“তোর জন্যেই এই লড়াই। তোকে নিয়েই আমাদের লড়তে হচ্ছে। তুই শালা চ্যাম্পিয়ন হবি।”
শ্যাম কি যেন ভেবে বলল, “আমার একলার সঙ্গে লড়াই হচ্ছে না, হচ্ছে আমাদের সঙ্গে; তা হলেও তোরা বলছিস যখন আমি দেব, টাকা দেব।…যা অপমান সয়েছি সেদিন।”
সামান্য পরেই মণিমালা এল।
মণিমালা আসতেই সিধুরা সহর্ষে হুররে দিয়ে উঠল।
মণিমালা হেসে বলল, “হল কি তোমাদের? এত ফুর্তি?”
সিধু বলল, “বউদি, ওষুধ ধরেছে। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।”
ললিত বলল, “তোমার চাল টেরিফিক লেগে গেছে বউদি, এতটা আমরা ভাবিনি। তোমায় একটা মিনিস্ট্রি দেওয়া উচিত।”
মণিমালা উৎসাহিত হয়ে বসে পড়ে বলল, “শুনি শুনি, ব্যাপারটা বলো।”
সিধু বলল, “আর কোনো ব্যাপার নেই বউদি, আমি আসল গোয়েন্দা লাগিয়ে ছিলাম, বসন্ত বিলাপে রোজ দশ-পনেরোখানা করে আসছে।”
দত্তগুপ্ত বলল, “আরও আসবো গো বউদিদি; শ্যামচাঁদের পয়সায় রিপিট ডোজ্ আড়নের কথা ফাইন্যাল হইছে না।”
ললিত বলল, “হ্যাঁ ; আমরা ভাবছি—আর একবার—রোববারেই আর-একটা ঝেড়ে দিন ব্যাপারটা বেশ পোক্ত হবে। তুমি কি বল?”
শ্যাম বলল, “আপনার কনসেন্ট পেলেই আমরা দিয়ে দি।”
মাথা হেলিয়ে হেসে মণিমালা বলল, “বেশ ভাল কথাই তো। দিয়ে দিন।”
চার বন্ধুই আবার সহর্ষে চৌকি চাপড়াল।
শ্যাম বলল, “বউদি, আপনি সত্যিই গ্রেট।”
সিধু বলল, “আপনার কী মাথা! আমাদের ঘোল খাইয়ে দিতে পারেন।”
দত্তগুপ্ত বলল, “আপনারে অবশ্য আমাগো রসোগোল্লা খাওয়ান দরকার। …খাইবেন নাকি !”
হাসির চোটে ফেটে পড়তে পড়তে মণিমালা বলল, “মাঝপথে নয়, একেবারে শেষে। আগে আপনারা সত্যি সত্যিই জিতুন, তারপর।”
ললিত রঙ্গ করে বলল, “ফাইন্যাল ভিক্টরির পর তোমায় আমরা একমাস সিনেমা দেখাব, যে বই আসবে ; চপ কাটলেট মিঠে পান খাওয়াব, যত খেতে পার। যদি বলো তো আমাদের আড্ডার নামটাও তোমার নামে রেজিস্ট্রি করে দিতে পারি। …কিন্তু বউদি, মেয়ে বলেই তোমার এরকম প্যাঁচালো বুদ্ধি, ভীষণ অরিজিন্যাল কিন্তু সূক্ষ্ম। আমার ফিউচার যে কী, ভগবানই জানেন।”
মণিমালা হাসতে হাসতেই জবাব দিল। “তোমার বেলায় আরও সূক্ষ্ম হব।”
চার বন্ধুই হাসতে লাগল।
মণিমালা চলে গেলে ললিত তাস নিয়ে বসল।
শ্যাম নিজের হাতের তাস তুলে নিতে নিতে হঠাৎ বলল, “আচ্ছা ললিত, যদি বসন্ত বিলাপ হেরে গিয়ে আমাদের সঙ্গে ফায়সালা করতে চায়। ধর, কো-এক্সিটেন্স চায়। তা হলে?”
ললিত নিজের তাস গুছোতে গুছোতে জবাব দিল, “সেটা পরের ব্যাপার।”
“না, যদি চায় ; ধর না, ওরা চাইল। তা হলে?”
“তা হলে আমি ভাই আমার ফেভারিট—সেই ফ্লুরোসেন্ট মেয়েটাকে চাই—আলো চ্যাটার্জি।”
দত্তগুপ্ত বলল, “তোর চাওয়নে আলো জ্বলব কি সিধু?”
“আলবাত জ্বলবে। নয়ত কি তুই জ্বালাবি শালা?”
“আমার—” দত্তগুপ্ত বাঁ দিকের একটা তাস ডান দিকে টেনে নিল ; বলল, “আমার আলোয় কাম নাই, আমি ভূগোলরে বড়ই ভালবাসি রে সিধু, ভূগোলের ম্যাপখান দেখছস নাকি? আহা রে, চক্ষু সার্থক করে।” দত্তগুপ্ত যাকে ভূগোল বলল, তার নাম পার্বতী সেন, স্কুলের ভূগোল-দিদি।
ললিত অবশ্য তার অভিমত স্পষ্ট করে ব্যক্ত করল না, তবু বোঝা গেল তার পছন্দ কলেজের টীচার নবনীতাকে—যাকে ললিতরা বলে, কুলপি দিদি। এমনি নার্ভ? ঠাণ্ডা আঁটা সাঁটা দিদি।
শ্যাম তার অভিমত ব্যক্ত করল না।
দেখতে দেখতে আরও কিছুদিন কেটে গেল, দিন পনেরো, শ্রাবনের শেষাশেষি প্রবল বর্ষণ নামল। আকাশ যখন সঞ্চিত সব জল ঢেলে দিয়ে একটু ফাঁকা, ঈষৎ কৃপণ, মেঘলা ভাবটা আছে অথচ সারাক্ষণ বৃষ্টি নেই, ঝিপঝিপ করে জল আসছে, পালাচ্ছে, মাঝে মাঝে ইলশেগুঁড়ি ঝরছে তখন আবার এই ঘটনাটি ঘটল।
শ্যাম নিত্যকার মতন সন্ধেবেলায় ললিতের বাড়ি আড্ডা দিতে যাচ্ছিল। এখন আড্ডাটা আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে, কেননা সিধু রোজই প্রায় বসন্ত বিলাপের খবর আনছে। আগে যা ছিল বসন্ত বিলাপের অবস্থা এখন তার চেয়েও খারাপ। বসন্তের কুসুমগুলি এখন—এই সুন্দর বর্ষাতেও রীতিমত নির্জীব হয়ে পড়েছে। ক’দিন ধরে আর টু শব্দ শোনা যাচ্ছে না ওখানে, শ্যামদের আসাযাওয়ার পথে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে চার পাঁচজনে জটলা বাঁধিয়ে আর প্রচ্ছন্ন টিটকিরিও দিচ্ছে না। রাস্তাঘাটে চোখাচোখি হলে চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। শ্যামরা সবাই খুশি। কতকগুলো মেয়ে পাড়ায় এসে জুড়ে বসে তাদের নাকাল করবে—এ হয় না। শত হলেও তোমরা মেয়ে। আস্কারা না দিলে তোমরা বাবা গাছে উঠতে পার? পার না।
বোনের ছাতা মাথায় তুলে শ্যাম আস্তে আস্তে হাঁটছিল। বিকেলের পর থেকে আবার ঝিপঝিপ বৃষ্টি চলছে। নেমেছিল জোরে, তবে প্রথম পশলাটা জোরে হবার পর ঝিপঝিপ করে চলছে। শ্যামের আজ মনটাও বেশ ভাল। তার হয়ত একটা প্রমোশন হতে পারে, অফিসে শুনছিল। ছোট প্রমোশন, তবু প্রমোশন তো।
ললিতদের বাড়ির রাস্তাটা আজ তিন-চার দিন ধরে অন্ধকারই পড়ে আছে। মিউনিসিপ্যালিটির আলো, জল ঝড় বৃষ্টিতে কোথায় কি গণ্ডগোল হওয়ায় তা আর এখনও সারানো হয়ে উঠল না। না উঠুক, চোখ বেঁধে দিলেও শ্যামরা এ-গলি দিয়ে চলে যেতে পারবে।
বেশ খানিকটা অন্ধকারের মধ্যে দিয়েই শ্যাম টিপটিপে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটছিল। বসন্ত বিলাপের কাছে আসতেই শ্যাম তার সামান্য তফাতে কাকে যেন রাস্তায় উবু হয়ে পড়ে যেতে এবং ককিয়ে উঠতে শুনল।
