সিধু সবই বুঝতে পেরে গেছে এতোক্ষণে, শ্যামের দিকে ঘাবড়ানো-চোখে চাইল। নিচু গলায় বলল, ‘আলোর সুই কোথায় রে?’…শ্যাম ফিসফিস করে বলল, “কোন্ আলো?”
রাধা চিৎকার করে বলল, “কানে কানে কথা বলার কিছু নেই। আমরা যা বললাম তাই করব।”
সিধু কাষ্ঠ-হাসি হেসে বলল, “আজ্ঞে হ্যাঁ, আপনারা যা ভাল বোঝেন করবেন। কিন্তু প্রমাণটা… ?”
রাধা তার হাতের ছোট ফাইল ওলটালো। বলল, “আমরা কলকাতার কাগজের অফিস থেকে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, এখান থেকে মানি অর্ডারে টাকা পাঠানো হয়েছে শ্যামচন্দরের নামে। কলকাতায় আমাদের লোক আছে। কবে কত টাকা পাঠানো হয়েছে তাও বলতে পারি। এগারোই জুন আর পয়লা জুলাই। কাগজের অফিসে আমরা চিঠি লিখেছিলাম, তার জবাবও এখানে আছে—দেখতে চান?”
শ্যাম টুল সমেত মাটিতে হাঁটু গেড়ে পড়ল। সিধু একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তড়াক করে দাঁড়িয়ে উঠে হাত জোড় করে কি বলতে গেল। কেউ কোনো কথা শুনল না। আলো সিধুকে চিমটি কাটল বেজায় জোরে, লিলি সিধুর ছেঁড়া পকেট ধরে টান মেরে বাকিটাও ছিঁড়ে দিল। অনিমা শ্যামের পিঠে গুম্ মেরে এক কিল বসিয়ে দিল, আর পার্বতী কুঁজোর জল শামের মাথায় ঢেলে দিল। ওরই মধ্যে কে যেন সিধু এবং শ্যামকে সেফটিপিন দিয়ে ফোটাল, জ্যামিতি বাক্সের দু-মুখো কাঁটা দিয়ে খুঁচিয়ে দিল, দু-চারবার স্কেলের বাড়ি পড়ল।
শ্যাম এবং সিধু পাশাপাশি মাটিতে বসে জোড় হাতে ক্ষমা ভিক্ষা করতে করতে বলল, “আর না, প্লিজ, মরে যাব।”
রাধা হুকুম করল কড়া গলায়। “এই ওদের ছেড়ে দে।”
মেয়েরা সরে দাঁড়াল।
রাধা বলল, দোষ স্বীকার করছেন?”
শ্যাম বলল, “আজ্ঞে হ্যাঁ, করছি। …আপনার পায়ে পড়ছি…”
সিধু বলল, “আমাদের মাপ করুন।”
রাধা বলল, “কিন্তু এই যে আমাদের ইজ্জত নষ্ট করা হয়েছে, এর কি হবে?”
শ্যাম বলল, “যা বলবেন তাতেই রাজি। আমাকে প্লিজ পুলিশে দেবেন না। পুলিশের নাম শুনলেই আমার ডিসেন্ট্রি হয়। মামলা যদি করেন—সে স্ক্যাণ্ডেলাস হবে। শহরে টিকতে পারব না। বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে। চাকরি যাবে।”
নবনীতা বলল, “এ জ্ঞান আগে হয়নি?”
সিধু বলল, “আজ্ঞে না, হলে কি এ-পথ মাড়াই।”
রাধা বলল, “অত সস্তায় চিঁড়ে ভেজে না। এই অপমান, দুর্নাম, সম্ভ্রমহানির ক্ষতিপূরণ কে দেবে?”
শ্যাম এবং সিধু মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।
শ্যাম বলল, “আজ্ঞে, আমাদের কি আছে বলুন—?”
সিধু বলল, “যৎসামান্য মানুষ আমরা, ক্ষতিপূরণ কি করেই বা দিতে পারি?”
রাধা বলল, “তা হয় না। শুধু হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না।”
“মুচলেকা দিচ্ছি।” সিধু বলল।
এমন সময় ঘরের মধ্যে হাসির অট্টরোল পড়ে গেল। মেয়েদের ভিড় সরিয়ে মণিমালা কোথা থেকে এসে হাজির। পেছনে হন্তদন্ত ললিত আর দত্তগুপ্ত।
রাধা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে একেবারে অন্য মূর্তি হয়ে গেল। হেসে, গড়িয়ে আহ্লাদে আটখানা হয়ে বলল, “একেবারে কাঁটায় কাঁটায় এসে পড়েছে, মণিদি, ব্যাঙ কুয়োয় পড়েছে।”
মণিমালা হাসি চাপতে পারছিল না। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে বলল, “এ কি করেছিস রে ওদের? ওমা ছি ছি! আপনারা ভাই উঠে বসুন।”
শ্যাম সিধুর দিকে তাকাল, সিধু শ্যামের দিকে, তারপর দুজনেই ললিত ও দত্তগুপ্তর দিকে তাকাল। ললিতরাও কিছু কম হতবাক নয়। সিধু মণিমালার দিকে তাকিয়ে শেষে বলল, “বউদি, এটা খুব আনফেয়ার কাজ হল। আপনি ট্রেচারি করলেন আমাদের সঙ্গে।”
শ্যাম বলল, “কনস্পিরেসি।”
ললিত ক্ষুব্ধ গলায় বলল, “তুমি আমাদের গাছে চড়িয়ে মই কেড়ে নিলে বউদি, এখন বুঝতে পারছি তোমার চালটা কাদের তরফের ছিল।”
দত্তগুপ্ত বলল, “আমাগো খুব খেলাইলেন, বউদিদি। আপ্নারে দণ্ডবৎ।”
মেয়ের দল অট্টহাসি হেসে উঠল। নানা গলার, নানা সুরের হাসি। হাসির চোটে ঘরটা ফেটে যাবার জোগাড়।
মণিমালার নাকে-চোখে জল এসে গেছে হাসতে হাসতে। নাক-চোখ মুছে হাসি সামলে বলল, “কেন ভাই, দোষটা কি করলাম। আপনাদের কত হা-হুতাশ ছিল। আমি বরং বসন্ত বিলাপের ঘরে এনে বসিয়ে দিলাম এরপর যার যেমন, কপাল…”
আলো বলল, “কপাল কেন বলছেন মণিদি, বলুন কেরামতি। কার কত কেরামতি।”
সিধু আলোর দিকে তাকাল। তারা উঠে দাঁড়িয়েছে। সিধু দেখল, আলোর সুইচটা হাতের কাছেই। কেরামতি করতে অবশ্য সাহস করল না।
ললিত একপলক নবনীতার দিকে তাকাল। তাকিয়ে কী রকম লজ্জা পেল।
দত্তগুপ্ত ঝট্ করে ভূগোলদিদি পার্বতীকে চোখ টিপে দিয়েই গম্ভীর হয়ে গেল।
মণিমালা বলল, “রাধা এদের তাহলে…”।
রাধা বলল, “এখনকার মতন থাক। তবে ক্ষতিপূরণ তো দিতেই হবে। পরে দেবে। আমরাও ভেবে দেখি।”
সিধু বলল, “তেমন তেমন হলে দিতে পারি। মুচলেকাও।”
শ্যাম বলল, “ওয়ার্ড অফ অনার বউদি। …আমরা এবার যাই?”
“যান।” রাধা সম্মতি দিল।
যাবার সময় মেয়েরা রসিকতা করে একটু উলু দিয়ে নিল।
মাস খানেক হয়নি, ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে সন্ধেবেলায় শ্যাম আর রাধা একই সঙ্গে একটা রিকশা করে স্টেশন থেকে ফিরছিল।
রেল অফিসের সামনে জোড়া কদম গাছের তলায় এসে শ্যাম বলল, “তোমার পদবিটা বড় ফেরোশাস রাধা, সিংহী। ওটা বদলে নিলে কেমন হয়?”
রাধা শ্যামের কাঁধের কাছে আলগা ঠেলা দিয়ে বলল, “বদলে নিলেও কি তোমার লাভ হবে কিছু, আমি সিংহীর মতনই থাকব।”
“তা থাকো। তাতে আমার আপত্তি নেই।”
