রাধা ততক্ষণে আবার জোরে ধমকে উঠেছে। “কে দিয়েছে বিজ্ঞাপন?”
শ্যাম আত্মরক্ষার জন্যে দিশেহারা হয়ে গেল। সর্বনাশ, তাদের কীর্তি যে ফাঁস হয়ে যাচ্ছে! ব্যাপারটা শাড়ি পোড়ানোর চেয়ে মারাত্মক, শ্যাম যদি স্বীকার করে নেয় তবে এই বসন্ত বিলাপের দল তার ছালচামড়া ছিঁড়ে নিয়ে ডুগডুগি বাজাতে বসবে।
চুপসোনো মুখে, গোঁ গোঁ শব্দ করতে করতে শ্যাম খানিকটা থুধুই গিলে ফেলল। অসহায়ভাবে মাথা নেড়ে বলল, “আজ্ঞে আমি কিছু জানি না। কিসের বিজ্ঞাপন?”
রাধা চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল। “জানেন না?…মিথ্যেবাদী, লায়ার চোর…।”
শ্যাম প্রায় হাতজোড় করে বলল, “সত্যি বলছি, বিশ্বাস করুন।”
“এই আলো—” রাধা রক্তচক্ষু হয়ে হাত বাড়ালো, “ওই পাখাটা দে তো, আজ আমি ওর মাথায় পাখার বাঁট ভাঙব।”
আলো একটা বিছানার পাশ থেকে একটা পাখা তুলে নিল।
শ্যাম বলল, “আপনারা সবাই মিলে আমার ওপর অত্যাচার করছেন।” বলার সময় দেখল পাখাটা সিংহবাহিনীর হাতের কাছে নিয়ে আলো দাঁড়িয়ে আছে।
“কাগজে বিয়ের বিজ্ঞাপন আপনারা দেননি?” রাধা ধমকে ধমকেই বলল, “আমাদের বাড়ির ঠিকানা দিয়ে পাত্র চাই বলে কে তাহলে বিজ্ঞাপন দিয়েছে?”
শ্যাম গোবেচারি ও ন্যাকা-বোকার মতন করে বলল, “আমি কি করে জানব। কিসের বিজ্ঞাপন ?”
রাধা হাতের ছোট ফাইল খুলে কিছু কাগজপত্র সরিয়ে, দুটো কাগজ বের করল। শ্যামের কাছে এগিয়ে এসে ভাঁজ করা কাগজের একটা জায়গা দেখাল, লাল পেনসিলের ঘেরা দেওয়া। শ্যাম দেখার ভান করল।
“এই বিজ্ঞাপন কে দিয়েছে?” রাধা জেরা শুরু করল।
“আমি জানি না।”
“মিথ্যুক, বেয়াদব। …..এই বিজ্ঞাপনে কি লেখা হয়েছে জানেন না আপনি?”
“কি করে জানব?”
“লেখা হয়েছে যে এই ঠিকানায় বামুন, কায়স্থ, বদ্যি উজ্জ্বল শ্যাম, শ্যাম, গৌরাঙ্গী, বয়স্ক, কম বয়স্কা চাকরি করা বহু পাত্ৰী আছে। বিবাহযোগ্যা এই মেয়েদের জন্যে পাত্র চাই।”
শ্যাম পর পর দুবার ঢোঁক গিলল।
“বিজ্ঞাপনটা ক’বার বেরিয়েছে জানেন?”
“আজ্ঞে না।”
“দু বার। দ্বিতীয়বার আরও নতুন নতুন কথা আছে।”
‘ও !”
“কত চিঠি এসেছে জানেন—এই ঠিকানায়?…কত চিঠি এসেছে অনিমা?”
“অনেক—প্রায় দুশো তো হবেই। এখনও আসছে।”
“তাহলে?” রাধা শ্যামের দিকে ছুরির মতন ধারালো চোখে তাকাল। “কি বলার আছে আপনার?”
বলার বাস্তবিকই কিছু নেই। ভেজা মাথায় বসে থাকতে থাকতে শ্যাম হাঁচল।
বিজয়া লিলির হাত থেকে জ্যামিতি বাক্সর দুমুখো ছুঁচলো কাঁটা কেড়ে নিয়ে এসে শ্যামের একেবারে হাতের কাছে দাঁড়াল, দাঁড়িয়ে কাঁটাটা শ্যামের মুখের কাছে তুলে বলল, “ক্যাবলার মতন করে তাকাবেন না, চোখে ফুটিয়ে দেব প্যাঁক করে।”
শ্যাম ভয়ে চোখের পাতা বুজে ফেলল।
আলো বলল, “অত দরকার কি, পুলিশে দিয়ে দে না! পুলিশের জিম্মায় দিয়ে দে। আর সঙ্গে সঙ্গে সম্ভ্রমহানির একটা মামলা সবাই মিলে ঠুকে দি। দেখি ধর্মের ষাঁড় কোথায় পালায়?”
শ্যাম ভয়ে আঁতকে উঠে বলল, “মামলা?”
“বাঃ, মামলা করব না—” আলো বলল, “আমাদের মান সম্মান সম্ভ্রম, আমাদের পারিবারিক সুনাম নষ্ট করে যারা আমাদের সম্মানহানি করছে তাদের নামে মামলা করব না!…এতগুলো মেয়ের একসঙ্গে মামলা দেখি, কোর্ট কি করে ছাড়ে আপনাদের।”
শ্যাম আর কোথাও কোনো পথ দেখতে পেল না। শালা শেষপর্যন্ত। মেয়েছেলেদের ব্যাপার নিয়ে মামলা? ক্রিমিন্যাল কেস হবে নাকি? হতে পারে। বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে, সারা শহরে রই রই পড়ে যাবে, জেলে গিয়ে ঘানি ঘোরাতে হবে। শ্যাম যেন ঘামতে লাগল। “আপনারা আমায় একলা পেয়ে যা খুশি বলছেন।”
ভিড়ের মধ্যে থেকে কলেজের টীচার নবনীতা এগিয়ে এসে বলল, “রাধা, উনি যদি এ-সময় কাউকে ডাকতে চান ডাকতে পারেন। ওঁদের তরফে যদি কিছু বলার থাকে শুনে নেওয়া যাক।”
রাধা বলল, “বেশ। একজনকে ডাকতে পারেন। যে কোনো একজনকে।”
“কি করে ডাকব! আমি এখানে?”
“দু’লাইন লিখে দিন, আমরা আনিয়ে নিচ্ছি। …ওবাড়িতে আড্ডায় নিশ্চয় পাব।”
লিলি সঙ্গে সঙ্গে কাগজ কলম এনে দিল। রাধা বলল, “কোনো আজে বাজে কথা লেখা চলবে না। কোথায় আছেন তাও নয়। শুধু লিখবেন—বিশেষ জরুরী, একবার আসতে। লেখাটা আমরা দেখে নেব।”
শ্যাম সামান্য ভাবল। কাকে এ-সময় আসতে লেখা যায়? সিধুকেই লেখা যাক। সিধু নিশ্চয় এসে বসে আছে আড্ডায়। সিধুটা একটু গুণ্ডা গোছের। দত্তগুপ্ত কিছু করতে পারবে না। ললিতটা আরও নার্ভাস। শ্যাম লিখল: “সিধু, পত্রপাঠ চলে আসবি। ভীষণ বিপদ।”
লেখাটা রাধা পড়ে দেখল, তারপর বিজয়াকে দিয়ে বলল, “যা, আর-একটাকে ধরে আন। ওবাড়িতে কেউ যাবি না তোরা, নিচে থাকবি। ঝিয়ের ছেলেটাকে পাঠিয়ে দে। বলে দিস কিছু না বলে যেন।”
বিজয়ারা একদল দৌড়ে ঘর ছেড়ে চলে গেল।
ঘরে শ্যাম টুলে বসে। আর ওদিকে রাধা, চেয়ারে ফিরে এসে বসেছে। নবনীতা বিছানায় বসে আস্তে আস্তে পায়ের পাতা কাঁপাচ্ছিল: আলো দরজার দিকে একটা টেবিলের কোণায় আধ-বসা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রায় চুপচাপ। শ্যাম আটক-করা চোরের মতন হতাশ হতোদ্দম হয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল। ঘরের জানলায় মোটা শিক, রাস্তার বারান্দার দিকের দরজাটা বন্ধ, ঝিপঝিপে বৃষ্টি পড়েই চলেছে। শ্যাম যে বারান্দা থেকে নিচে রাস্তায় লাফ মারবে তার সাহস নেই, উপায়ও নেই। দৌড় মেরে নিচে পালানোও অনর্থক, নিচে পুরো ফৌজ দাঁড়িয়ে আছে সিধুকে ধরে আনার জন্যে। অগত্যা শ্যাম ঘরের জিনিসপত্র, বিছানা, শাড়ি জামা, এটা-সেটা লক্ষ করতে লাগল। করতে করতে সে দেখল, কোণার দিকে দড়ির আলনায় বেশ বাহারী একটা ব্রেসিয়ার ঝুলছে। এই ঘরে কে কে থাকে শ্যাম জানে না; প্রতিমাদি থাকে শুনেছে; আর কে? শ্যাম আড়চোখে ব্রেসিয়ার দেখতে লাগল এবং নানা রকম অনুমান করছিল।
