উপেন স্যাকরার দোকান বন্ধ। হোমিও গিরিজার ডিসপেনসারিতে আলো জ্বলছে অবশ্য, কিন্তু সে আলো এতটা পৌঁছচ্ছে না। হোমিও গিরিজার আলোও হোমিও—একরত্তি, জ্বলে কি জ্বলে না বোঝা যায় না।
শ্যাম তাকাল। মাথায় কাপড় তোলা এক মহিলা। একেবারে রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। পড়ে হাত পা চেপে যেন ককিয়ে ককিয়ে যন্ত্রণা প্রকাশ করছে।
বৃষ্টিটাও এ-সময় একটু বড় বড় ফোঁটায় পড়ছিল। মেয়েটি ছটফট করছে যন্ত্রণায়। নিশ্চয় অন্ধকারে আচমকা হোঁচট খেয়ে পড়েছে, কিংবা কোনো গর্তে পা দিয়ে ফেলেছে।
শ্যাম অবিবেচক হতে পারে না। পাড়ারই জানাশোনা কোনো বাড়ির বউ হবে।
এগিয়ে গিয়ে শ্যাম বলল, “কি হল, পড়ে গেলেন?”
যন্ত্রণা বোধহয় অতি তীব্র, অসহ্য ; মাথা নাড়িয়ে ছটফট করতে করতে আকারে প্রকারে এবং যন্ত্রণা-কাতর গলায় মেয়েটি যেন কি বলল ; শ্যামের মনে হল, ওকে তুলে ধরতে বলছে। পায়ে বোধ হয় জোর চোট পেয়েছে মেয়েটি।
শ্যাম উদ্বেগের গলায় বলল, “আপনাকে ধরব নাকি? উঠে দাঁড়াতে পারছেন না?”
মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দিল সামান্য, শ্যামকে হাত ধরে উঠিয়ে দিতে বলছে।
শ্যামের এক হাতে ছাতা, অন্য হাত দিয়ে সে মেয়েটিকে সাহায্য করল উঠতে। বেচারি মেয়েটির গা হাত ভিজে, মাথার খোঁপা থেকে কাপড়টাও কাঁধে খসে পড়েছে। মুখ তুলতে পারছিল না যন্ত্রণায়, কান্নার গলায় বলল, “আমি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছি না, ওপাশটায় একটু পৌছে দিন।”
শ্যাম হাত ধরে থাকল, সাহায্য করল আর মেয়েটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রাস্তার পাশে বাড়িটার চৌকাঠের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
শ্যাম গোলমালে একেবারেই লক্ষ করেনি, মেয়েটি বসন্ত বিলাপের চৌকাঠে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বরং শ্যাম জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, “গোড়ালি মচকে ফেলেছেন নাকি? কোথায় লেগেছে? একটা রিকশা ধরে দেব?” শ্যাম বুঝি মাত্র দু তিনটি শব্দ উচ্চারণ করেছে—হঠাৎ বুকের ওপর পিস্তল ধরে শাসাবার মতন করে সেই মেয়েটি শ্যামের পাঞ্জাবির বুকের কাছটায় ভীষণ জোরে মুঠো করে চেপে ধরে গর্জন করে বলল,“শিঘ্রি ভেতরে ঢুকুন, নয়ত চেঁচাব। ঢুকুন শিঘ্রি…।”
শ্যাম কিছু বোঝার আগেই মেয়েটি ঠেলে সদরের ওপারে ঢুকিয়ে দিল। আর শ্যাম দেখল দরজার পাশ থেকে সদরের গলি থেকে জনা চার পাঁচ মেয়ে বেরিয়ে এসে তাকে ঘিরে ফেলেছে।
একেবারেই বিমূঢ় বিহ্বল শ্যাম। তার পালাবার পথ নেই। ওই মেয়েটা যেটা রাস্তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে ককাচ্ছিল সে এখন দিব্যি সোজা পায়ে দাঁড়িয়ে দু চারবার যেন লাফও মারল, গলার স্বরে পিঁপড়ে কামড়াবারও কষ্ট নেই।
ভ্যাবাচাকা খেয়ে শ্যাম বলল, “মানে? আমায় এ-ভাবে—”
“মানে—?” সেই রাস্তার মেয়েটি বলল, “মানে বোঝাচ্ছি। এই লিলি, তোর হাতে কি আছে?”
“জিওমেট্রি বাক্সের কাঁটা।”
“ঠিক আছে। ও বেশি টেণ্ডাই মাণ্ডাই করলে প্যাঁক করে ফুটিয়ে দিবি।”
“মানে ব্যাপারটা কি, আপনারা……” শ্যাম কি স্বপ্ন দেখছে নাকি?
“শাট্ আপ্। কথা বললে ছুঁচ দিয়ে মুখ সেলাই করে দেব। এই অনিমা তোর হাতে কি আছে?”
“স্কেল।”
“শুভ্রা তোর কাছে কি আছে?”
‘কাঁচি।”
“আর কিছু বললেই ওর মাথার চুল কেটে দিবি ক্যাঁচ করে।”
শ্যাম আত্মরক্ষার জন্যে মাথার ছাতাটা গুটিয়ে ফেলল। একটা মাত্র দৌড়। পাঁচ পা দূরে চৌকাঠ, এদের ঝটকা মেরে ঠেলে ঠুলে পাঁচ পা এগুতে পারলেই শ্যাম বেঁচে যাবে। দেবে নাকি ধাক্কা? দু চারটে ঘুঁষি চালাবে? ছাতা পেটা করে পালাবে?
কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। কম্পাসের কাঁটা, স্কেল, রুল, কাঁচি—এবং না জানি আরও কি অস্ত্রশস্ত্র হাতে এই নারী বাহিনী তাকে ব্যুহ রচনা করে রয়েছে। শ্যাম পালাবার চেষ্টা করলেই এরা আক্রমণ করবে। সেই আক্রমণে শ্যামের ধুতি জামা, গায়ের চামড়া, মাথার চুল, পিতৃদত্ত নাক কান— থাকবে কি থাকবে না শ্যাম বুঝতে পারল না।
সেই মেয়েটা—যার পাকা অভিনয়ে ভুলে শ্যাম একেবারে বুন্ধুর মতন বসন্ত বিলাপে পা দিয়ে ফেলেছে, সে সঙ্গিনীদের বলল, “ওকে দোতলায় নিয়ে চল।” বলে শ্যামকে উদ্দেশ্য করে টিটকিরি মেরে হুকুম করল, “শুনুন শ্যামচন্দরবাবু, আপনাকে দোতলায় যেতে হবে। লক্ষ্মী ছেলের মতন চলুন। লিলি দরজাটা বন্ধ করে দে।”
শব্দ করে সদর বন্ধ হল। শব্দটা শ্যামের বুকের ওপর এমনই জোরে লাগল যে শ্যামের বুক ধকধক করতে লাগল। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে শ্যামের, পা কাঁপছিল। শ্যাম ঠোঁট ভেজাচ্ছিল বার বার। ছি ছি, শ্যাম একটা মেয়ের চালাকির কাছে হেরে গেল। রাস্তার মধ্যে একবারও শ্যাম কেন মেয়েটার মুখ ভাল করে দেখল না, কেন বুঝল না—ওই মাথার কাপড় তুলে রাখার ব্যাপারটা পুরোপুরি ফল্স্, শ্যামকে ভাঁওতা মারা, এবং বৃষ্টির জল বাঁচানো। এখন শ্যাম মেয়েটাকে চিনতে পারছে, বিজয়া চৌধুরী, সোশ্যাল ওয়েলফেয়ারে চাকরি করে।
শ্যামকে ওরা ঠেলছিল। শ্যাম বলল, “ব্যাপারটা কি হচ্ছে আমি বুঝতে পারছি না। কি করছেন আপনারা? দোতলায় আমি কেন যাব?”
শ্যামের কথায় সমস্বর একটা হাসি উঠল। বিজয়া বলল, “কেন যাবেন গিয়েই বুঝতে পারবেন।…কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, চলুন। আপনার জন্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আর বৃষ্টিতে ভিজতে পারছি না।”
শ্যাম শেষবার প্রতিবাদ করে বলল, “যদি না যাই কি করবেন?”
