সুবোধ এবার শশিতারার দিকে তাকালেন। “ওকে উপোস করাচ্ছ নাকি?”
“আমি কি করাচ্ছি! নিজেই করছে!”
“কিছুই খাচ্ছে না?”
“ওই একটু শরবত, ফল, মিষ্টি।”
“ভাতটাত খাচ্ছে না? মাছ মাংস, লুচি?”
“কই আর! মুখে তুলছে। খাবে কেমন করে, তুমি ওকে সমন ধরিয়ে দিয়েছ।—মুখে উঠছে না—তবু মুখ কামাই নেই। আমায় দুষছে। “
সুবোধ হেসে বললেন, “পেয়াদার কাজ পেয়াদা করেছে, আমি তো আর কোর্ট নই।—যাক গে, কাজের কথা বলি তুমিও শুনে রাখো, শশি!” বলে সুবোধ পকেটে হাত দিয়ে একটা খাম বার করলেন। তার মধ্যে গুরুপদর রিপোর্টের কাগজগুলো ছিল। খামটা সেন্টার টেবিলের ওপর ফেলে দিলেন সুবোধ। বললেন, “সেদিন তোমায় যা বলেছিলাম আজও বলছি। তোমার অনেক আগে থেকেই সাবধান হওয়া উচিত ছিল। শরীরটাকে বাইরে ফুলিয়েছ, ভেতরে সবই গোলমাল। এখন থেকে যদি স্ট্রিকলি সাবধান না হও—বিপদে পড়বে।”
শশিতারা বললেন, “হয়েছে কী?”
সুবোধ বললেন, “কোনটা হয়নি! ব্লাড প্রেশার, সুগার, কোলেস্টরাল— ভাবাই যায় না । হার্টও ঝিমিয়ে পড়ছে। হার্টের অপরাধটা কী! বোঝা বইতে পারছে না। তাকে ফাংশান করার পথ খোলা রেখেছ?”
গুরুপদ বললেন, “যা হবার হয়েছে—এখন কী করতে হবে বলো?”
সুবোধ এবার পাঞ্জাবির অন্য পকেট থেকে দুটো কাগজ বার করলেন বললেন, “যা করতে হবে আমি লিখে দিয়েছি। ওষুধপত্র যা খাবে তার জন্যে একটা কাগজ। অন্যটা হল তোমার খাওয়াদাওয়ার চার্ট। যেমনটি আছে তেমনটি ফলো করবে। আপাতত পনেরো দিন তারপর একমাস। আমি দেখব, অবস্থাটা কী দাঁড়ায়। পরের ব্যবস্থা পরে। তোমরা যদি আমার ওপর খবরদারি করো, আমি কিন্তু কোনো দায়িত্ব নেব না। অন্য ডাক্তারের কাছে যাবে। অ্যাজ ইউ লাইক।”
গুরুপদ একবার স্ত্রীর মুখের দিকে তাকালেন, তারপর বন্ধুর। বললেন, “তুমি রাগ করছ কেন? আমি ভাই, তোমার অ্যাডভাইস মতন চলতে চাই। যা যা বলে দেবে করব।” বলে স্ত্রীকে দেখালেন, “খোদকারি যা করার উনি করেন, ওঁকে বলো।—বাট আই সে, আর খোদকারি সহ্য করব না।”
সুবোধ শশিতারার দিকে তাকালেন।
শশিতারা বললেন, “বা! যার জন্যে চুরি করি সেই বলে চোর।”
সুবোধ বললেন, “শশি, তুমি গুরুপদর বউ হতে পার, ডাক্তার নও। তোমার সব ব্যাপারে নাক গলানো উচিত নয়। আমার কথা মতন না চললে আমি কিন্তু এই পেশেন্ট আর দেখব না!”
গুরুপদ বলেন, “না না, এ তুমি কী বলছ! আমি ভাই, তোমাকে বিশ্বাস করি। হাই হাই ডাক্তার কলকাতায় অনেক আছে। তাতে আমার কী! তুমি আমার ধাত জানো, তোমার দেওয়া ওষুধ খেলাম এতদিন। বাঁচি তোমার হাতেই বাঁচব, মরি তোমার হাতেই মরব।”
মাথা নাড়লেন সুবোধ। না, আমার হাতে মরতে হবে না।”
শশিতারা এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। স্বামীর দিকে তাকাচ্ছিলেন একবার, অন্যবার সুবোধকে দেখছিলেন। স্বামী কেমন ঝট করে বন্ধুর দিকে হেলে গেলেন। গোটা দোষটাই যেন শশিতারার। রেগে গেলেন শশিতারা। বললেন, “তোমরা যা বলছ তাতে মনে হচ্ছে আমিই স্যান্ডেলবাবুকে মারছি।”
সুবোধ ঠাট্টা করে বললেন, “নিজেও মরছ।”
“আমি মরছি?”
কথাটা মাঝখানে থেমে গেল। চা এসেছে। মানিক আর ফেলু—ট্রের ওপর চায়ের কাপ সাজিয়ে, জলের গ্লাস মিষ্টির প্লেট নিয়ে ঘরে এল। এসে সেন্টার টেবিলের ওপর রাখল।
শশিতারা বললেন, “ঠিক আছে। তোরা যা।”
মানিক আর ফেলু চলে গেল। ফেলু একেবারে বছর তেরো-চোদ্দোর বাচ্চা। শানু তার নাম দিয়েছে ‘গুলতি।‘
শশিতারা বললেন, “যা বলছিলাম। আমি মরছি—কে বলল?”।
সুবোধ মিষ্টির প্লেট দেখতে দেখতে বললেন, “তোমাদের মোদকের সন্দেশ। সাইজটা ভালই করে। আমাদের ওখানে এর অর্ধেক—।—তা গুরুপদ এই সন্দেশ তোমার বউ তোমায় কটা করে গেলায় রোজ?”
গুরুপদ বললেন, “চার ছটা।”
“বাঃ বাঃ! আর ওই কালোজাম—?”
“কালোজাম আমি খাই না, ছেলেমেয়েরা খায়। গিন্নি খায়। আমি রসগোল্লা খাই, ছানা থাকে বলে।”
সুবোধ বললেন, “তোমার শরীরের মধ্যে চিনি এখন সাড়ে তিনশোর ওপর। তারই মধ্যে ছটা বিরাট সন্দেশ, আট দশটা রসোগোল্লা চালিয়ে যাচ্চ! আবার বলছ, তোমার চিকিৎসা করতে।— আমি তো পারব না ভাই, তোমার গিন্নিকে বলো। ডাক্তারের মেয়ে।”
শশিতারার মাথা গরম হয়ে গেল। বললেন, “না তো কি উকিলের মেয়ে! আমার বাবা চারশো সুগার নিয়ে মাছ মাংস রাবড়ি সন্দেশ-মিহিদানা সব খেত আর গায়ে প্যাঁক করে ইনসুলিন ফুঁড়ত।” বলে শশিতারা ইনজেকশান নেবার ভঙ্গিটা দেখালেন।
সুবোধ চায়ের কাপ উঠিয়ে নিলেন। “তা হলে তো হয়েই গেল, গুরুপদ। তুমি যেমন চালাচ্ছ চালিয়ে যাও—তোমার গিন্নি রোজ প্যাঁক করে ছুঁড়ে দেবে। এ ফোঁড় ফোঁড়।”
আতকে উঠে গুরুপদ বললেন, “পাগল! শশির নিজেরই শরীর খারাপ। হাত পা কাঁপে, ঘাড় মাথা টনটন করে, তার ওপর বুক ধড়ফড়—”
চায়ের আরাম করে চুমুক দিয়ে সুবোধ বললেন, “ঈশ্বরের ইচ্ছেয় উনি তোমার যথার্থ সহধর্মিণী। দাঁড়িপাল্লায় রাখলে তোমরা সমান।”
“আজকালকার দিনে তাই হতে হয়, শশিতারা গম্ভীরভাবে বললেন। বলে হাতের মোট মোটা চুড়ি ঘোরাতে লাগতেন। আঁট হয়ে বসে গেলে কষ্ট হয়।
গুরুপদ সুবোধকে বললেন, “শশি যা বলছে বলুক। আমি তোমার কথা মতনই চলব। যেমন যেমন লিখে দিয়েছ তেমন তেমন করব। তুমি শুধু বলো, আমার কী হয়েছে?”
হাত বাড়িয়ে সুবোধ একটা সন্দেশ নিলেন। বললেন, ‘অত শুনে তোমার লাভ নেই। সোজা কথা যেমনটি বলেছি সেই ভাবে চলো। গায়ের চর্বি কমাও, ওজন কমাও, খাওয়াদাওয়া হিসেব মেপে করো, হার্টটাকে খানিক সামলাতে দাও। তারপর দেখা যাবে কী করা যায়!”
