মিণমালা যেন কোনও কিছুর গন্ধ শুঁকতে পেল। সন্দিগ্ধ গলায় বলল, “তা ব্যাপারটা কি শুনতে পারি না?”
বন্ধুদের মধ্যে চোখাচোখি হবার আগেই দত্তগুপ্ত বলল, “শ্যামচাঁদের কান…।” কথাটা দস্তগুপ্ত শেষ করতে পারল না, তার আগেই শ্যাম জোরে একটা কনুইয়ের গুঁতো দিল গর্দভটাকে। উঃ শব্দ করে দত্তগুপ্ত থেমে গেল।
ললিত বলল, “ব্যাপারটা এখন তোমায় বলতে পারছি না। …না কি রে? কি বলিস ?” ললিত বন্ধুদের দিকে চোখ ছোট করে তাকাল। “পরে বলব। একটু চা-ফা খাওয়াও আগে।”
মনিমালা শ্যামের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। হেসে চলে গেল।
মিণমালা চলে যেতেই শ্যাম দত্তগুপ্তকে খেঁকিয়ে উঠল, “রাস্কেল কোথাকার! এখুনি ডুবিয়ে ছেড়েছিল! বউদির কাছে তুই আমার বেইজ্জতির কথা বলছিলি! কেলেঙ্কারী হয়ে যেত।”
দত্তগুপ্ত বলল, “বউদিরে কইতে দোষ কি?” সে বলল বটে, কিন্তু তার বোকামিটা বুঝতে পেরেছিল।
সিধু বলল, “দোষ কিছু নয়, প্রেস্টিজ আরও পাঞ্চার হত।”
ললিত বলল, “বাজে কথা থাক। এখন কি হবে? লেট আস ডিসাইড। ব্যাপারটা এভাবে ছেড়ে দেওয়া যায় না। স্পেশ্যালি বসন্ত বিলাপের সঙ্গে আমাদের এটা থার্ড রাউন্ড। আগের দু’বার মেয়েছেলে বলে ছেড়ে দিয়েছিলাম। বাট নট দিস টাইম।”
আগের দু’বার—অর্থাৎ একবার বসন্ত বিলাপের বাড়ি থেকে একরাজ্যি ময়লা সিধুর মাথার ওপর ফেলে দেওয়া হয়েছিল। অন্যবার—অবশ্য সেটা প্রত্যক্ষ নয় পরোক্ষভাবেই বসন্ত বিলাপ ললিতদের বেইজ্জত করেছিল, সরস্বতী পুজোর নিমন্ত্রণপত্র বলে ডাক মারফত ঠিকানা লেখা খাম পাঠিয়ে দিয়েছিল, ভেতরে কার্ড বা ছপা চিঠি কিছু ছিল না।
দত্তগুপ্তর কাছ থেকে একটা সিগারেট চেয়ে নিয়ে সিধু ততক্ষণে ধরিয়ে ফেলেছে। লম্বা ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “না, আর টলারেট করা যায় না। আমাদের স্ট্রেট ফাইট দিতে হবে।”
-দত্তগুপ্ত রসিকতা করে হেসে বলল, “ফাইটে কাম্ নাই রে, টাইটেই চলব।”
শ্যাম ধমক দিয়ে বলল, “ডোন্ট লাফ্, এটা হাসির ব্যাপার নয়।”
দত্তগুপ্ত একান্ত অনুগতের মতন মুখভাব গম্ভীর করে নিল।
অতঃপর চার বন্ধু গভীর মনোযোগ সহকারে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে বসল।
বসন্ত বিলাস সম্পর্কে এবার কিছু বলতে হয়। সংক্ষেপে বললে এই দাঁড়ায় যে, ললিতদের পাড়ায়, এমন কি এই রাস্তার ওপরই বসন্ত বিলাপের অবস্থান। বেশি নয়, এই বাড়ি থেকে মাত্র মিনিট দুই হাঁটলেই বাড়িটা দেখা যায়। লালচে রঙের ছোটাখাটো দোতলা বাড়ি একটা, নিচে উপেন স্যাকরার দোকান। উপেনের পাশে অবশ্য হোমিও ডাক্তার গিরিজাবাবুর ডিসপেনসারি। আজ প্রায় বছর খানেক হতে চলল, কয়েকটি মেয়ে এসে ওই বাড়িটা ভাড়া নিয়ে একটা মেয়ে-মেস বা মেয়ে-হোস্টেল তৈরি করে দিব্যি আছে। হই-হল্লা, চেঁচামেচি করে, নেচে গেয়ে বেশ আছে সব। মনেই হয় না মেয়েদের বয়েস হয়েছে। সবাই চাকরি-বাকরি করে। কেউ বা রেলে; কেউ মেয়ে কলেজে, কেউ বা হাসপাতালে। স্কুলে চাকরি করা মেয়েও আছে জনা দুই-তিন। সবচেয়ে আশ্চর্য এই মেয়েদের মধ্যে বিবাহিত বলতে মাত্র একজন, প্রতিমা, হাসপাতালের মেট্রন ; বয়স একটু বেশিই হবে। অন্য কোনো মেয়ের মাথাতেই এখন পর্যন্ত সিঁদুরের দাগ ধরেনি।
বাড়িটার একটা নম্বর আছে কিন্তু নাম নেই। নামটা শ্যামদের দেওয়া, শ্যামেরই। জনা, আট-দশ ,মেয়ে যে বাড়িতে থাকে, এবং যেখানে সকলেই প্রায় কুমারী, সেই বাড়ির নাম বসন্ত বিলাপ হলে খুব বেমানান নিশ্চয় হয় না। শ্যামের যুক্তিতে, এতগুলি যুবতীর কৌমার্য অবলম্বন—বসন্তের বিলাপ ছাড়া আর কিই বা! শ্যাম এবং শ্যামের বন্ধুদের কাছে আজ বছর খানেকই বসন্ত বিলাপ প্রবল কৌতূহল ও রহস্যের বিষয়। এই এক বছরে বসন্ত বিলাপের পরিবর্তন অল্পস্বল্প হয়েছে, নতুন কেউ এসেছে পুরনো কেউ চলে গেছে, ওদের ঝি বদলেছে—তবু মোটামুটি চেহারাটা সেই রকমই আছে। আর শ্যামরা বসন্ত বিলাপের অধিবাসীদের নাম ধাম, কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকাকিবহাল। মেয়ের রূপগুণ, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিচার করে তারা আবার নিজেদের মধ্যে এক-একজনের এক-একটা নামও দিয়ে নিয়েছে। যেমন সিংহবাহিনী। সিংহবাহিনীর আসল নাম অনুরাধা সিংহ, বয়স বছর ত্রিশের সামান্য বেশি বলেই মনে হয়, মাথায় সামান্য খাটো, বেশ পুষ্ট চেহারা, মেজাজ খুব কড়া ধরনের, রাস্তা দিয়ে হাঁটার, সময় মিলিটারী মেজাজে হাঁটে, গলার স্বর থেকে মনে হয় ভগবান যেন তার আলজিভের কাছে একটি বিশেষ ধরনের টিনি-মাইক লাগিয়ে দিয়েছে ! চালচলনে ব্যবহারে যার এত দাপটের ভাব তাকে দত্তগুপ্ত ‘মহিষমর্দিনী’ বলতে চেয়েছিল, কিন্তু শ্যাম বা ললিত এতটা নির্দয় হতে রাজি হয়নি; বরং অনুরাধা সিংহকে সিংহবাহিনী বলাই সঙ্গত, তা ছাড়া এটা তো ঠিকই মেয়েটিকে তার চারিত্রিক সিংহই তো বহন করছে।
মণিমালা চা নিয়ে এসে ললিতদের কাছে একটা বেতের মোড়া টেনে নিয়ে বসল।
ললিত প্রথমে হালকাভাবে বলল, “দাদা কোথায়?”
“কোথায় আর—যেখানে যার দৌড়—কোলিয়ারির এক মক্কেল এসে নিয়ে গেছে।”
সিধু চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “আজ পল্টনকে একবারও তো দেখলাম না বউদি? কোথায় গেছে?”
মণিমালা হেসে বলল, “আজ বাপের সঙ্গে গেছে। যা বায়না!”
শ্যাম, ললিত, দত্তগুপ্তের মধ্যে গোপনে চোখ চাওয়া-চাওয়ি হয়ে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ললিত গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বলল, “বউদি, আমরা একটা সিরিয়াস ম্যাটার নিয়ে আলোচনা করছিলাম। ব্যাপারটা খুব সিক্রেট।…এখন ব্যাপার হচ্ছে কি, মানে—তুমি এমন এক পার্টি—না ঠিক পার্টি নয়—ধরো সম্প্রদায়ের লোক যার কাছে আমরা—পুরুষরা কিছু বলতে পারি না। ব্যাপারটা মেয়েদের নিয়ে। তবু তোমায় আমরা বলব। তোমাকে কনফিডেন্সে নেওয়া গেল।”
