“এই যে মশাই নিন, গ্লাসে করে এনেছি। মা বলল, আদার রস দিয়ে করে দে, অবেলায় আশ্বিনমাসে বৃষ্টিতে ভিজেছে। জ্বরজ্বালা হতে পারে। নিন, আদা গোলমরিচ চায়ের মিক্সচার খান। ঘোড়া মিক্সচার।’’
চা নিল রঙ্গলাল। “তুমি খাবে না?”
“না। আমি এমনি চা খেয়েছি।”
“জ্বরজ্বালা তো তোমারও হতে পারে।”
“দূর, আমাদের শরীর অত পলকা নয়। গরিবের শরীর। দরকার পড়লে বাসন মাজতে হয়, ঘর ঝাঁট দিতে হয়…”
“ও, অ-পলকাদের জ্বর হয় না?”
“হলে শুয়ে পড়ে থাকব। আপনাকে তো আবার পুজোর ছুটিতে কলকাতায় যেতে হবে। জ্বর হলে যাবেন কেমন করে?”
“যাবার এখন আট দশদিন বাকি! বাঃ, দারুণ হয়েছে তো! থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ। বসো৷”
“কত দিনের ছুটি আপনার?”
“দিন দশেক।’’
“পূর্ণিমা পর্যন্ত।”
“হ্যাঁ। আগেই তো বলেছি তোমায়।”
মোড়ায় বসে পড়েছিল ডুমুর। মাঝে মাঝে হাত দিয়ে মাথার এলানো চুল ছড়িয়ে ফাঁক করে নিচ্ছিল।
“তোমাদের পাড়াতেও তো পুজো হচ্ছে প্যান্ডেল বাঁধছে দেখলাম।” “বরাবরই হয়।”
একটু চুপচাপ। তারপর রঙ্গলাল বলল, “কাল রবিবার। কাল একবার সকালে ট্রাই করব। পারব মনে হচ্ছে।”
“পারবেন না। কাঁটা দিয়ে ডোবা বালতি তোলা অত সহজ নয়! এলেম চাই। পশুপতিকে খবর দেব। তুলে দিয়ে যাবে। ওরা পারে। ওদের কাজ।”
“চেষ্টা করে দেখি…।”
“দেখতে পারেন। আপনার মুরোদে কুলোবে না।”
রঙ্গলাল চায়ের গ্লাস নামিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে নিল। তুলে নিল আবার গ্লাস। হাসল। “আমার মুরোদ সম্পর্কে তুমি সবজান্তা হয়ে গেছ?”
ঘাড় হেলিয়ে দিল ডুমুর। “আধজান্তা হয়েছি।”
“কথায় তুমি খুব পাকা।”
“আজ্ঞে, বয়েস তো কম হল না। আপনার মতন পেটভরা বিদ্যে না থাক—একটু মাথা তো আছে।”
রঙ্গলাল হাসতে হাসতে বলল, “মাথা তোমার আছে। তবু মাসিমা বলেন, ও কেমন পাগলি মেয়ে। বিধুবাবু বলেন, খেপি।”
“জানি। মুখ আছে, বলে। আমিও তো বলতে পারি…”
“কী?”
“বাদ দিন ওসব।” ডুমুর সামান্য চুপ করে থাকল। হাঁচল বার কয়েক। আঁচলে নাক চেপে থাকল দু মুহূর্ত। তারপর বলল, “কই, দাবা খেলবেন না?”
‘না। আজ আর ভাল লাগছে না। দাবাটা আমার মগজে ঢোকে না। তুমি ভালই পার।”
“মগজে কী ঢোকে!”
“আর সব ঢোকে।…আমি ক্রিকেট খেলতে জানতাম, তবলায় ঠেকা দিতে পারতাম, নাটক করেছি অফিস ক্লাবে—। তাসটাও জানি। ভালই জানি।” “ওরে বাবা, অনেক গুণ। গানও তো গাইতে জানেন।”
“খারাপ নয়, সে তুমি যাই বলো।”
“নমুনা তো পাই মাঝে মাঝে,” ডুমুর হাসল। “পরশু সকালে কী একটা যেন গাইছিলেন গলা চড়িয়ে।”
“কবে? পরশু? পরশু সকালে।…দাঁড়াও মনে করি?…হ্যাঁ, মনে পড়েছে— একটা গজল গাইছিলাম : ‘ইয়ে জান তুম না লোগে তো ইয়ে আপ জায়েগি। ইস বেবফা কি খ্যয়ের কঁহা তক্ মানায়েঁ হুস্!’ আমার গলাটা স্লাইট ভাঙা ভাঙা একটু নাকি নাকি করে গাইলে গজলে দারুণ সুট করে যায়।”
“তাই বুঝি! তা মানে কী মশাই জান তুম না লোগে না কী যেন বললেন?”
“মানে আছে। তবে বাংলায় বললে এর রস নষ্ট হয়ে যায়…। আরবি, ফারসির ব্যাপারটাই আলাদা…গজল ঠিক বাংলায় হয় না।”
“মানেটা বলুন না।”
“মানে—মানের জন্যে কেউ গান গায়! মানেটা শুনে—’’
“শুনি!”
রঙ্গলাল কেমন অস্বস্তিতে পড়ে গেল। তারপর আমতা আমতা করে নিচু গলায় বলল, “মানে হল, মানে একজন লাভার বলছে এই প্রাণ আমার তুমি যদি না নাও তবে সে নিজেই আমাকে ছেড়ে যাব! মানে, আমি ডেড। ইস বেবফা কী খ্যয়ের…”
“বারে”, ঠোঁট কেটে ডুমুর বলল, “না নিলে প্রাণ ছেড়ে যাবে! কোথায় যাবে? খাঁচায় না মাচায়, আকাশে না মাটিতে?” বলে হি হি করে হেসে উঠল।
রঙ্গলাল একেবারে অপদস্থ। কথা আসছিল না! দূর শালা, বাংলায় কি ইয়ে জান তুম না লোগে গাওয়া যায়? শরিফ মিয়ার গলায় গানটা শুনলে বুঝতে পারত ডুমুর এই গানের কী ডেপথ, কী রকম এক্সটেনসান অফ সরো, কী প্রচণ্ড আকুলতা।
নিজেকে সামলে নিয়ে রঙ্গলাল বলল, “হেসে সব জিনিস উড়িয়ে দিয়ো না মিস ডুমুর। এবার আমি কলকাতা থেকে ফেরার সময় আমার টেপ রেকর্ডার আর গজলের ক্যাসেট নিয়ে আসব। তখন শুনবে। রেকর্ডার খারাপ হয়ে আছে আনতে পারিনি। আমি যদি প্রিপেয়ার হয়ে আসতাম—তোমায় শুনিয়ে দিতাম।”
ডুমুর হাসতে হাসতে বলল, “ক্যাসেট আনবে তো। এনো! প্রাণ তো আনবে না “ ডুমুর নিজের অজান্তেই তুমি বলে ফেলল।
চার
লক্ষ্মীপুজোর পরের দিনই রঙ্গলাল কলকাতা থেকে ফিরে এল।
এবার অনেক জিনিস গুছিয়ে এনেছে। শীত সামনে বলে গরম পোশাক কিছু, তার শখের টেপ রেকর্ডার, যেটা সারাতে দেওয়া ছিল বলে আগের বার আনতে পারেনি, একগাদা ক্যাসেট, নিজের ক্যামেরা, এমন কি একটা চার সেলের চৌকো টর্চ, কয়েকটা থ্রিলার বন্ধুবান্ধবদের হাত ফেরতা।
ফিরে এসে দেখল, ডুমুর নেই। কোথায় গেল?
মনোরমা বললেন, আর বোলা না, আমার বড় বোন আর বোনঝিরা কিছুতেই ছাড়ল না। গিরিডি গিয়েছে। দ্বাদশীর দিন। বড় বোনঝির বিয়ে হয়েছে গত শ্রাবণে। তখন গিয়েছিল ডুমুর। এবার টেনে নিয়ে গিয়েছে নতুন জামাই, মেয়ে পুজোর সময় এসে রয়েছে ওখানে। দু-চার দিন হইচই করবে সবাই মিলে তাই। আমি আর কেমন করে না করব! আমার তো একটিই মেয়ে, সমবয়েসি সঙ্গী নেই বাড়িতে। যাক, ঘুরে আসুক। দু-একদিনের মধ্যেই ফিরে আসবে।
