“আমার হার্ট কি খারাপ হয়ে গেছে?”
“যাচ্ছে।”
“তা হলে?”
“হায় হায় করে লাভ নেই। যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি—সেই রকম আর কি। এত গিন্নির কথায় চোব্য-চোষ্য খেয়েছ—এবার তার ফল ভোগ করছ।”
গুরুপদ হঠাৎ স্ত্রীর দিকে বিরক্তভাবে তাকালেন। বললেন, “আমি আর ওর কথা শুনব না।”
শশিতারা মুখ ঠোঁট বেঁকিয়ে বললেন, “পাড়ার পঞ্চার মায়ের কথা শুনো।”
সুবোধ এবার শশিতারার দিকে তাকালেন। বললেন, “কর্তার তো হল। তোমারটাও হোক। একবার চেক আপটা করিয়ে নাও।”
“দরকার নেই”,শশিতারা মাথা নাড়লেন।
“ভাল কথা বলছি। পরে আর চারা থাকবে না।”
“না থাকুক।— তোমার মতন ডাক্তারের খপ্পরে আমি পড়ব না।”
“আমি ডাক্তার খারাপ নই। এম ডি।”
গুরুপদ হঠাৎ বললেন, “শশি তোমাকে কম্পাউন্ডার বলে সুবোধ।”
সুবোধ গলা ছেড়ে বেজায় জোরে হেসে উঠলেন। হাতের চা চলকে গেল। আর একটু হলে গলায় সন্দেশ লেগে বিষম খেতেন।
হাসি থামলে সুবোধ বললেন, “ঠিকই বলে। আমি যখন ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র তার আগে থেকে শশির বাবা—বলাই মেশোমশাইয়ের দাবাইখানায় মিক্সচার, মলম তৈরি করতাম। মেশোমশাই বলতেন, ওহে সুবোধ, ওটাকে সুই মেরে দাও। দিতাম। “
শশিতারা বললেন, “তাতেও কিছু হল না।”
চোখে মজার হাসি নিয়ে সুবোধ বললেন, “কই হল! মালাটা গুরুপদর গলায় পড়ে গেল। অবশ্য ভালই হল।” বলতে বলতে হেসে উঠলেন।
গুরুপদও হেসে ফেললেন।
শশিতারাও না হেসে পারলেন না। বললেন, “রঙ্গটাই শিখেছ!”
চা খেয়ে সুবোধ উঠে পড়ছিলেন। “আমি চলি। একটা নেমন্তন্ন বাড়িতে একবার মুখ দেখিয়ে যেতে হবে।”
শশিতারা ধমকের গলায় বললেন, “চলি মানে! মিষ্টিগুলো কে খাবে?”
“গুরুপদকে খাওয়াও। নিজে খাও। আমি মিষ্টিটিষ্টি বড় একটা খাই না তোমরা জান! ঘি নয়, মাখন নয়।— তুমি গুরুপদর লেজ কেটো—আমাকে কাটবার চেষ্টা কোরো না।— চলি, গুরুপদ মন খারাপ কোরো না, তাঁর ইচ্ছেয় সব হয়।— পনেরো দিন পরে আমার কাছে যাবে। বুঝলে?”
সুবোধ দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বললেন, “সে দুটো কোথায়? গলা পেলাম না?”
শশিতারাও উঠে পড়েছিলেন। বললেন, “চরতে বেরিয়েছে। চরা ছাড়া তাঁদের আর কাজ কী!”
চার
দিন পনেরো পরে রাত্রে খেতে বসে শানু বলল, “মাসি একজন ভাল ডাক্তারের খোঁজ পেয়েছি।” বলে আড়চোখে বেলাকে দেখে নিল।
শশিতারা গম্ভীর হয়ে বললেন, “ডাক্তার আমার কী করবে?”
“মেসোর কথা বলছিলাম…।”
“যার কথা তাকে জিজ্ঞেস করো।” বলে শশিতারা গজগজ করতে লাগলেন। “আমি কে? আমড়া গাছতলায় নেতা হয়ে বসে আছি। কে শুনবে আমার কথা। চব্বিশ ঘণ্টা ঘড়ি মিলিয়ে সুবোধ ডাক্তারের ওষুধ খাচ্ছে আর আয়নায় নিজের মুখ দেখছে। গিয়েছিল ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার নাকি বলেছে, আরও পনেরো দিন চালিয়ে যাও—তারপর কথা। হাঁড়িতে চাল নেই জল ফুটছে—সেই রকম অবস্থা এখন। খাবার কথা বললে দুর্বাশা মুনি হয়ে যায়। এটা বারণ ওটা বারণ, ভাত দু চামচে, রুটি দেড়খানা, এক হাতা চারাপোনার ঝোল, এক টুকরো মাছ, উনি আবার চিকেন বলতে আধ পো ওজনের ছানা বোঝেন, তার স্টু, এক পিস মাংস। মুড়ি দু মুঠো, দু কুচি শশা। মিষ্টি-মাস্টা একেবারে নয়। তেল না, ঘি নয়।—এইভাবেই যদি থাকতে হয় বনে গিয়ে তপস্যা করলেই পারে। সংসার করা কেন।”
বেলা একবার শানুকে দেখে নিল। তার কাজ পোঁ ধরার ; শানুদার সঙ্গে সেই রকম কথা। বেলা বলল, “মামাকে আজকাল যা শুকনো দেখায়।”
“দেখাবে না।” শশিতারা বললেন, “মদ্দ মানুষ একজন। কাজকর্ম আছে, কারখানা আছে। হোক না গাড়ি। তবু পাঁচ জায়গায় ছোটাছুটি রয়েছে। ধকল কি কম শরীরের ওপর। অথচ খাবার কথা বললে তেড়ে আসে। বলে, সুবোধ ডাক্তারের পারমিশান করিয়ে আনো। নিকুচি করেছে তোর সুবোধ ডাক্তারের। অমন ঢের ডাক্তার আমি টেকে গুজতে পারি। ওরা হল অনাহারী ডাক্তার ; না খাইয়ে খাইয়ে রুগিকে হাড় জিরজিরে করে দেয়। তারপর ফক্কা। ” বলে দু হাত ওপরে তুলে তালি দিয়ে ফক্কা বোঝালেন। “ছিল বেশ। সুখে থাকলে ভূতে কিলোল।— আমি কিছু বলব না। বললে তেরিয়া হয়ে যেন মারতে আসে।”
শানু বলল, “মেসোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। মাসি, তুমি শুধু রাগ করে বসে থাকলে ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে যাবে।”
“যাক।”
“আহা—তুমি বুঝছ না, দেহ বলে কথা। দেহ ঠিকমতো ধরে রাখতে না পারলে—বিলীন হয়ে যায়।”
“কী হয়?”
“বিলীন—” শানু মাথার ওপর হাত ঘোরাল ; ঘুরিয়ে ফাঁকা বাতাস বোঝাল।
শশিতারা শানুকে দেখতে লাগলেন।
বেলা সরল গলা করে বলল, “একজন দেখলে আর একজন ডাক্তারকে দেখানো ঠিক নয়। খারাপ লাগে দেখতে। কিন্তু একবার পরামর্শ নিলে কিসের ক্ষতি।”
সঙ্গে সঙ্গে শানু বলল, “অ্যালোপ্যাথির সঙ্গে কত লোক হোমিওপ্যাথি খায়। হোমিওপ্যাথির সঙ্গে কবিরাজি। সুবোধ মেশোর ওষুধবিসুধ যেমন চলছে চলুক না। তার সঙ্গে যদি ধরো ম্যাগনেট ট্রিটমেন্ট চলে, আটকাচ্ছে কোথায়!” বলে শানু মুরগির ঠ্যাং তুলে নিয়ে মুখে পুরল। বেলাকে ইশারা করে দিল চোখ টিপে।
শশিতারা অবাক হয়ে শানুকে দেখতে লাগলেন। কর্তাকে শশিতারা হপ্তায় অন্তত তিনটে দিন মুরগির ঠ্যাং খাওয়াতেন। এখন আর ভদ্রলোক ঠ্যাং খান না। ছোট একটা টুকরো মুখে দেন ; তাও প্যানপ্যানে স্টুয়ের মাংস। মুরগির পনেরো আনা ছেলেমেয়েদের পেটে যায়। শশিতারার এখানে খানিকটা রাগ আছে।
