মণিমালা ঘাড় হেলিয়ে বলল, “বড় ভনিতা করছ। ব্যাপারটা বললা শুনি।”
শ্যাম বলল, “আপনি আমাদের দলে, এটা কিন্তু প্রমিস করতে হবে।”
মণিমালা সঙ্গে সঙ্গে মাথা দুলিয়ে তিন সত্যি করল।
ললিত বলল, “ব্যাপারটা বসন্ত বিলাপ নিয়ে। আজ সেই সিংহীটা শ্যামকে দশজনের সামনে যাচ্ছেতাই করে অপমান করেছে। আমরা এর শোধ নেব।”
দত্তগুপ্ত ইংরিজি করে বলল, “রিভেনজ। বুজলেন না বউদিদি, সিংহীরে টাইট রমু।” দত্তগুপ্তর বাড়ি কোনো কালেই পূর্ববঙ্গে ছিল না, অথচ সে এইভাবে কথা বলে, এটা নিছক রঙ্গ করেই। বাড়িতে তার নিজের বউদিদিও পূর্ববঙ্গীয়, দাদা খাস শান্তিপুরি বাঙলায় কথা বলে। নিতান্ত যেন বউদিদিকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে দত্তগুপ্ত ল্যাংগুয়েজ ক্লাসের মতন পূর্ববঙ্গীয় ভাষাটা রপ্ত করছে।
স্টেশনের ঘটনাটা সিধু সংক্ষেপে বলল। শুনতে শুনতে মণিমালা হেসে অস্থির।
শ্যাম ক্ষুব্ধ হয়ে বলল, “বউদি আপনি হাসছেন, ব্যাপারটা কিন্তু হাসির নয়। আমি সত্যিই বড় অপদস্থ হয়েছি।”
মণিমালা আঁচলের আগায় মুখের বেশি হাসিটা মুছে খানিকটা শান্ত হয়ে বলল, “সত্যিই ভাই, ব্যাপারটা খারাপ। কিন্তু আপনিই বা অত কথা শুনলেন কেন, দু’-চারটে বলে দিলে পারতেন।”
“পাগল! তা হলে সিংহবাহিনী শ্যামের কান কেটে ছেড়ে দিত।” সিধু বলল, ‘রিট্রট ইন ডেনজারই বেস্ট পলিসি।”
ললিত সকলকে থামিয়ে দিয়ে মণিমালাকে বলল, “আমরা একটা প্ল্যান করে ফেলেছি। এটায় আনসাকসেসফুল হলে অন্য পথ বেছে নেব। আমাদের প্ল্যানটা তুমি শুনবে?”
“বলো, শুনি।”
ললিত তাদের মতলবটা বলল।
শুনে মণিমালা শান্ত মিষ্টি হাসি হেসে বলল, “ও-সব ছাই কোনো আসবে না। বাড়িটার গায়ে শুধু দাদের মতন দাগ হবে। তা ছাড়া পাড়ার পাঁচ জনের চোখে পড়বে, তোমরাও ধরা পড়বে।”
সিধু বলল, “কিন্তু বউদিদি, পোস্টারিংটা খুব এফেকটিভ হবে। আমরা শুধু ছড়া লিখব। কিংবা সিনেমার কিছু হাল কায়দার বিজ্ঞাপনের মতন প্রথম দিন শুধু এক লাইন যেমন ‘একটি দুরন্ত আকর্ষণ; পরের দিন আরও এক লাইন “নয়ন সার্থক”।
মণিমালা মাথা নাড়ল, “না না, এসব কি?”
“তাহলে ছড়া?…শ্যাম লিখবে। আমরা ফুলস্কেপ কাগজে রঙিন কালি দিয়ে বেশ ডিজাইন করে চন্দরকে দিয়ে লিখিয়ে নেব।”
“দেওয়ালে আঁটবে কে?”
“পয়সা দিলে কাগজ আঁটার লোক পাওয়া যায়।”
“তা যাক্। এটা কিন্তু খারাপ…। এভাবে কারও পেছন লাগা ভাল নয়।”
“এই তো তুমি তোমার কমিউনিটির ইন্টারেস্ট দেখতে লাগলে—” ললিত বলল, “শ্যামের বা আমাদের পেছনে লাগতে বসন্ত বিলাপের মেয়েদের তো খারাপ লাগেনি। গোলমালটা ওরা পাকিয়েছে, আমরা নয়।”
মণিমালা ওদের মাথা ঠাণ্ডা করার জন্যে নরম গলায় বলল, “কে কার পেছনে লেগেছে সেটা অন্য কথা। তা হলে তোমরা মেয়েদের পেছনে এভাবে লাগবে কেন? অন্যভাবে লাগ?”
“অন্যভাবে লাগা মানে তো ঢিল ছোঁড়া?” শ্যাম অপ্রসন্ন গলায় বলল।
“দু চারটে বোমাও মারা যায়—কিন্তু সেটা কি উচিত হবে। আমরা ভদ্দরলোকের মতন অহিংস সংগ্রাম করতে চাই। ওদের ঝাড়সুদ্ধু এ পাড়া থেকে ওঠাতে চাই। বেজায় পাজি হয়ে গেছে—সব ক’টা। জটলা করে দাঁড়ায়, দোতলার বারান্দা থেকে মুখ বাড়িয়ে টিটকিরি মারে। আমাদের বাঁদর-টাঁদরই ভাবে।” ললিত বলল।
মণিমালা যথেষ্ট চালাক। আবহাওয়া বুঝে নিয়ে বলল, “তোমরা লাগতে চাও লাগো। তবে, আমি বলছিলাম কি, খুব চুপচাপ—কাউকে কিছু জানতে না দিয়ে পেছনে লাগো।”
চার বন্ধুই একসঙ্গে বলল, “কি রকম?”
মণিমালা জবাব দিল না।
ললিত বলল, “তোমার আইডিয়াটা কি রকম?”
“দাঁড়াও ভাবি একটু।”
মণিমালা ভাবতে লাগল। চার বন্ধুই মণিমালার মুখের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল নীরবে।
শেষ পর্যন্ত মণিমালা বলল, “আমি একটা উপায় ভেবেছি।”
“কি?”
মণিমালা তার উপায়টি ব্যক্ত করল। সঙ্গে সঙ্গে নানা জটিল প্রশ্ন। মণিমালা সব প্রশ্নেরই জবাব দিল যতটা সাধ্য।
দেখা গেল মণিমালার সিদ্ধান্ত ওরা মেনে নিয়েছে।
২
সপ্তাহ দুই পরে সিধুই একদিন নাচতে নাচতে এসে বলল, “লেগেছে রে, লেগেছে।”
ললিত যদিও আঁচ করতে পারল, তবুও শুধলো, “কি লেগেছে?”
“হুলুস্থুল। বসন্ত বিলাপে ফায়ার লেগে গেছে।”
শ্যাম হাতের কাগজটা ফেলে দিয়ে সহর্ষে চিৎকার করে উঠল, “লেগে যাক—লেগে যাক ; লাগিয়ে দে মা জগদম্বা…”
দত্তগুপ্ত বলল, “ফায়ার স্প্রেড করলে আমারে কল দিস রে সিধু।”
বাইরে আজ বিকেল থেকে খানিকটা ঝোড়ো ভাব হয়েছে। আকাশে মেঘ জুটেছে দুপুর থেকে, বৃষ্টি নেই, মাঝে মাঝে মেঘ ডেকে উঠেছে। হয়ত মাঝ রাত থেকে বৃষ্টি নামবে।
ললিত সিধুকে জিজ্ঞেস করল, “লেগেছে তুই বুঝলি কি করে?”
“সিকরেট মিশন ভাই; বলেছিলাম না—আমি ওটা ক্যাচ করে ফেলব।…এইবার জমবে।”
“বউদিকে ডাক—” শ্যাম অধৈর্য হয়ে বলল, “ডাক বউদিকে, ললিত। শীঘ্রি।”
ললিতকে উঠতে হল না, দত্তগুপ্তই উঠে ভেতর দরজায় গিয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে মণিমালাকে ডাকল।
সিধু বলল, “আমি ভাবছি আর-একবার ওষুধটা রিপিট করে দেওয়া যাক। প্রথমটাতেই বেশ ধরেছে যখন তখন রিপিট করলে আরও ফার্স্ট ক্লাস হবে। কি বল?”
শ্যাম বলল, “গুড আইডিয়া। এবার ডোজ আরও একটু কড়া করে দেওয়া যেতে পারে।”
ললিত বলল, “তাহলে এবার শ্যামই খরচটা দিক।”
“আমি একলা কেন?” শ্যাম আপত্তির গলায় বলল।
