একেবারে প্রথমটায় শ্যাম কিছু না বুঝে চমকে ওঠার মতন হলেও পরের কয়েকটি মুহূর্তের মধ্যে সব বুঝে নিয়ে হতভম্ব হয়ে গেল। তার সিগারেটের টুকরোটা মেয়েটির—অর্থাৎ সেই সিংহবাহিনীর শাড়ির সামনের কুঁচির মধ্যে ছুঁছো বাজির মতন ঢুকে গিয়েছিল। স্টেশনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে, দিবালোকে শাড়ির পায়ের কাছটা দুলিয়ে, নাচিয়ে, কিছুটা বা সামনে বাড়িয়ে মেয়েটি অগ্নিমূর্তি হয়ে শ্যামকে সগর্জনে ধমকাতে ও গালিগালাজ করতে শুরু করল। মেয়েদের আরক্ত মুখ, রাঙা চোখ, সকুঞ্চিত ভ্রূ স্ফুরিত নাসা, দস্তপঙ্ক্তি—কোনোটাই শ্যামের অপ্রিয় বস্তু নয়, কেননা শ্যামের মাত্র চৌত্রিশ বছর চলছে, সে একটু-আধটু শৌখিন কাব্যচর্চাও করে থাকে এবং এখনও অবিবাহিত। কিন্তু এই মুহূর্তে শ্যাম চোখে অন্ধকার দেখছিল, তার সম্মুখস্থ মেয়েটির তর্জন-গর্জনে তার হুঁশ প্রায় ছিল না, আর গালিগালাজ যেটুকু মরমে প্রবেশ করছিল তাতে অপমানে শ্যাম একেবারে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ হয়ে যাচ্ছিল।
ইডিয়েট, অসভ্য, জন্তু অভদ্র—ইত্যাদি শব্দগুলি ছুরির মতন শ্যামের আত্মসম্ম নে যত্রতত্র বিদ্ধ হলেও সে শুধু তোতলাবার চেষ্টা করছিল, কথা বলতে পারছিল না। অবশেষে মেয়েটি যখন শ্যামকে বাঁদর বলল এবং শ্যামের কান ধরে ছিঁড়ে দেবার অভিপ্রায় জানিয়ে কান ধরার একটা ভঙ্গিও করল, তখন শ্যাম আর সহ্য করতে পারল না। বলল, “এটা ইন্টেনশনাল নয়।”
সঙ্গে সঙ্গে আরও গর্জন করে মেয়েটি বলল, “নিশ্চয় ইন্টেনশনাল। চিনি না আপনাদের। যত ফেউয়ের দল।”
অগত্যা শ্যাম চুপ। কিছু লোকজন, মুটেমজুর জমে গেছে আশপাশে।
অবশেষে সঙ্গিনীকে টেনে নিয়ে গিয়ে সিংহ বাহিনী সামনের রিকশায় উঠল। শ্যামেরই ডাকা সেই রিকশাটা। যাবার সময় মেয়েটি গলা বাজিয়ে বলে গেল “এ-রকম নচ্ছারদের ধরে নিয়ে গিয়ে পুলিশে দিতে হয়। যত সব বাঁদর।”
শ্যাম অসহায়ের মতন দাঁড়িয়ে থাকল, তার অবস্থাটা বজ্রাহতের মতন।
কী দুর্দৈব। শ্যাম ভদ্রলোক। সে অশিক্ষিত, বেকার, বকাটে নয়। তার চেহারা বা চালচলনে বাঁদরামি করার কোনো লক্ষণ নেই। পুলিশে দেবার মতন লোক শ্যাম নয়। সেই শ্যামকে আজ এই হাটের মধ্যে মেয়েটা অপমানের একশেষ করে গেল! ছি ছি! শ্যাম শুধু আহত হল না, বেচারির চোখে প্রায় জল এসে গেল।
সন্ধেবেলায় শ্যাম বিরক্ত, বিমর্ষ ও উত্তেজিত হয়ে তাদের আড্ডায় এসে বলল, “সিধু, আমি সুসাইড করব।”
সিধু চওড়া চৌকির ওপর পাতা মোটা সতরঞ্চির ওপর কাত হয়ে শুয়ে ফুটবলের লীগ টেবল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। দত্তগুপ্ত একটা তাকিয়া মাথায় দিয়ে শুয়ে শুয়ে কড়ি কাঠ দেখতে দেখতে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সুর ভাঁজছিল নিচু গলায়। আর ললিত—এই বাড়ির হাফ-মালিক—তাস, কাগজ-কলম বের করে নিচ্ছিল।
শ্যামের প্রবেশ এবং ক্ষোভ প্রকাশ বন্ধুদের তেমন উৎসাহ সঞ্চার করল না। সিধু লীগ টেবল থেকে মনে মনে একটা অঙ্ক কষতে লাগল, দত্তগুপ্ত নির্বিকারচিত্তে সুর সাধনা করে যেতে থাকল।
ললিত শুধু বলল, “কি করবি?”
“সুসাইড।”
“বাঃ! ভাল জিনিস! জাপানিরা হরদম করে।”
বন্ধুদের এরকম পরিহাস, ঠাণ্ডা মনোভাব শ্যাম বরদাস্ত করতে পারল না। চৌকিতে না বসেই শ্যাম বার দুই পায়চারি করল, দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর তিক্ত গলায় বলল, “আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে! লাইফে এরকম বেইজ্জতি আর হইনি।…বসন্ত-বিলাপের সেই মেয়েটা—সিংহবাহিনীটা পাবলিক প্লেসে দাঁড়িয়ে আমার ইনসালট করেছে। আমার কান ধরে ছিঁড়ে দেবে বলেছে। …” শ্যাম আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, দম নেবার জন্যে, থেমে গেল!
বসন্ত বিলাপের নামেই হোক বা সিংহবাহিনীর টানেই হোক সিধু এবার মুখ ওঠাল। ললিত ভাল করে নজর করতে লাগল শ্যামকে। সুরচর্চা থামিয়ে দত্তগুপ্ত উঠে বসতে বসতে বলল, “কস্ কি রে শ্যাম? মাইয়া মাইনষে তরে ইনসালট্ করল?”
ললিত বলল, “ব্যাপারটা কি?”
সিধু পকেট থেকে পানের মোড়কটা বের করে পাশে রাখল। বলল, “তোকে বেইজ্জত করল কেন? চোখফোক টিপে ছিলি নাকি?”
শ্যাম আগুন হয়ে উঠল। “হোয়ট ডু ইউ মিন্? আমি কি শালা লোফার না লোচ্চা?”
হেসে উঠে সিধু বলল, “তুই চটছিস কেন? আমি কি গাল টেপার কথা বলেছি! চোখ টেপা কোনো ক্রাইম নয়। আয়, বোস, কি হয়েছে বল সব…”
বন্ধুরা এবার আর ঠাণ্ডা থাকতে পারল না, রীতিমত চঞ্চল হয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠল।
দত্তগুপ্ত স্কুলে পড়ার সময় কোথায় যেন বক্সিং শিখেছিল, ঘুঁষি পাকিয়ে বলল, “একটা গুসি দিলি না ক্যান?’
এমন সময় ললিতের বউদি মণিমালা ভেতরের দরজা দিয়ে আবির্ভূত হল। মণিমালার বয়স বেশি নয়, ললিতের সমবয়সীই হবে হয়ত, এবং এই আড্ডার চার আনা সদস্য। অর্থাৎ সে এখানকার গল্পগুজবে কখনো-সখনো থাকে, এবং মাঝে মাঝে তাস খেলায়। পরিবর্তে তাকে এই চার দেবরকে চার এবং মাঝেমধ্যে খাবার-টাবার খাওয়াতে হয়।
মণিমালা বরাবরই হাসিখুশি মানুষ। তামাশা রসিকতায় কিছু কম যায় না। দেখতে সুশ্রী, সামান্য গোলগাল ধরনের চেহারা।
মণিমালা এসে বলল, “কি, এখনও তাস পাড়োনি?”
শ্যামরা কেউ কোনো জবাব দিল না।
মণিমালা চার জনের ভাবসাব দেখতে লাগল।
সামান্যা পরে ললিত বলল, “আজ আমরা তাস খেলছি না। …একটা ব্যাপার ভাবছি। তুমি বরং স্ট্রং করে চা পাঠিয়ে দাও।”
