গানটা ভাল।
শেষও হয়ে গেল এক সময়।
“কী! বলেছিলাম কী!” রঙ্গলাল খুশির গলায় বলল, “আমি বাজে কথা বলি না। ভাল ভালই, তা আমার কাছে তোমার কাছেও।’’
ডুমুর চুপ। আড়চোখ করে কী দেখছিল। ভাবছিল। হঠাৎ বলল, “কিন্তু অন্য একটা মুশকিল হয়ে গিয়েছে…।”
“কী?”
“ওই যে জান বলছেন—ওটা তো নেওয়া যাবে না আর।”
“কেন? কেন?” রঙ্গলাল যেন দু পা এগিয়ে গেল।
ডুমুর একটু চুপ। পিঠের বিনুনি যেন পিঠের কাছে সুড়সুড় করছিল। হাতের ঝাপটায় ঠিক করে নিল। বলল, “হয়ে গেছে।”
“হয়ে গেছে! যাঃ! হাউ হয়ে গেল?”
“ইয়ে—মানে ওই যে এবার গিরিডিতে গেলাম। তা জামাইবাবু একজনের ব্যবস্থা করেছে। বড় মাসিকে বলেছে। বাড়ির সবাইকে। ওদের পছন্দের পাত্র…”
রঙ্গলাল মাথা নাড়তে লাগল। “জামাইবাবুর পছন্দ!…কোথাকার কে…”
“ঝাঁঝায় থাকে।”
“ঝাঁঝাকে যা যা করে দাও। কী নাম?”
“নাম আবার কী? ওই ইয়ে—এমনি নাম—শ্রীবিলাস—”
“ধ্যৎ বি-বিলাস! বিড়ি বিড়ি গন্ধ। করে কি ব্যাটা!”
“জামাইবাবুর মতন রেলে চাকরি।”
“রেলওয়ে ক্লার্ক!”
“আজ্ঞে না। টিটি মিটি। বেড়াবার পাস পায়, ডিউটি নিয়ে বেরুলে দুহাতে…”
“বুঝেছি। শেম! ডুমুর তুমি এইসব হাতকে হাত বলছ। ডোন্ট কল ইট হাত ওগুলো হস্ত…ওদের হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি। ঘুষ-ইটার…! প্লিজ !”
“তা আমি কী করব?”
“দেখতে কেমন?”
“চোখে দেখিনি, ফোটো দেখেছি।”
“আরে ফোটো কেউ বিশ্বাস করে। ফোটোতে দিনকে রাত করা যায়, রাতকে দিন। তোমায় ভড়কি মারছে। বিশ্বাস করবে না।…আমাকে তুমি নিজের চোখে দেখছ! কী আমি বাজে দেখতে? পাঁচ ফুট সাড়ে নয় ইঞ্চি, ওজন সাতষট্টি, এম-কম পাস, কাঁটা কারখানার অ্যাসিসটেন্ট অফিসার-ইন-চার্জ, কলকাতার নারকোলডাঙায় বাড়ি, রেসপেক্টেবল ফ্যামিলি আমাদের, বাবা স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিল, ভেরি অনেস্ট ম্যান, বাবা নেই, মা আছে। দাদা বউদি বাচ্চু…। ইউ নো এভরিথিং। কোনও সিক্রেট আমার নেই।
“জামাইবাবু ওই শ্রীবিলাসদের—’’
আবার শ্রীবিলাস! কোনও ভদ্দরলোকের নাম অমন—”
“তোমার নামও তো রঙ্গলাল” ডুমুর এবার তুমিই বলল।
“রঙ্গলাল একটা ক্ল্যাসিক নাম। সেই বিখ্যাত রঙ্গলাল বাঁড়ুজ্যের—কথা ভাব। স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে..রিমেমবার! সেই রঙ্গলাল আর আমি—! তুমি ভাই প্লিজ ঝাঁঝার শ্রীবিলাস বোষ্টমকে কাটিয়ে দাও। ও তোমার চয়েস নয়, আমিই রাইট চয়েস। রাইট চয়েস বেবি!” রঙ্গলাল ঝুঁকে পড়ল।
ডুমুর হঠাৎ বলল, “ওমা, ঠিক তো! ওরা বোস্টম নয়, তবে ও নিরামিষাশী। কী ভাল! আমার আবার নিরামিষ বলেই বেশি পছন্দ।
“ছাগল!”
“কী?
“না। কিছু না!” রঙ্গলাল সরে এল। “যাক গে, তোমার কথাটা তা হলে কী দাঁড়াচ্ছে! তুমি আমার প্রপোজাল অ্যাকসেপ্ট করছ না? বিয়ে করতে রাজি নও!”
“বিয়ে! পুরুত ডেকে?”
“সই করেও হতে পারে।”
“যেভাবেই হোক, সেই বাসরঘর, ফুলশয্যে! ছি !”
রঙ্গলাল অবাক। “ফুলশয্যে কী দোষ করল! সবাই করে। সোশাল প্র্যাকটিস।”
“না বাবা, ওই এক বিছানায় শোয়া। তোমার সঙ্গে…। আমি পারব না। ন্যাকা ন্যাকা কথাই বা কী বলব!”
“ঝাঁঝার বেলায় কী হত? সে তোমায় কোন শয্যায় শোয়াত?”
ডুমুর আড়চোখে দেখল রঙ্গলালকে। বলল, “বারে, তাকে আমি চিনি? সে কী করত, কী করবে—কেমন করে বলব!”
রঙ্গলাল এবার অধৈর্য হয়ে পড়ল। বলল, “ও কে। চ্যাপ্টার ক্লোজড। আমি জানি, দিল হি তো হ্যায় ন সঙো-যিশু দর্দ সে ভর্ন্ আয়ে কিউ? রোয়েঙ্গা হম হাজারো বার, কোঈ হমে সতায়ে কিউ!…আমার এই হৃদয়, হৃদয়ই, ইট বা পাথর নয় যে দুঃখে ব্যথা পাবে না। যদি কেউ এই হৃদয়কে আঘাত করে তা হলে আমি না কেঁদে কেমন করে থাকি।…ও কে ডুমুর, গুড বাই…”
ডুমুর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে রঙ্গলালকে দেখছিল। দেখতে দেখতে বলল, “একটা টাকা দাও তো?”
“টাকা!” রঙ্গলাল থতমত খেয়ে গেল। “টাকা কী করবে?”
“দাও না। কয়েন দেবে।’’
রঙ্গলাল আলনায় ঝোলানো জামা হাতড়ে একটা গোল টাকা বার করে ডুমুরকে দিল।
টাকা নিয়ে ডুমুর বলল, “শোনো, এটাই ফাইন্যাল। টাকাটা টস করব। হেড টেল। যদি তুমি ঠিক ঠিক বলতে পার, ঝাঁঝা বাদ ; যদি না বলতে পার তুমি বাদ! বুঝলে?”
রঙ্গলাল ঘাবড়ে গেল! এ আবার কী? কোন দরের ‘হ্যাঁ’ ‘না’ ঠিক করা! টস করে বিয়ের পাত্র বাছাই। রঙ্গলাল বলল, “কী পাগলামি করছ? কয়েন টস করে এসব সিলেকশান হয়?”
“হয়! বিয়ে মানেই তো তাই! লাগলে তুক, না লাগলে তাক! সবই কপাল।..তুমি টাকা ছুড়বে, না, আমি! কে হেড টেল বলবে? তুমি বলবে!”
রঙ্গলাল ভয় পেয়ে গেল। সর্বনাশ! কল তো ভুল হতেই পারে! ক্রিকেট খেলায় এসব চলে! জীবনের খেলায় চলে না। ডুমুর সত্যিই পাগল। রঙ্গলালের ভয় করতে লাগল। যদি ভুল হয়? হতেই পারে!
“কী আমি টাকা ছুড়ব। না তুমি ছুড়বে! ডাকবে কিন্তু তুমি।”
রঙ্গলালের গলা বন্ধ হয়ে এল। “তুমিই ছোড়। তবে এটা ফেয়ার হল না ডুমুর।”
ডুমুর টাকা ছুড়ল। উঁচুতে উঠে ঘুরতে ঘুরতে মাটিতে পড়ার সময় রঙ্গলাল চোখ বন্ধ করে ডাক দিল, ‘হেড’।
ঠক করে মাটিতে পড়ল টাকাটা।
ডুমুর বলল, “কে দেখবে? তুমি না আমি?”
“তুমিই দেখো,” রঙ্গলালের গলা শুকিয়ে গেছে।
ডুমুর টাকার কাছে গিয়ে মাটিতে বসল। দেখল। তারপর উঠে দাঁড়াল। টাকা তুলল না। খুব আক্ষেপের গলা করে বলল, “তোমার কপাল খারাপ। হেরে গেলে! কী করবে বলো! দুঃখ করো না। জীবনে কত হারজিত আছে!” বলে একটু হাসল। “আমি যাই। রাত হয়ে যাচ্ছে।”
