রঙ্গলালের মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। এরকম কথা তো ছিল না। ছুটি ফুরোবার সঙ্গে সঙ্গে সে কলকাতা থেকে রিটার্ন করল, আর তুমি নেই, নতুন জামাইবাবুর সঙ্গে আহ্লাদ করতে গিয়েছ!
দুটো দিন অবশ্য এমন কিছু নয়। কোনও রকমে কাটিয়ে দিতেই হবে।
রঙ্গলাল একটা কথা ভেবেই এসেছিল। ফটকটা সে সারিয়ে দেবে। যেভাবে আছে তাতে বড় খারাপ দেখায়। কম্পাউন্ড ওয়ালের ফাঁকফোকরগুলোও মেরামত করাবে ধীরেসুস্থে। আর বাগানটাও পরিষ্কার করিয়ে মালি রাখবে একটা। হপ্তায় দুদিন মালি আসবে। এখানে ভাল গোলাপ হয়। শীত আসছে। দু-চারটে গোলাপ আর মরসুমি ফুল রাখলে মন্দ হয় না।
কিন্তু বাড়ি তো তার নয়। করবে কেন?
“মাসিমা?”
“বলো বাবা।”
“আপনি যদি কিছু মনে না করেন একটা কথা বলি?”
“মনে করব কেন?”
“আমাদের অফিসের এক ছুতোর মিস্ত্রি আছে। তাকে বলেছিলাম, এ বাড়ির ফটকটা একটু মেরামত করে দিতে। তার কাছে ঝড়তিপড়তি কাঠ আছে। একটা কি দুটো দিনের ব্যাপার। সে করে দিয়ে যেতে চাইছে। মানে, ফটকটা ঠিক না করলে যখন তখন গোরু-ছাগল কুকুর ঢুকে যায়। সারিয়ে নেওয়াই ভাল।”
“খরচ?”
“ও কিস্যু না। আমাদের অফিসের মিস্ত্রি। অর্ধেক দিন হাত গুটিয়ে বসে থাকে। …আপনি এ নিয়ে ভাববেন না। এ বাড়িতে তো আমিও থাকি।”
“যা ভাল বোঝ করো।”
রঙ্গলাল এখন শুধু ফটক নিয়ে থাকল। একসঙ্গে বেশি লাফাবার চেষ্টা করা উচিত নয়। ড্যামেজ হয়ে যেতে পারে।
পরের দিনই এক ছুতোর মিস্ত্রি ধরে আনল রঙ্গলাল। অফিসের ধারেকাছেও থাকে না।বলল, একদিনে মেরামতি করে দিতে হবে। কাঠের দাম মজুরি আমি দিচ্ছি। তুরান্ত হাত লাগাও।
রাত্রে রঙ্গলাল অতি বিমর্ষ চিত্তে টেপ রেকর্ডারে সেই গজলটা বাজাতে লাগল। ‘ইয়ে জান তুম না লোগে তো ইয়ে আপ জায়েগি…”
বাইরে কার্তিকের আকাশ, কৃষ্ণপক্ষ চলছে। কত তারা আকাশে। হেমন্তের গন্ধ লেগেছে গাছপালায়, কুয়াশা নামা শুরু হল।
ডুমুর নেই। ধ্যুত—কোনও মানে হয়!
তিন দিনের দিন অফিস থেকে ফিরে এসে দেখল, ডুমুর এসে গিয়েছে।
বাঁচা গেল! ‘আনন্দে ভরিল মন, কুসুমসুবাস এল নিশীথ শয়নে…’
সন্ধেবেলায় ডুমুর এল। হাতে চায়ের কাপ, একটা প্লেটে দুটো বালুসাই আর সেউ নিমকি।
“কী, রঙ্গবাবু! কেমন আছেন? কলকাতায় কেমন কাটল?” মজার গলায় বলল, ডুমুর।
“তোমার কেমন কাটল গিরিডিতে?”
“মজাসে। অনেক মজা হল, হই হই। দিনগুলো যে কেমন করে কেটে গেল খেয়াল করতেই পারলাম না।’’
“হাতে ওসব কী?”
“বিজয়া করুন।”
“মাসিমা করিয়েছেন।”
“আরে এ অন্য বিজয়া, এমন বালুসাই খাননি জীবনে। বাইরে থেকে আনা। নিন, খেয়ে নিন।
রঙ্গলাল প্লেটটা নিল। বলল, “আমি ফিরে এসে দেখলাম তুমি নেই—!”
“এই রকমই হয়। আমি ফিরে এসে দেখলাম, বাড়ির ফটকটা সারাই হয়ে গেছে।”
“খারাপ হয়েছে?”
“বলেছি নাকি?”
বালুসাই মুখে দিয়ে রঙ্গলাল বলল, “বাঃ, বেশ তো?”
‘মহাদেব হালুইকরের বালুসাই। গিরিডির নয় মশাই…বাইরে থেকে আনা।”
“ভেরি গুড।…তোমার জন্যে একটা জিনিস এনেছি। সামান্য জিনিস।”
“কী?”
“দাঁড়াও খেয়েনি আগে। সুটকেসে আছে।”
রঙ্গলাল তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করতে লাগল।
ডুমুর দাঁড়িয়ে। পরনে ছাপাশাড়ি, মস্ত বিনুনিটা পিঠের পাশে ঝুলছে। কালো মুখে যেন আলো জ্বলছে খুশির।
“গিরিডিতে গিয়ে তুমি আরও ব্রাইট হয়ে গিয়েছ?” রঙ্গলাল বলল।
“কই! বাজে কথা।”
“রিয়েলি! কী ব্যাপার বলো তো?”
“কিছুই না। খেয়েছি দেখেছি আড্ডা মেরেছি…”
“জলবাতাসের গুণ। মনের ফুর্তি।”
ডুমুর আড়চোখে দেখল রঙ্গলালকে।
খাওয়া শেষ করে চায়ের কাপ তুলে নিল রঙ্গলাল। “আরে, তুমি বসবে না।” “বসছি।” মোড়ায় বসল ডুমুর।
“দাঁড়াও, জিনিসটা বার করি।” মাটিতে কাপ রেখে, সুটকেসটা টেনে বার করল রঙ্গলাল তক্তপোশের তলা থেকে। চাবি লাগানো ছিল না। খানিকটা আগে সিল্কের মাফলারটা বার করেছে রঙ্গলাল। গলায় জড়ানো ছিল। গলাটা আজ বিকেল থেকেই খুসখুস করছিল। হয়তো সিজন চেঞ্জের সঙ্গে।
রঙ্গলাল একটা কৌটো বার করল। গোল কৌটো। বেশ রংচঙে কাগজ মোড়া। কৌটো খুলে দেখাল ডুমুরকে। “এটা আজকাল মার্কেটে খুব চলছে। ফ্যান্সি জিনিস। সিলভার ব্রেসলেট। চুড়িই বলতে পার। প্লেটিং করা আছে। দু-চারটে কুচি লাল পাথর। বাজারে দারুণ ডিম্যান্ড। ফ্যাশানেবল প্রোডাক্ট। মাপটা ঠিক হল কি না কে জানে! আন্দাজে কেনা। নাও ধরো।…দেখো কেমন?”
ডুমুর নিল। দেখল।
“হাত মে লাগাও জি” ঠাট্টার গলায় বলল রঙ্গলাল। “দেখো, ফিট করে কি না?”
ডুমুর হাতে দিল। চুড়িটা তার হাতে মানিয়ে গেল।
চায়ের কাপ মাটি থেকে আগেই তুলে নিয়েছে রঙ্গলাল। চুমুক দিচ্ছিল। খুশি হয়ে বলল, “বিউটিফুল! ফিট করে গেছে! কী হাত।”
“কার।’’
“তোমার, আবার কার?”
“এর দাম কত?”
“দা-ম! যা, এ আবার কী! এসব হল শখের জিনিস, নট ফর সিন্দুক। মেয়েরা শখ করে পরে। বউদিকে দিয়ে পসন্দ করিয়ে নিয়েছি। দাম কিছু না!”
“বউদি?”
“আমার বউদি।”
“ও।”
“আচ্ছা, এবার তোমায় সেই গানটা শোনাই। ওই দেখো টেপ রেকর্ডার, ক্যাসেট।”
ডুমুর দেখল। হয়তো আগেই দেখেছে। কিছু বলেনি।
রঙ্গলাল নাচতে নাচতে গিয়ে ক্যাসেট দেখে টেপ রেকর্ডারে লাগিয়ে দিল।
ক’ মুহুর্ত পরেই গান শোনা গেল : ‘ইয়ে জান তুম না লোগে তো ইয়ে আপ জায়েগি…!’
