শানুর কথায় রাগ-টাগ ভুলে শশিতারা অবাক হয়ে ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। “কী ট্রিটমেন্ট?”।
“ম্যাগনেট?” — হাড় চিবোতে চিবোতে শানু বলল।
“সেটা কী?”
বেলা তৈরি ছিল। বলল, “ম্যাগনেট থেরাপি। চুম্বক চিকিৎসা।”
শশিতারা মাথায় হাত দিলেন। গরমের দাপটে চুলের খোঁপা আর ঘাড়ে থাকে না, ক্রমশই মাথায় উঠে যাচ্ছে। বললেন, “সে আবার কী। চুম্বক চিকিৎসা। জীবনে শুনিনি।”
শানু বলল, “আমরাও কি আগে শুনেছি! সেদিন বেলি ইংরেজি কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দেখেছিল। ফক্কুড়ি করছিল। আমায় দেখাল। আমিও দেখলাম। দেখে ওকে বললাম—” শানু বেলাকে দেখাল, “হাসিস না। ভেরি ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। আজকাল কত রকম নতুন নতুন চিকিৎসা বেরুচ্ছে, মান্ধাতা আমলের ট্রিটমেন্ট বাতিল হয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানের যুগ। তুই সাইন্স জানিস না, তাই হাসছিস।”
বেলা কিছু বলল না। গম্ভীর হয়ে থাকল। ভেতরে ভেতরে ভয় করছিল। শানুদা এক করতে আরেক না করে ফেলে।
শশিতারা বললেন, “লেকচার থাক। জিনিসটা কী বল?”
শানু বলল, “তোমাকে কাগজ দেখাব?”
“কাগজ? কিসের কাগজ?”
“ডাক্তার পাকড়াশির কাগজপত্র! প্যাম্ফলেট। লিফলেট।— আমি কাগজের বিজ্ঞাপন পড়ে একদিন ডাক্তার পাকড়াশির কাছে চলে গেলাম। ধর্মতলা স্ট্রিটে, তালতলার মুখেই। দোতলায় পাকড়াশির অফিস চেম্বার। দশ বারো জন রোগী বসে আছে। বুড়ো বুড়ো, মাঝবয়েসি, কমবয়েসি। মাড়োয়ারি, বাঙালি।—আমাকে ওদের অফিস থেকে ছাপানো কাগজপত্র দিল। বলল, কাগজে সব লেখা আছে।”
“এনেছিস কাগজগুলো?”
“এনেছি। মন দিয়ে পড়েছি। বেলিকেও পড়িয়েছি।”
শশিতারা গলার তিন ভরি হারের তলায় আঙুল দিয়ে একবার গলার পাশটা চুলকে নিলেন। “কী দেখলি?”
“দেখলাম প্রায় সব রকম রোগই ম্যাগনেট ট্রিটমেন্টে সারানো যায়। কি বল, বেলি?”
বেলা ঘাড় হেলিয়ে বলল, বাত, ব্লাড প্রেশার, মাথা ধরা, মাইগ্রেন, স্পনডিলাইটিস, আরও কত কী!”।
শশিতারা কেমন সন্দেহের গলায় বললেন, “সত্যি? না মাদুলির মতন?” মাদুলির ওপর শশিতারা হাড়ে হাড়ে চটা। এক সময়, যখন বয়স ছিল, পেটে একটা বাচ্চা আসার জন্যে হরেক রকম মাদুলি পরেছেন। দুটো হাত আর গলা মাদুলিতে ছেয়ে গিয়েছিল। পাথরও পরেছেন অনেক রকম। কিস্য হয়নি। এখন আর বাড়িতে মাদুলি ঢুকতে দেন না। তবে পাথর আসে। শশিতারা নিজে এখন একটা সাত রতি মুক্তোর আংটি ছাড়া কিছু পরেন না। স্বামীর হাতে চারটে আংটি। পলা, গোমেদ, পান্না আর মুক্তো। পুরুষ মানুষ, কাজকর্ম, কারখানা, নানান অশান্তি—পাথর ছাড়া চলে কেমন করে!
শানু খেতে খেতে বলল, “ওদের কাগজপত্র পড়ে আমার মনে হল, ব্যাপারটা পুরোপুরি ফেলনা নয়। ম্যাগনেটের ব্যাপারটাই রহস্যময়, মাসি। কেন আছে, কেমন করে আছে, এর রহস্য কেউ ধরতে পারল না। ঠিক কিনা বল, বেলি?”।
বেলা বিজ্ঞান পড়ে না। কিন্তু শানুর কাছে শুনে রেখেছে। মাথা নেড়ে বলল, “মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মতন।”
“একজ্যাক্টলি। ইট ইজ দেয়ার বাট হাউ? ইট ইজ এ মিষ্ট্রি।— জানো মাসি, সেদিন টিভি-তে একটা প্রোগ্রাম দেখাচ্ছিল। বিদেশে এখন রোগ ধরার জন্যে ম্যাগনেটিক ডিটেকটার ব্যবহার করছে। দারুণ দেখাচ্ছিল।”।
শশিতারা বললেন, “অত শুনে আমার দরকার নেই। কী করে চুম্বক নিয়ে তাই বল।”
“কিচ্ছু না। রোগ বুঝে ওজন মতন ম্যাগনেট পিস বডিতে বেঁধে দেয়। নর্থ পোল, সাউথ পোল। ব্যাস ওতেই—। আসলে ট্রিটমেন্টের ব্যাপার তো লিখে দেবে না; এটা তো ডাক্তারদের ব্যাপার!”
“এ রকম চিকিৎসা আর কোথায় হয়?”
“বম্বে ; দিল্লি। —বিদেশে অনেক জায়গায়।”
শশিতারা এবার উঠবেন। ছেলেমেয়েদের খাওয়াও শেষ হয়েছে। বললেন, “বেশ, তোরা বল ওঁকে। আমি বলব না।”
শানু বলল, “বাঃ! তুমি না বললে—”
বেলা বলল, “মামি, আমরা বললে মামা কানেই তুলবে না। তোমারই বলা ভাল। তারপর যা করার শানুদা করবে।”
মাথা নাড়লেন শশিতারা। “আমি কিছু বললেই খ্যাঁক খ্যাঁক করে ওঠে। ভাবে, আমি তোর মামার সর্বনাশ করার জন্যে মন্ত্র দিচ্ছি! ওই সুবোধ ডাক্তার যে কী বুঝিয়ে দিয়ে গেল। তোমার মামা-মেশোর ধারণা হল, আমার জন্যেই ওর শরীরের এই অবস্থা! এখন আমি শত্রু।”
বেলা বলল, “আমরা সবাই বলব। তুমি, শানুদা, আমি।”
শশিতারা উঠে পড়লেন। বললেন, “ঠিক আছে, বলে দেখো। এই মানুষ আমায় সারা জীবন জ্বালাচ্ছে, আরও জ্বালাবে। যেমন কপাল আমার।”
শানু আর বেলা চোখ চাওয়া-চাওয়ি করে মুখ টিপে হাসল।
খাওয়ার দাওয়ার পর ঘরে ফিরে এসে শানু বলল, “বেলি কাল তুই তোর মামাকে ক্যাচ কর। তোকে অত ভালবাসে, না করতে পারবে না। জোঁকের মতন লেগে থাকবি—আদিখ্যেতা করবি, কাঁদবি—”
বেলা বলল, “তুই গিয়ে লাগ না!”
“আমার দ্বারা হবে না। তুই মেয়ে। মামার ভাগ্নি। তুই পারবি। তোকে ভদ্রলোক জেনুইন ভালবাসে।— তা ছাড়া কেসটা তোর—তোকে লেগে থাকতে হবে।
বেলা তার সরু বুড়ো আঙুলটা দেখাল! পরে বলল, “তোর কি চোখ নেই! তুই দেখছিস মামিই এখন পাত্তা পাচ্ছে না। মামার কাছে তো আমি—!”
শানু বনেদি চালে একটা সেঁকুর তুলল। তুলে সিগারেটের প্যাকেট খুঁজতে খুঁজতে বলল, “কিসের একটা কথা আছে না রে টুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশান— আমি দেখছি মানুষের কারবার গল্পকেও হার মানায়।” বলতে বলতে শানু সিগারেট ধরিয়ে বড় করে ঢোঁক গিলল। “যে মাসি মেসোকে মুঠোয় পুরে রেখেছিল সেই মেসোই এখন মাসিকে হাঁকিয়ে দিচ্ছে! ভাবা যায়।—তুইও কম যাস না!”
