শানুর কথাটা বোধ হয় মিথ্যে নয়। অন্তত গুরুপদ আর শশিতারাকে দেখে তেমন মনে হতে পারে। যে গুরুপদ একমাত্র ব্যবসা ছাড়া উঠতে বসতে খেতে শুতে স্ত্রীর কথায় চলতেন ফিরতেন—এত বছর চলেছেন—হঠাৎ তিনিই এখন স্ত্রীর ওপর বেজার। মাঝে মাঝে রাগে ফুসেও উঠছেন। গুরুপদর যেন এতকাল পরে চৈতন্যোদয় হল। দেখলেন, শশিতারার আদর আতিশয্য ধমক হুকুম মেনে চলে চলে তাঁর অবস্থা কাহিল হয়ে গিয়েছে। গুরুপদর এই ভয়াবহ শারীরিক অবস্থার জন্যে শশিতারাই যেন দায়ী। খাও খাও করেই তাঁর জীবনটা শেষ করে দিলেন শশিতারা। আর নয়। গুরুপদ এখন স্ত্রীর কথা কানেই তুলছেন না, উলটে নিজেই ধমক মারছেন।
বেলা বলল, “তুই ভাবছিস কেন! মামিই রাজি করিয়ে দেবে।”
“দিলে ভাল। না দিলে ওয়ে আউট বার করতে হবে।” বলে শানু গিয়ে বিছানায় বসে পড়ল। সিগারেটে টান মারতে মারতে বলল, “বেলি, তুই শুধু মাসির ভরসায় বসে থাকলে পারবি না। নিজে একটু লেগে পড়। ইনসিয়েটিভ নে।”
“মানে?”
“মেসো সিরিয়াসলি ভয় পেয়ে গেছে। ভয় পেয়েছে বলেই মাসির ওপর খাপ্পা হয়ে গেছে। মাসি এখন বিরোধী পক্ষ। তুই তোর মামার পক্ষ নে।”
“রেখে দে।—মামিকে তুই চিনিস না। কদিন সবুর কর—দেখবি।”
“দেখব।— তুই কাল তোর মামাকে মিট করছিস? ছাদে মিট করবি। তোর মামা যখন ফুলের টবে জল দেয় তখন। মনটা সেসময় নরম থাকবে।”
বেলা চেয়ারে বসে পা দোলাতে দোলাতে বলল, “সে আমি করব। কিন্তু তারপর?”
“কিসের তারপর?”
“যদি মামা রাজি হয়ে যায়?”
“ম্যাগনেট ট্রিটমেন্ট হবে।”
বেলা নজর করে শানুকে দেখতে লাগল। বলল, “হলে তো মরব।”
শানু অবাক হাঁ করে বেলাকে দেখতে লাগল! বলল, “তুই বকছিস কী! ম্যাগনেটে কেউ মরে! তোকে আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি। ফাঁসি হতে পারে, মরবি না।”
“আমি কিছু বুঝতে পারছি না।”
শানু বিছানা থেকে উঠে পড়ল। বলল, “বেলি, তুই ডোবাবি। তোকে এত করে বোঝালাম তিন পা এগিয়ে এক পা পিছিয়ে এসে লাভ হবে না। তোকে এগুতে হবে।”
বেলা বলল, “মামা যদি জিজ্ঞেস করে, ম্যাগনেটে রোগ সারে কেমন করে?”
“বলবি, সারে নিশ্চয়। ম্যাগনেটের একটা এফেক্ট আছে। ডাক্তার ওসব বুঝবে—তুই আমি কী বুঝব! আমরা পেনিসিলিন পর্যন্ত জানি। ম্যাগনেট আরও অ্যাডভান্স। পঞ্চাশ বছর পরে দেখবি—এম ডি উঠে যাবে, তার বদলে ডাক্তাররা হবে ডক্টর অফ ম্যাগনেটিক থেরাপি।”
বেলা হাই তুলতে তুলতে বলল, “ততদিন আমি বেঁচে থাকব না।”
“বলিস কী! তুই সত্তরের আগে মরবি? একেবারেই নয়। তুই ঝুনো বুড়ি হবি, তোর দাঁত পড়বে, মাথার চুল সাদা হয়ে যাবে, লাঠি নিয়ে নিয়ে হাঁটবি, চোখে দেখতে পাবি না, শুকনো আমসি হয়ে মরবি।”
“আর তুই মরবি?”
“আমি।—আমি বোধ হয় ছেঁড়া জুতোর সোল হয়ে।”
বেলা বলল, “না, তুই মরবি পিপড়ে ধরা বাতাসা হয়ে।” বলতে বলতে বেলা হেসে উঠল।
শানুও হেসে ফেলল।
হাই তুলতে তুলতে বেলা উঠে পড়ল এবার। তার ঘুম পাচ্ছে।
চলে যাচ্ছিল বেলা, শানু বলল, “কাল সকালে লেগে পড়বি।”
পরের দিন বেলা দশটা নাগাদ শানুর ডাক পড়ল তেতলায়।
গুরুপদ চেয়ারে বসে আছেন। শশিতারা হাত কয়েক দূরে দাঁড়িয়ে।
শানু মাঝামাঝি জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল।
গুরুপদ শানুকে দেখতে দেখতে বললেন, “ডাক্তারের নাম?”
“পাকড়াশি।”
“পুরো নাম?”
“এম পাকড়াশি।”
“ছোকরা?”
“দেখিনি। কাগজপত্র নিয়ে চলে এসেছি।—ছোকরা নয় বোধহয়। অতগুলো ডিগ্রি ডিপ্লোমা।”
“ট্রিটমেন্টটা কী রকম?”
শানুর মনে হল, মেসোর গলা একটু নরম। বলল, “আমি প্যাম্ফলেট পড়ে যা দেখলাম, ম্যাগনেটের টুকরো বেঁধে দেয় শরীরে। অন্য কিছুও থাকতে পারে জানি না।”
“কত বড় টুকরো?”
“অসুখ আর অবস্থা বুঝে।”
“আর কিছু নয়?”
“আবার কী?”
“খাওয়া দাওয়া ওষুধ?”
“জানি না। বোধহয় তেমন কোনো রেস্ট্রিকশন নেই।”
“ফোন নম্বর আছে ডাক্তারের?”
“আছে।”
“একটা কল দিয়ে দাও। বাড়িতে এসে দেখে যাক।”
শানু একবার শশিতারার দিকে তাকাল। তারপর মাথা নেড়ে চলে গেল।
সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় শানু লাফ মেরে মেরে নামছিল।
পাঁচ
এম পাকড়াশির পুরো নাম মহাদেব পাকড়াশি। দেখতে যাত্রাদলের মহাদেবের মতন। তফাতের মধ্যে যাত্রাদলের মহাদেব বাঘছালের বদলে গেরুয়া রঙে ছোপ ছোপ ছাপানো খাটো কাপড় পরে, লুঙির মতন করে, মহাদেশ পাকড়াশি পরেন গ্যালিস দেওয়া প্যান্ট। নয়তো ভুড়ি থেকে প্যান্ট নেমে যায়।
মহাদেব পাকড়াশি বাড়িতে রোগী দেখতে আসেন না। তাঁর চেম্বারে গিয়ে দেখিয়ে আসতে হয়।
গুরুপদকেও যেতে হল। সঙ্গে শানু।
শশিতারা বায়না ধরলেন, তিনিও যাবেন। শানু ছেলেমানুষ। সব কথা গুছিয়ে বলতে পারবে না। ডাক্তার বলবে এক, শুনবে অন্য আর। গুরুপদ তো ভিতুর বেহদ্দ। একজন শক্ত লোক থাকা দরকার, যে সামলাতে পারবে, কথা বলতে পারবে।
কাঁটায় কাঁটায় সোয়া ছটায় গুরুপদরা হাজির হলেন মহাদেব পাকড়াশির চেম্বারে। গিয়ে দেখেন, জনা তিনেক রোগী বসে আছে। একটা চৌকো ঘরে। ঘরে বাতি জ্বলছে, পাখা চলছে। কতকগুলো পুরনো ম্যাগাজিন ফরফর করে উড়ছে। রোগীদের মধ্যে দুই জেনানা। গায়ে গতরে শশিতারাকে ছাপিয়ে যায়। তৃতীয় জন এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। অম্বুলে চেহারা।
জেনানাদের দেখে শশিতারা নিচু গলায় বললেন, “সার্কাসের হাতি”। গুরুপদ বললেন, “চুপ। শুনতে পাবে। এরা কলকাতার মাড়োয়ারি। বাংলা বোঝে।”
