“পুলিশ ডেকে আনব। বৃষ্টির মধ্যে সন্ধেবেলায় মেয়েদের হোস্টেলে ঢোকার জন্যে পুলিশে ধরিয়ে দেব।”
পুলিশের নামে শ্যামের সমস্ত পেটটা আমাশার ব্যথার মতন মোচড় দিতে লাগল। সর্বনাশ ! এরা সব ছকে রেখেছে যে!
অগত্যা শ্যাম এগুতে বাধ্য হল। বিজয়া শ্যামের আগে ; বাকি মেয়েরা শ্যামের পেছনে। সদ্য বন্দী শত্রুর মতন মেয়েরা শ্যামকে আগলে নিয়ে দোতলায় উঠে এল।
লিলি বলল, “প্রতিমাদির ডিউটি, আজ ফিরবে না। রাধাদি বলেছে—প্রতিমাদিদের ঘরেই নিয়ে যেতে।”
বিজয়া বলল, “রাধাদিকে ডাক। আর সবাইকে।”
শ্যামকে ঠেলে নিয়েই ওরা একেবারে শেষ প্রান্তের ঘরে ঢোকাল। ঘরে বাতি জ্বলছিল।
শ্যাম ঘরটা একবার দেখল : গোটা তিনেক তক্তপোশ, বিছানা পাতা ; কাঠের আলনা, দড়ির আলনা, শাড়ি সায়া জামা ঝুলছে; কাঠের সস্তা র্যাক আর টেবিল—বইপত্র, কাগজ মাথার তেল, ক্রীম পাউডার, চুলের ফিতে, ওষুধের শিশি আরও কত কি।
শ্যামকে কেউ বসতে বলল না। বেচারি দাঁড়িয়ে থাকল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আলোতে সে তার শত্রুপক্ষকে দেখতে লাগল। সব কটার মুখে চাপা হাসি, বিজয় গর্বের হাসি তো বটেই, তার সঙ্গে বাঁকা হাসিও মেশানো। প্রচ্ছন্ন একটা কৌশলের আভাসও যেন ওদের চোখে মুখে ফুটে আছে।
লিলি খোঁচা মেরে বলল, “তোয়ালে এনে দেবে নাকি? গা-মাথা মুছবেন?”
শ্যাম মাথা নাড়ল, না।
অনিমা বলল, “একটা ময়লা গামছা এনে দে বরং, ওই মাথা আর তোয়ালে দিয়ে মোছে না।”
আবার এক দফা হাসি উঠল। শ্যাম দেখল, নিচে থেকে তাকে যারা ধরে এনেছিল দোতলায় এসে তাদের দল আরও ভারি হয়ে উঠেছে। আলো চ্যাটার্জী, পার্বতী সেন, মীনা গুপ্ত—সবাই আছে। শ্যামের কান্না পাচ্ছিল।
এমন সময় পায়ে শব্দ তুলে এবং গলায় আওয়াজ দিয়ে সিংহবাহিনী—অর্থাৎ সেই অনুরাধা সিংহ এল। মেয়েরা সবাই গা সরিয়ে তাদের রাধাদি—অর্থাৎ, বাহিনীর সবাধিনায়িকার জায়গা করে দিল। রাধার হাতে একটা ফাইল, আর চোখে চশমা।
নাক কোঁচকালো, ঠোঁট ওলটালো তারপর অনুরাধা ঘরে ঢুকে শ্যামকে একবার আপাদমস্তক তির্যক চোখে, সঘৃণায় লক্ষ করল, এগিয়ে গিয়ে জানলার দিকে দাঁড়াল। শ্যামের পা তখন রীতিমত থরথর করে কাঁপছে, গলার কাছে সোডার গুলির মতন ভয়ের একটা শক্ত বল আটকে আছে। শ্যামের মনে হল সে একেবারে অনুরাধার পায়ের ওপর পড়ে পা জড়িয়ে ধরে।
একটা চেয়ার টেনে অনুরাধা—বা রাধা বসল। বসেই হুকুম করল, “ওকে একটা টুল দে বসার।”
কে যেন একটা টুল এনে দিল।
রাধা গম্ভীর গলায় বলল, “দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বলির পাঁঠার মতন কাঁপতে হবে না। ওই টুলে বসা হোক।”
দাঁড়িয়ে থাকার অবস্থা শ্যামের ছিল না। সে সত্যিই বলির পাঁঠা। শ্যাম নিজেকেও নিজে পাঁঠা বলল। এবং অসহায়ের মতন বসল।
শ্যামকে আবার ভাল করে দেখে রাধা বলল, “মাথাটাথা মোছা হবে নাকি?”
মাথা নাড়ল শ্যাম। না।
“ভাল। ……তা মশায়ের নাম কি শ্যামচন্দ্র?”
“না, শুধু শ্যাম।”
“শ্যামের পর কিছু নেই?”
“না” শ্যাম বলল, বলেই সে এত বিপদের মধ্যে একটা বিদ্বেষপূর্ণ রসিকতা করে বলল, “শ্যামের পাশে মানাবার মতন কিছু এখনও খুঁজে পাইনি।”
রাধা ইঙ্গিতটা বুঝল। মেয়েরাও ঠোঁটের ফাঁকে হেসে ফেলেছে। খানিকটা যেন ব্যঙ্গ করেই রাধা বলল, “টিকটিকির আবার পাখা গজাবার সাধ !…তা কেষ্ট ঠাকুরের বাবার নাম কি অনাদিচরণ বাবু?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“পলাশ পাড়ার দিকে থাকা হয়?
“হ্যাঁ।”
“বয়স কত?”
“চৌত্রিশ।”
“চাকরি বাকরি তো মোটামুটি ভালই করা হয়।”
“চাকরি একটা করা হয়।”
রাধা এবার মুহূর্ত কয় চুপ করে থেকে সঙ্গিনীদের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখে যেন কি কথা বলে নিল। পরে বলল, শ্যামকেই, “সেদিন স্টেশনে আমার কাপড় পুড়িয়ে ছিল কে?”
শ্যাম এভাবে চোরা মার খাওয়া বরদাস্ত করতে পারছিল না। বলল, “আমি সেদিন ইচ্ছে করে আপনার শাড়ি পোড়াইনি। অ্যাকসিডেন্টলি হয়ে গেছে। আমার অবশ্য কেয়ারফুল হওয়া উচিত ছিল। আমি তার জন্যে ক্ষমা চেয়েছি।…যদি তাতেও না হয়ে থাকে, শাড়ির দাম দিতে রাজি।”
আলো টিটকিরি দিয়ে বলল, “ইস্…খুব যে টাকার তেজ।”
পার্বতী বলল, “তেজস্ক্রিয় না কি বলে যেন, একেবারে তাই, না রে আলো!”
খিল খিল হাসি উঠল মেয়েদের মধ্যে।
শ্যামের আর সহ্য হচ্ছিল না। কান, নাক, চোখ জ্বালা করছিল। শ্যাম রাধার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমায় এখানে এভাবে কেন ধরে আনা হয়েছে আমি জানতে চাই।”
লিলি একটা মন্তব্য করল : আহা রে, কচি খোকা…।
রাধা বলল, “কেন ধরে আনা হয়েছে আপনি জানেন না?”
“না। এটা অন্যায়।”
রাধা যেন সাঁড়াশির মতন চোখ করে শ্যামের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনাকে কি জামাই আদর করার জন্যে ধরে আনা হয়েছে ভাবছেন?”
“না, তা তো নয়ই। দেখতেই পাচ্ছি।” বলে শ্যাম কাঁটা, কম্পাস, স্কেল, কাঁচি সজ্জিত মেয়েদের দিকে তাকাল।
রাধা বলল, “এ বাঁদরামি কে করেছে?”
“কি ?”
“জানেন না। …এই লিলি দে তো তোর হাতের কাঁটা দুটো। দেখছি জানে কি না।” বলে রাধা হাতের ফাইলটা নাড়ল। “বলি, কাগজে—বাংলা কাগজে—কে আমাদের ঠিকানা দিয়ে বিয়ের বিজ্ঞাপন ছেপেছে?”
শ্যাম একেবারেই চুপসোনো ফানুসের মতন হয়ে গেল। তার অবশ্য মনে মনে এরকম একটা সন্দেহ হচ্ছিল, কিন্তু ব্যাপারটা এত গোপনে করা হয়েছে যে বসন্ত বিলাপের মেয়েদের জানার কথা নয়। কোথায় কলকাতায় কাগজে টাকা পাঠিয়ে বিজ্ঞাপন ছাপার ব্যবস্থা আর কোথায় এরা? কি করে জানবে?
