অনেককাল পরে আবার রত্নদিদিকে দেখে ভালই লাগল। তাঁর যেমন বয়েস হয়েছে, আমাদেরও তেমন কম বয়েস হল না। আমি নিজেই তো কবে ষাট ছাড়িয়ে গিয়েছি।
কথায় কথায় একবার বললাম, “দিদি, হাজার মাইল ঠেঙিয়ে যখন এদিকে এসেই পড়েছ, তখন বিয়ের পাট চুকলে আমাদের সঙ্গে কলকাতায় চলো। দশ বিশ দিন থেকে সকলের সঙ্গে দেখা করে ফিরে যেও। তোমার কোনো অসুবিধে হবে না। তোমাকে ফেরত পাঠানোর দায়িত্ব আমাদের।”
রত্নদিদি হেসে বললেন, “না ভাই, আমায় আর টেনে নিয়ে যাস না। পাক্কা দশ দিনের ছুটি মঞ্জুর করেছে ওপরঅলা। মাথার ওপর এখন বড় ছেলে, বুঝলি তো! এ হল অন্য রাজার রাজত্ব। হুকুম না মানলেই পেয়াদা পাঠাবে। …না রে, এবারে হল না, আবার যদি কোনোদিন আসি তখন কথা রাখব তোদের। এবারও কি এমনি এলাম ভাবছিস! দেখলাম, আমাদের ডালপালায় এটি হল শেষ শুভকাজ। না এলে হয় না। তা ছাড়া আমাদের বাঙালি বাড়ির বিয়ে-থা কতকাল দেখিনি। দেখতে সাধ হল।”
“কেমন দেখলে?”
“ভাল লাগল না। এ কি বিয়ে রে! এ যেন সত্যনারায়ণের পুজো। নৈবিদ্যি সাজিয়ে বসে থাকলি তোরা আর একটা তোতলা বামুন এসে দুটো মন্তর পড়ে চলে গেল। তারপর তো দেখি যা হচ্ছে সবই ভাড়ার ব্যাপার। ভাড়ার লোক বাসর সাজায়, ভাড়াটে একদল লোক এসে রান্নবান্না করে খাইয়ে যায়, কতক লালসবুজ বাতি জ্বাললি তোরা, ঝম্পঝম্প বাজনা বাজালি— ব্যাস, বিয়ের পাট চুকে গেল। এই বিয়ে দেখে কি সাধ মেটে নরেন! বিয়ে ছিল আমাদের সময়ে। বিয়ে তো সাত পাকে মাত্তর, কিন্তু বিয়ের আগে পরে ঊনপঞ্চাশ পাক! কত হইচই, হাসিখুশি, হইহুল্লোড়, মেয়েদের আচার, ভোজের ভিয়েন, বিয়েতলা সাজানো, পিঁড়ি পাতা, আলপনা— বিয়ের রুমাল পদ্য, বাসরের রঙ্গতামাসা… কোথায় গেল সেসব! যাই বলিস, আমার বাপু মন ভরল না।”
“আজকাল এই রকমই হয়, দিদি ; মানুষের আর সময় কোথায়? লোকবল অর্থবল— তাই বা কোথায়?”
“তা নয় রে, ভাই, এখনকার দিনে সবাই কাঁচা রঙে কাজ সারতে চায়, পাকা রঙের দিন ফুরিয়েছে।”
এমন সময় সত্যদার গিন্নি কৃষ্ণাবউদি বলল, “দিদি, এই বিয়ে নিয়ে টানা-হেঁচড়া হচ্ছিল। মেয়ের নিজের পছন্দ, ছেলেরও। চেনাজানা হয়েছিল ওদের। আমাদের তো মেয়ের তরফ, বিয়েটা ভালোয় ভালোয় চুকে গেছে, এতেই আমরা খুশি।”
কথাটা বোধ হয় জানা ছিল না রত্নদিদির। শুনলেন। তার পর কী মনে করে যেন হাসলেন। বললেন, “চেনা-জানা বিয়ে! তাই নিয়ে টানা-হেঁচড়া। আমায় আর ওসব বলিস না। আমার বিয়ের গল্প জানিস! কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ শেষ হতে লেগেছিল আঠারো দিন। আমার বিয়ে নিয়ে, আঠারো মাসের লড়াই! সে যে কী কাণ্ডই হয়েছিল তোরা ভাবতেই পারবি না।”
গল্পটা সত্যি আমাদের জানা ছিল না। জানার কথাও নয়। একসঙ্গে তো মানুষ নয়, একেবারে নিজেরও কেউ নয় রত্নদিদি। ওঁরা থাকতেন এক প্রান্তে আমরা অন্য প্রান্তে, আর রত্নদিদি? বিয়ের সময় আমাদের নিশ্চয় শিশু অবস্থা।
আমি হেসে বললাম, “তোমার বিয়ের গল্পটাই না হয় বলো, শুনি।”
“শুনবি! তা হলে বলি?”
না-শোনার কারণ ছিল না। বিয়েবাড়ি এখন অনেকটাই নিঝুম। বিকেলের গোড়ায় কন্যা-বিদায়পর্ব মিটে গিয়েছে। দেখতে দেখতে সন্ধে হয়ে এসেছিল। বাতি জ্বলছে ঘরে। বাইরে প্রথম ফাল্গুনের মরা শীত আর সদ্য বসন্তের দু-চার ঝলক বাতাস মেশামিশি হয়ে আছে। বাড়িটার চেহারা উড়ুখুড়ু, খানিকটা ম্লান। ছেলেছোকরার দল যে যেখানে পেরেছে শুয়ে পড়ে আরাম করে নিচ্ছে আজকের মতন। কাল থেকে আবার তত্ত্বতাবাসের খাটুনি।
আমাদের দিকের অন্য ব্যবস্থা। বয়স্কজন থাকব বলে যথাসম্ভব সুখসুবিধের ওপর নজর রাখা হয়েছিল।
রত্নদিদির ঘরটি ছোট। খাট বিছানা পাতা। সেখানে বসেই আমরা চার-পাঁচজনে গল্পগুজব করছিলাম।
দুই
রত্নদিদি তাঁর গল্প শুরু করলেন।
“একটু গোড়া থেকেই বলি, না বললে বুঝবি না,” রত্নদিদি বললেন। “আমার বাবা ছিল পোস্ট মাস্টার। সরকারি চাকরি। চাকরির লেজ যত বাড়ে বাবাও তত পুরনো হয়, আর দু-তিন বছর অন্তর বদলি পায়। ছোটখাটো শহরেই বদলি হত বাবা। আমরাও বাবার পেছনে পেছনে আজ মতিপুর, কাল গজুডি, পরশু রামনগর ঘুরে বেড়াই। পাঁচ ঘাটের জল খাই পাঁচ জনে। পাঁচ জন বলতে বাবা মা আমি আমার ছোট ভাই অনু আর আমাদের এক পুষ্যি ভরতদাদা। ভরতদাদা বাবার কাছেই দশ-বারোটা বছর থেকে গিয়েছিল। বাড়ির হাটবাজার করা থেকে পাঁচ-মেশালি ফাইফরমাশ খাটা ছিল ভরতদাদার কাজ।
“আমার বাবাকে লোকে বলত, মাস্টারবাবু, কেউ বা বলত মাস্টারমশাই। নিজের কাজকর্মে বাবার সুনাম ছিল, খাতিরও করত লোকে। বাবার ছিল দুটো শখ। তাস খেলাটা অবশ্য শখ ছিল না, ছিল নেশা ; শখ বলতে এই জ্যোতিষীবিদ্যে করে বেড়ানো, আর মাঝে মাঝে এস্রাজ টেনে নিয়ে বসে নিজের মনে একটা সুরটুর বাজানো। বাবার আর-একটা ঝোঁক ছিল, সিদ্ধি খাবার। সিদ্ধির সরবত, সিদ্ধির গুলি— এ বাবা প্রায়ই খেত, নিজের হাতে তরিবত করে তৈরি করেই খেত।
“মা ছিল আমার নির্বিবাদ মানুষ। শান্তশিষ্ট। হাসিখুশি। দোষের মধ্যে মা গাদা গাদা পান খেত। আবার কত কী, বাবার আনা কাঁচা সিদ্ধিপাতাও মাঝে মাঝে পানের মধ্যে মিশিয়ে দিব্যি খেয়ে নিত। বলত এতে মুখশুদ্ধি হয়।
