বালুসাইয়ের প্লেট আর চায়ের কাপ তুলে নিয়ে ডুমুর চলে যেতে যেতে বলল, “মন খারাপ কোরো না।…আমি তো কিসের ছাইপাঁশ! তুমি কত সোনাদানা পেয়ে যাবে। অত ভাল ছেলে! চলি।”
ডুমুর চলে গেল।
রঙ্গলাল এতটা ভাবেনি। তার মাথায় যেন ছাদ ভেঙে পড়েছে। বেচারি এখন কী করবে! মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছিল! শালা, একটা ডাকও ঠিক মতন দিতে পারল না। বোগাস।
ঘরের মধ্যে বার কয়েক পায়চারি করল রঙ্গলাল। এ-বাড়িতে আর থাকা চলবে না। থাকলে তুষের আগুনে পুড়ে মরতে হবে। হাম ভি বনে হি রিন্দ…। আমি মদ্যপান করার জন্যে মেতে উঠেছিলাম, জানতাম না শূন্য পাত্র হাতে ফিরে আসতে হবে।…
রঙ্গলাল প্রায় কেঁদেই ফেলেছিল। ইচ্ছে হল, মাটিতে পড়ে থাকা টাকাটা লাথি মেরে সরিয়ে দেয়। শালা, নেমকহারাম, চিট। তুই আমার পকেটের টাকা হয়ে আমায় ঠকালি!
লাথি মারতে গিয়েও লাথি মারা হল না। পিঠ নুইয়ে তুলে নিতে গেল টাকাটা। নিতে গিয়ে অবাক। চোখকে কেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। আরে শালা, এ কী! এ তো হেড। রঙ্গলাল ঠিক ডাকই দিয়েছিল। ডুমুর তাকে মিথ্যে বলল? কেন? তার কি চোখের ভুল হয়েছিল! নাকি মজা করে গেল। ইচ্ছে করেই শয়তানি করলে! দারুণ বিচ্ছু তো!
এখন কী করবে রঙ্গলাল? ডাকবে ডুমুরকে। ডুমুর যদি বলে, মশাই—চালাকি রাখো। আমি থাকতে থাকতে কেন দেখলে না! আমার সামনে? এখন টেলকে হেড করে রেখে আমায় দেখাতে ডাকছ। চালাকি!
ডুমুর তা বলতে পারে। বলা সম্ভব! অথচ ভগবানের দিব্যি, রঙ্গলাল ওই টাকা স্পর্শ করেনি।
সারা রাত তো এভাবে থাকা যাবে না। ছটফট করতে করতে মরে যাবে রঙ্গলাল। সে ভদ্রসন্তান, চিট নয়।
কেমন খেপার মতন রঙ্গলাল বারান্দায় বেরিয়ে এল।
বেশ কুয়াশা জমছে। হিম পড়ছে। তারাগুলো ঝাপসা।
“ডুমুর! ডুমুর! এই ডুমুর?”
বার কয়েক হাঁক দেবার পর ডুমুর বারান্দার ওপারে জাফরির কাছে এল।
“কী হয়েছে? চেঁচাচ্ছ কেন?”
“তুমি আমায় ব্লাফ মারলে! আশ্চর্য! হেডকে টেল বলে ঠকিয়ে এলে! আমি স্পষ্ট দেখছি হেড। মাই কল ওয়াজ রাইট।”
ডুমুর একটু চুপ করে থেকে বলল, “তো কী হয়েছে! তুমি দয়া করে একটু ঘাড় নুইয়ে দেখলেই পারতে! লাটের মতন দাঁড়িয়ে থাকলে কেন?”
“আমি তোমায় বিশ্বাস করেছিলাম।”
“এখন?”
“এখনও করছি। তুমি আমাকে নিয়ে নাচাচ্ছিলে!”
“আহা! …কত রঙ্গ জানো জাদু, কত রঙ্গ জানো! …দড়ি দিয়ে না বাঁধতেই যে এত নাচে, পরে সে কত নাচবে!…এখন ঘরে যাও! মা ডাকছে। কাল কথা হবে।”
“পাকা কথা।” বলে রঙ্গলাল প্রাণের সুখে হাসতে লাগল।
রত্নলাভ
গল্পটা রত্নদিদির মুখেই শোনা। তাঁর গল্প।
গল্প শুরুর আগে একটু ভূমিকা সেরে নিতে হয়। আমাদের এক আত্মীয়ার বিয়েতে গিয়েছিলাম ধানবাদের দিকে। কোলিয়ারিতে। না গিয়ে উপায় ছিল না, আত্মীয়জনে দুঃখ পেতেন, ক্ষুব্ধ হতেন। বিয়ে বাড়িতে গিয়ে দেখি, স্বজনে কুটুমে বাড়ি একেবারে হট্টশালা। চেনাজানা প্রায় সকলেই এসেছেন। এমন কি রত্নদিদিও। ওঁকে দেখে অবাক হয়ে গেলাম। বয়েস সত্তর ছাড়িয়েছে, থাকেন হাজার মাইল তফাতে, অন্তত দু জায়গায় ট্রেন বদল করে আসতে হয় এদিকে, তবু এসেছেন।
অনেককাল পরে রত্নদিদিকে দেখলাম। বছর পনেরো তো অবশ্যই। বললাম, “তুমি একলা এসেছ! এলে কেমন করে? বয়েস তো হয়েছে, দিদি। ছেলে তোমায় ছাড়ল?”
রত্নদিদি বললেন, “আসব না কেন? ছেলে বউ কি ছাড়তে চায়। ঝগড়া মাচিয়ে দিলুম। নাতি বলল, এ বুঢড্ডি রেল ডিব্বায় তুমি উঠতে পারবে না, পুলিশ পাকড়াও করবে। বললাম, যা যা আমায় পুলিশ দেখাস না, তোর বাপের মতন পুলিশ আমি ট্যাঁকে খুঁজি।”
রত্নদিদির কথা শুনে হেসে ফেললাম।
“পারল আটকাতে! কেমন গটগটিয়ে চলে এলাম। নাগপুর পর্যন্ত একটা লোক সঙ্গে ছিল। তারপর একলা।”
“তোমার সাহস আছে।”
“থাকবে না কেন! আমি কি তোদের মতন ভেতো? এই দেখ, এখনও আমার যোলোটা দাঁত আছে নিজের, চোখে চশমা পরি সেলাই-ফোঁড়াইয়ের সময়, নয়ত আকাশের চিলও দেখতে পাই। কান আমার ঠিক আছে। তবে কি জানিস ভাই, ডান হাতের কনুইটা মাঝে মাঝে খটাস করে আটকে যায়। ভাঙা জিনিস মেরামত হলে কলকবজায় একটু গোলমাল থাকেই। কী করব বল? ভগবানের তো কামারের হাত, দু-চারটে হাতুড়ির ঘা না মেরে কি রেহাই দেয়!”
বয়েসে মানুষের অনেক কিছুই বদলে যায়, তবে গড়ন বিশেষ বদলায় না। দিদি মাথায় লম্বা ছিলেন, দোহারা গড়ন। সেই রকমই আছেন প্রায়। পিঠ হয়ত সামান্য নুয়ে পড়েছে, কৃশ হয়েছেন কিছুটা। গাল ভেঙে মুখ সরু সরু দেখায়। মাথার সব চুল সাদা ধবধবে। ঘাড় পর্যন্ত চুল। মাথার কাপড় দেন না। গায়ের রং তামাটে, ঝকঝকে ভাবটা আর নেই। রত্নদিদিকে দেখলে বেশ বোঝা যায়, বাইরের জল বাতাস ধুলো ময়লার শুধু নয় সেখানকার মানুষজনের সঙ্গে মেলামেশারও একটা ছাপ পড়ে গিয়েছে হাবেভাবে চেহারায়। ওঁর নিজের কথাবার্তায় ততটা হয়ত পড়েনি। দিদি বিধবা, কিন্তু থান পরেন না, পরেন মিলের সাদা জমির মিহি সুতোর শাড়ি, কালো বা খয়েরি ধরনের ছাপা পাড় থাকে শাড়িতে। গলায় একটি সরু হার, হাতে দু গাছা ফিনফিনে চুড়ি। কানে কিছু পরেন না, আঙুলেও আংটি নেই।
রত্নদিদি আমাদের সামান্য দূর সম্পর্কের দিদি। তাঁকে যে বেশি দেখেছি তাও নয়, তবু আগে জামাইবাবু বেঁচে থাকতে ওঁরা দু-চার বছর অন্তর একবার করে বাপ শ্বশুরের দেশে আত্মীয়স্বজনের কাছে বেড়াতে আসতেন, দেখাশোনা করে যেতেন যতটা পারতেন আমাদের সঙ্গে। জামাইবাবু চলে যাবার পর সে পাট চুকে গিয়েছে।
