“নেই?”
“না, আপত্তি কিসের! আমি তো তোমার খাঁচায় ঢুকে পড়েছি।…তবে পদবিটা পালটে নাও!…আ, ফার্স্ট ক্লাস কদমফুলের গন্ধ দিয়েছে।”
রাধা বলল, “শুধুই কি গন্ধ! কদমতলায় একেবারে শ্যাম রয়েছেন যে!”
“রাধাও।” শ্যাম হেসে বলল। দু’-জনেই ঘন হয়ে হাসতে লাগল হঠাৎ।
বিউটি এবং জিজি
গোবিন্দ চেম্বারে আসতেই রোগীরা থ’ হয়ে গেল। আগেই সমস্বরে আর্তনাদ করার কথা কিন্তু রাস্তা দিয়ে সাইকেল ঠেলে আসার সময় কেউ বুঝতেই পারেনি কাদায় গোবরে মাখামাখি, সুরকির লাল প্রলেপে রঞ্জিত হয়ে যে আসছে সে-ই গোবিন্দ ডাক্তার।
রোগীরা হুঁশ ফিরে পেয়ে ‘কি হল—কি হল’ করার আগেই গোবিন্দ রোগীদের বসার ঘর দিয়ে ভেতরে চলে গেল। কাদা, গোবর, সুরকির গন্ধ যেন ঘরের মধ্যে ঘিন ঘিন করতে লাগল কিছুক্ষণ, পাখার বাতাসে সেটা ক্রমশ উবে যেতে লাগল। চাটুজ্যেবাবু বললেন, “নিশ্চয় ষাঁড়ে গুঁতিয়েছে। বাজারের ওই ষাঁড়টা একটা ন্যুইসেন্স হয়ে গেল। মিউনিসিপ্যালিটি ষাঁড়টাকে কিস্যু করছে না।”
অনন্ত পেটের ব্যথায় ছটফট করছিল, বলল, “পাগলা কুকুরে তাড়াও করতে পারে। একটা পাগলা কুকুর বেরিয়েছে রাস্তায়।”
বাইরের ঘরে রোগীরা হরেক রকম আলোচনায় যখন মত্ত ভেতরে ততক্ষণে অন্য কাণ্ড হচ্ছে। ভেতরে খানদুয়েক ঘর, ছোট ছোট। একটা বাথরুম। দুটো ঘরের একটাতে গোবিন্দর কম্পাউন্ডার ওষুধপত্র তৈরি করে, অন্যটায় হাবিজাবি পড়ে থাকে, চা তৈরি হয়, মেয়ে রোগীদের জন্যে একটা সরু টেবিলও পড়ে আছে। গোবিন্দর কম্পাউন্ডারের নাম তারক। বয়েস এমন কিছু বেশি নয়, তবে ছেলে-ছোকরাও নয়।
তারক তার মনিবকে দেখে চক্ষু চড়কগাছ করে বলল, “এ কী স্যার?”
গোবিন্দ বাথরুমের দিকে ইশারা করে বলল, “জল আছে?”
বাথরুমে ঢুকে লাইফবয় সাবান মেখে স্নান করে ফেলল গোবিন্দ। চেম্বারে তোয়ালে থাকে। একটা অ্যাপ্রনও। অপ্রনের ব্যবহার বড় একটা হয় না। আজ সেই অ্যাপ্রনই লজ্জা বাঁচাল। স্নানের পর পরনে তোয়ালে আর গায়ে অ্যাপ্রন চাপিয়ে গোবিন্দ তার ছোট চেম্বারে গিয়ে বসল। প্রথমেই ফোন করল বাড়িতে—“তুরন্ত জামা-প্যান্ট পাঠাও।”
মা বললেন, “তারক খবর দিয়েছে। কী হয়েছে তোর?”
গোবিন্দ বলল, “বাড়ি গিয়ে বলব।”
গোবিন্দ ফাঁকিবাজ ডাক্তার নয়। সকাল আটটা থেকে যারা এসে হাঁ করে বসে আছে ডিসপেনসারিতে তাদের তাড়িয়ে দিতে পারে না। তার এখন পায়ের তলায় জমি শক্ত করার লড়াই। মাত্র এক বছরের প্র্যাকটিস। বাজার জমাতে হবে। নিম্নাঙ্গে তোয়ালে আর উধ্বাঙ্গে অ্যাপ্রন চাপিয়ে সে রোগী দেখল। তবে চেয়ার ছেড়ে উঠল না ; পাছে তোয়ালে খসে যায়।
রোগীরা জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে, ডাক্তারবাবু?”
“কিছু না। সাইকেল থেকে পড়ে গিয়েছিলাম …কালকে রাত্তিরে জ্বর কত ছিল? কাশি-টাশি হয়েছিল? সিরাপটা খেয়েছিলেন?”
রোগীদের চটপট হটিয়ে দিয়ে গোবিন্দ সবে পিঠ হেলিয়ে বসেছে এমন সময় তার মাসতুতো ভাই সুজন এসে হাজির। বাড়ি থেকে আসছে, হাতে কাগজে মোড়া প্যান্ট শার্ট। এসে বলল, “কিরে, কী হয়েছে তোর?”
গোবিন্দ হঠাৎ ফেটে পড়ে বলল, “আই উইল টিচ দেম এ লেসন।”
“কিন্তু ব্যাপারটা কী?”
“দে, আগে লজ্জা বাঁচাই।”
প্যান্ট জামা পরা হয়ে যাবার পর তারককে ডাকল গোবিন্দ। চা আর সিগারেট চাই। সুজনের কাছ থেকে সিগারেট নিয়ে ধরাল। বলল, “তুই এখানকার কিছু চিনিস না। বুঝতে পারবি না। তবে কথাটা হল, পুরনো বাজারের ঠিক পরেই তেঁতুলতলার মোড়ে একটা শার্প টার্ন আছে। একপাশে এঁদো পুকুর আর খাটাল। উল্টো দিকে কোন বেটার এক মোকাম তৈরি হচ্ছে। রাস্তাটা ভাঙা-চোরা, সরু। ওই জায়গায় আর একটু হলেই গাড়ি চাপা পড়তাম মাইরি।”
“গাড়ি চাপা? বলিস কি! এই শহরে গাড়ি চাপা?”
“কেন, এ শহরটা কি ফেলনা! তোদের রানিগঞ্জের চেয়ে টেন টাইমস বেটার।”
“তা হল কী?”
“হল এই যে, একটা মেয়ে ভাই গাড়ি চালিয়ে এসে প্রায় মেরে দিয়েছিল। কোনো গতিকে প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে প্রথমে খাটাল, তারপর সুরকির গাদায়।”
“দু’দিকেই পড়লি কি করে?”
“পেছন থেকে তাড়া করল যে, আমি খাটালে—আর আমার সাইকেল সুরকির গাদায়।”
“কিছু বললি না?”
“বলবার অবস্থা রেখেছিল! সামলে উঠতে উঠতে পালাল। যাবার সময় হাসতে হাসতে বলল, সরি।”
সুজন জোরে সিগারেট টানল, “তোদের এই শহরে মেয়েরা গাড়ি চালায়?”
“না। আমি লাইফে দেখিনি। এটা হালে আমদানি, কোন রেল অফিসারের মেয়ে। দাসসাহেব।”
“গাড়ির লাইসেন্স আছে?”
“আই ডোন্ট থিংক।”
“তা হলে থানায় খবর দে, সুজন বলল।
“থানা?”
“লাইসেন্স নেই গাড়ি চালাচ্ছে। মানুষ চাপা দিচ্ছে. …এ তো অফেন্স। “
গোবিন্দ কি যেন ভাবল, তারপর বলল, “থানায়-ফানায় যাওয়া ঠিক নয়। বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, থানা মাড়ালে আঠাশ ঝামেলা। তা ছাড়া একটা মেয়ের নামে থানায় লাগানো বিচ্ছিরি ব্যাপার।”
সুজন ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারা সমবয়স্ক এবং বন্ধু। সুজন ঠাট্টা করে বলল, “তা হলে আর কী করবি, গাড়ি চাপা পড়।”
গোবিন্দ অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “না না, এটা অন্যায়। আমার বলে কথা নয়, যে কোনো লোককেই চাপা দিতে পারে, শি ইজ ডেনজারাস। “
তারক চা সিগারেট আনিয়ে দিল।
গোবিন্দ বলল, “ভাল করে ভেবে দেখতে হবে কী করা যায়—”
