সিধু শালা আসবে তো? নাকি ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে এ-পথ আর মাড়াবে না? বন্ধুর বিপদে সিধু যদি না আসে তবে শ্যাম তার সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখবে না। সিধু, ললিত, দত্তগুপ্ত—সকলেরই এখানে এসে দেখে যাওয়া উচিত শ্যাম কেমন করে কাদায় ডুবে গেছে। একা শ্যাম কেন—ওই তিনটেরও একই হাল হওয়া দরকার, শ্যাম একা জেলে যেতে পারবে না। মণিমালা বউদির কথায় খুব নেচে ছিল সবাই। এবার ঠেলা সামলাও। বউদির ওপর শ্যামের রাগ হচ্ছিল, স্ত্রীবুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী।
শ্যাম আবার হাঁচল, একসঙ্গে বার পাঁচেক।
রাধা ভুরু কুঁচকে ধমকে উঠে বলল, “হাঁচির হাট বসিয়ে দিচ্ছেন যে! হাঁচিতে রোগ ছড়ায় সে জ্ঞান নেই। হাঁদা কোথাকার!”
শ্যাম তাড়াতাড়ি নাকে মুখে রুমাল চাপা দিল।
নবনীতা রসিকতা করে বলল, “শ্যামবাবুর জন্যে একটু আদা-চা এনে দে, আলো।”
আলো গা দুলিয়ে ঘাড় হেলিয়ে বলল, “চা খাবেন নাকি শ্যামবাবু?”
মাথা নাড়ল শ্যাম; না খাবে না। আলো—সিধুর ফ্লুরোসেন্ট ল্যাম্প—সত্যিই বেশ জ্বলজ্বলে। বড় বড় চোখ, ডাসা নাক, বেশ স্লিপ্মারা চেহারা।
নবনীতা আর রাধা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে যদিও তবু শ্যাম বুঝতে পারছে—কথাটা শ্যামদের নিয়ে, পুলিশ ডাকা মামলা করা এইসব সংক্রান্ত। শ্যামের মাথা ধরে উঠছিল।
এমন সময় নিচের দিকে হইহই। সিঁড়িতে দুপদাপ। তারপর সিধুর গলা।
সিধুকে চারপাশ থেকে ঘিরে মেয়েরা ঘরে ঢুকল। সিধুর অবস্থা ভাল নয়, একেবারে ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে, মাথার চুল এলোমেলো, জামার একটা পকেট ছিঁড়ে গেছে, সিধু জড়সড়, কাঠ।
সিধু ঢুকতেই শ্যাম প্রায় ছেলেমানুষের মতন ডুকরে উঠল, “সিধু!”
সিধু সিংহবাহিনীর মুখোমুখি হয়ে একেবারে ভূত দেখার মতন আঁতকে উঠল। তার গলায় আর শব্দ বেরোচ্ছে না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিধু কিম্ভূত ধরনের একটা শব্দ করল।
রাধা মেয়েদের বলল, “আর একটা টুল-ফুল এনে দে ওকে। ভিরমি খেয়ে না পড়ে যায়!”
শ্যাম আবার ডাকল, “সিধু।”
ধাতস্থ হতে সিধুর একটু সময় লাগল। কিন্তু ধাতস্থ হবার পর সিধু বেশ তাড়াতাড়ি সাহস সংগ্রহ করতে লাগল। একটা ভাঙা মোড়া এনে দেওয়া হয়েছিল সিধুকে বসতে। সিধু শ্যামের পাশে বসল।
রাধা বলল, “নামটা কি সিদ্ধেশ্বর গাঙ্গুলী?”
সিধু মাথা হেলিয়ে সায় দিল। বলল, “আমাকে এখানে আনার মানেটা কি?” বলে শ্যামের দিকে তাকাল। “কি হয়েছে রে?”
শ্যাম অসহায়ের মতন বলল, “আমাকে এঁরা রাস্তা থেকে ধরে এনেছেন।”
“ধরে এনেছে!…কচি খোকা!” আলো টিটকিরি মেরে মন্তব্য করল।
সিধু আলোর দিকে তাকাল। “শ্যাম নিজে এখানে আসতেই পারে না।”
লিলি বলল, “আসবে কি করে? এলে যে পা খোঁড়া করে দেব।”
রাধা বলল, “চুপ! তোরা চুপ করে থাক।”
মেয়েরা চুপ করে গেল।
রাধা সিধুকে বলল, বেশ গম্ভীর পরিষ্কার গলায়, “আপনার বন্ধুকে আমরা রাস্তা থেকে ধরে এনেছি। হ্যাঁ—এনেছি।”
“এটা কিডন্যাপিং…”
নবনীতা হাসল। বলল, “কেন এনেছি জানেন?”
“না।”
রাধা বলল, “আপনারা ইতর, অসভ্য, জন্তু…।”
সিধু চোখ বড় বড় করে চেয়ে থাকল।
রাধা বলল, “ধরে আনার কারণ আপনার পেয়ারের বন্ধু শ্যামচন্দরকে বলা হয়েছে শুনে নিন।”
সিধু শ্যামের দিকে তাকাল। অবশ্য সিধু এতোক্ষণে সবটাই বুঝতে পেরেছে।
শ্যাম বলল, “খবরের কাগজে—রবিবারের কাগজে—একটা বিয়ের বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে ভাই। এখানকার, এ বাড়ির ঠিকনা দিয়ে। তাতে নাকি লেখা আছে—এখানে নানারকম—ভেরিয়াস টাইপের মেয়ে পাত্রী আছে, বিয়ের যুগ্যি। …সেই বিজ্ঞাপন বেরুবার পর চিঠি এসেছে অনেক…”
বাধা দিয়ে একজন কে বলল, “ঘটকও এসেছে।”
শ্যাম নিজের কথা শেষ করল। “এঁরা বলছেন বিজ্ঞাপনটা আমরা দিয়ে দিয়েছি। দেখ তো ভাই, কী রকম খারাপ অ্যালিগেশান।”
সিধু হঠাৎ বলল, “মাইরি আর কি!”
সঙ্গে সঙ্গে আলো জিভ ভেঙিয়ে বলল, “আহা, ইললি রে…”
রাধা চেয়ারে বসে সিধুকে ধমকে উঠল জোরে, “ছোটলোকের আড্ডা নাকি এটা? মাইরি-ফাইরি চলবে না। ভদ্র ভাষায় কথা বলুন।”
সিধু বলল, “ইললি বললে দোষ নেই?”
“বাজে কথা থাক। কাজের কথার জবাব দিন।”
“বলুন।’
“বিজ্ঞাপনটা আপনারা দিয়েছেন।”
“আপনারাও দিতে পারেন।”
আলো ছুটে এল, যেন সিধুর মাথার চুলের ঝুঁটি ধরেই নেড়ে দেবে। বলল, “আমরা বিজ্ঞাপন দিয়েছি। মিথ্যেবাদী, পাজি…”
সিধু বলল, “আমরাই বা দেব কেন? বিজ্ঞাপন দিতে পয়সা লাগে। আপনাদের জন্যে আমরা চ্যারিটি করব কেন?”
একটু চুপ। নবনীতা মৃদু হেসে বলল। “তা ঠিক। তবে এখানে সেটা করা হয়েছে। বিজ্ঞাপনের টাকা আপনারা দিয়েছেন।”
সিধু এবার সন্দিগ্ধ হল। “বাজে কথা, মিথ্যে কথা। আমাদের এতে স্বার্থ কি?”
আলো বলল, “ষোলো আনা স্বার্থ।”
সিধু বলল, “এক আনাও নয়।”
রাধা বলল, “বেশ। কিন্তু সিধুবাবু, গোঁসাই-মশাই, যদি আমরা দেখাই যে এই বিজ্ঞাপন আপনারা দিয়েছেন, তা হলে?”
সিধু ভেতরে ভেতরে ভয় পেলেও মুখে প্রকাশ করল না। বলল, “প্রমাণ থাকলে অন্য কথা।”
“থাকলে কি হবে আগে বলুন?”
“কি আর—” সিধু ঘাবড়ে গেল, “আমাদের যা খুশি করবেন আপনারা।”
“আমরা প্রথমে পুলিশে যাব। শ্যামচন্দরকে আজই হাজতে ঢোকাব। আর আপনাদের নামে মামলা করব। আমাদের এতগুলো মেয়ের সামাজিক ও পারিবারিক মান সম্মান সম্ভ্রম নষ্ট করার জন্যে। বুঝলেন?”
