই।
বন্ধুদের কাছে সকালের ঘটনাটা নিবেদন করল গোবিন্দ। বলল, “খুব ন্যারোলি এস্কেপ করে গিয়েছি। লাগলে কোমর থেঁতলে যেত।”
শাঁটুল লাফ মেরে বলল, “আরে ওই তো দাসসাহেবের মেয়ে, বিউটি দাস।”
“বিউটি?”
“হ্যাঁ রে শালা, বিউটি। বাড়িতে সবাই বিউটি বলে। ভাল নাম জানি না। শুনেছি আর্কিটেক্ট। পাস করা।”
“যা যা—!”
“যা যা নয় ; একটা কিছু পাস করেছে ঠিকই।”
“মেয়েরা আর্কিটেক্ট হয় না”, গোবিন্দ মাথা নেড়ে বলল।
“হু নোজ…! আজকাল মেয়েরা কি না হয়। পাইলট পর্যন্ত হয় প্লেনের। সেদিন আর নেই জিজি যে মেয়েরা বাড়িতে বসে কাঁথা সেলাই করবে।” শাঁটুল বলল। সে মাঝে মাঝে গোবিন্দকে জিজি বলে, কেননা গোবিন্দর পুরো নাম গোবিন্দ গোপাল।
মানিক বলল, “বিউটি না বিচুটি রে?”
সুজন বেজায় জোরে হেসে উঠল।
“কিন্তু সকালের ঘটনার কী করা হবে?”
মানিক বলল, “দাসসাহেবের বাংলোয় ফোন কর।”
“ফোন করে—?”
“বিচুটিকে বল, বেশি পিঁয়াজি করলে ট্রাবলে পড়তে হবে। এটা আমাদের শহর। বেলাইন হলেই কুরুকুল চেপে পড়ব।”
গোবিন্দ বলল, “না, না, ফোন-টোন আবার কেন!”
“তা হলে?”
“ভেবে দেখ।”
বন্ধুরা ভাবতে লাগল।
দুই
গোবিন্দ শান্তশিষ্ট ধরনের ছেলে। সেদিনের ঘটনাটা সে অনায়াসেই ভুলে যেত। ফোস্কার মতন রাগও বেশিদিন গায়ে থাকে না। কিন্তু তার কপাল মন্দ। যদিও গোবিন্দ আর গাড়ি চাপা পড়ল না, কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে সে আরও বার দুই বিউটির মুখোমুখি হল। একবার, একেবারে বাজারের মধ্যেই ; আর-একবার রেল বাংলোর দিকে। বাজারে গোবিন্দ সাইকেল চড়ে যাচ্ছে, হঠাৎ পিছনে টি টি হর্ন। রাস্তা ছেড়ে দিয়েও বাঁচল না। পিছনের গাড়ি তাকে প্রায় সবজিওয়ালাদের গায়ে ফেলে চলে গেল। যাবার সময় বিউটি জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল, “কালা নাকি?”
আর রেল বাংলোর রাস্তায় পাশ কাটিয়ে যাবার সময় বিউটি শুধু হাসল। তার হাসিটাই এত খারাপ যে গোবিন্দর মতন শান্ত ধাতের ছেলের পিত্তি জ্বলে গেল। মেয়েটার স্পর্ধা তো কম নয়, গোবিন্দকে নিয়ে তামাশা করছে! এই শহর গোবিন্দর। তুমি কোথেকে উড়ে এসে এখানে ডাঁট মেরে যাবে।
রাত্রে বন্ধুদের কাছে গোবিন্দ জেহাদ ঘোষণা করে বলল, “আমায় গাড়ি দেখাচ্ছে! রেলের পেটি অফিসারের মেয়ের এত গরম! আমার বাপ ওরকম দশটা ফচকে গাড়ি কেনার টাকা রেখে গেছে। গাড়ি আমিও চড়েছি। দেখে নেব তোমায়।”
শাঁটুল বলল, “কী করবি?”
গোবিন্দ বলল, “গাড়ি কিনব।”
টেবিলের ওপর ঘুষি মেরে শাঁটুল বলল, “সাবাস শালা। জবাব নেই। একেই বলে মরদ। জিজি তোর মাথায় সাঙ্ঘাতিক বুদ্ধি খেলে। কেন, একটা বিশাল গাড়ি কেন। গাড়িতে গাড়িতে লাগিয়ে দে। হয় শালা আমরা মরি, না হয় বিউটিকে মারি।”
মানিক বলল, “না ভাই মারতে রাজি নই ; পুলিশ ধরবে। মরতেও পারব না—বউ কেঁদে কেঁদে মরবে।”
শাঁটুল ঝপ করে বলল, “তোর বউকে কাঁদতে দেব না মানকে। ভাবিস না।”
আড়চোখে চেয়ে শাঁটুলকে দেখল মানিক ; বলল, “আমার বউটাকে তুই টারগেট করেই থাক শালা ; কোননা লাভ হবে না।”
হাসাহাসির মধ্যে সুজন বলল, “গাড়ির আইডিয়াটা ভাল। নতুন।”
শাঁটুল বলল, “একেই সামনে সামনে লড়াই বলে। আগের দিনে এই রকম যুদ্ধ হত। তরোয়াল তো তরোয়াল। গদা তো গদা।”
গোবিন্দ বলল, “তা বলে তুমি ভেবো না—আমি একটা বিস্কুটের টিন কিনব। বড় গাড়ি কিনব, বড়। হেভি।”
ট্রাক?”
“না। বড় গাড়ি। এমনি গাড়ি। গদিঅলা গাড়ি। বসার গাড়ি। ”
মানিক তুড়ি বাজিয়ে বলল, “টেরিফিক হবে। সত্যি গোবিন্দ, তুই একটা গাড়ি কেন। আমরা চাপি। দিন কতক হইহই করি। একদিন শালা পিকনিক করে আসব তোর গাড়িতে চেপে।”
“মাল খাব,” শাঁটুল বলল।
গোবিন্দ বলল, “গাড়ি কিনব, তারপর দেখব—বিচুটি বিবির কত তেল!”
গাড়ি কেনাই সাব্যস্ত করে ফেলল গোবিন্দ।
সুজন আর গোবিন্দ দিন দুই পরামর্শ করল। নতুন গাড়ি কেনার অর্থ হয় না। তা ছাড়া শখ করার জন্যে নয়, শৌখিনতা করার জন্যেও নয়—নিতান্ত একটা মেয়ের শয়তানি ভাঙার জন্যে গাড়ি। কাজেই খরচাটা দেখতে হবে।
সুজন বলল, “তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরনো গাড়িগুলো লোহার দরে বিক্রি হয়ে গেছে। রানিগঞ্জের আশেপাশে কোলিয়ারিতে খুঁজলে এখনো দু’ একটা ফোর্ড, ক্যাডিলাক পাওয়া যেতে পারে। দামে ভেরি চিপ। একটু ঠকে ঠাকে নিলে জব্বর হবে।”
গোবিন্দ রাজি হয়ে গেল। তাদের এখানে মাখনের গ্যারাজ আছে। মিস্ত্রি ভাল, সব যন্ত্রই সারাতে পারে—মায় হারমোনিয়াম পর্যন্ত। লোক বলে বিশ্বকর্মার বাচ্চা।
কিন্তু ড্রাইভার? সেটার তেমন সমস্যা নয়, শাঁটুলের চেনা-জানা ড্রাইভার আছে—ধরে আনবে।
