রঙ্গলাল ডুমুরের রাগারাগি বেশি বাড়তে দিত না। বাবার কথা থেকে অন্য কথায় চলে যেত বুদ্ধি করে।
“তুমি লেখাপড়া করলে না কেন?”
“করেছি তো। স্কুল শেষ করে আর করিনি।”
“কলেজে?”
“কলেজে নলেজ বাড়ে? ছাই বাড়ে! আসুন না আপনি আমার সঙ্গে অংক কষতে, মশাইকে আমি ঘোল খাইয়ে দেব।” ডুমুর আজকাল রঙ্গলালকে ‘রঙ্গদা’ বলে। মাঝে মাঝে তুমিও হয়ে যায়।
রঙ্গলাল হেসে বলল, “আমি এম কম পাস তা তুমি জান?”
“মাস্টারগিরি রাখুন। আমি ছেলেবেলা থেকে অনেক মাস্টার চিবিয়েছি।” বলে ইশারায় বই দেখাল—মানে অংকের বই। আবার বলল, “মুখে মুখে এক মিনিটে একটা হিসেবের অংক করে দিতে পারেন? তিন হাজার তিনশো তিরানিব্বই, প্লাস পাঁচ হাজার পাঁচশো পঞ্চান্ন, ইন্টু ন হাজার ন’শো নিরানব্বই মাইনাস এক কোটি পঞ্চান্ন লক্ষ তিরিশ হাজার চারশো ছেচল্লিশ হলে—তোমার অংকফল কী হবে?”
রঙ্গলাল মাথা নাড়তে নাড়তে হেসে বলল, “মুখে মুখে পারব না, কাগজ কলম নিয়ে বসতে হবে।”
“এই বুদ্ধি! পাস! কাঁচকলা।”
“যা বলেছ! কাঁদি।”
“আচ্ছা সাধারণ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি, চারটে চুম্বক এক জায়গায় রাখা আছে। এক কথায় কী বলা যাবে চারটে চুম্বককে? চৌচুম্বক, চুচুম্বক না চতুর্চুম্বক?”
রঙ্গলাল অট্টহাস্য হেসে ফেলল। বলল, “জানি না।”
“আচ্ছা আর-একটা প্রশ্ন। আকাশে পাশাপাশি দুটো তারা একটা থেকে অন্যটা কত দূরে থাকে।”
রঙ্গলাল এবার অবাক হল। এরকম প্রশ্ন তো ডুমুরের করার কথা নয়! সে নিজেও কোনওদিন করতে পারত না। বলল, “তোমার মাথায় হঠাৎ আকাশের তারা এল কেন?”
“বাঃ, আসবে না! আকাশের তারা দেখলে মনে হয় না, কত গায়ে গায়ে রয়েছে। তা বলে তাই কি থাকে! একটা থেকে আরেকটা হয়তো লক্ষ লক্ষ মাইল দূর।”
রঙ্গলাল বলল, “তুমি এসব পড়?”
“এ তো ছেলেবেলা থেকে পড়েছি।…আমাদের বাড়িতে দাদু-দিদিমার রেখে যাওয়া অনেক পুরনো কাগজ আছে। বাঁধানো কাগজ। কত পত্রিকা উই খেয়ে শেষ করে দিয়েছে। এখনও দেড় দু আলমারি আছে!”
“যা চ্চলে। আমায় তো বলবে একবার। আমি এখানে একটাও বই পড়তে পারি না। শুধু বাসি খবরের কাগজ।”
“তা জানব কেমন করে! মুখ দেখে?” ডুমুর মুচকি হাসল। কী পড়বেন? ষণ্ডার ঘাড়ে গুণ্ডা?”
“যাঃ। ফাজলামি কোরো না।”
“ফাজলামি কেন! দিনেন রায়ের লেখা। বেশ, ‘মেসোপটেমিয়ায় প্রথম বাঙালি’ পড়বেন?”
“না।”
“তা হলে একটা উপন্যাস পড়তে পারেন, ‘ঝড়ের পাখি।’ মেয়ের লেখা। না হয় ‘পরশমণি’।”
রঙ্গলাল বলল, “যা হয় দিও।সময় কাটলেই হল।”
“ঠিক আছে এনে দেব।” …আগে ‘লুলু’-টা পড়ুন।”
“লুলু?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ, ‘লুলু’। …নগেন গুপ্ত।”
“তাই দিও।”
সত্যিই ডুমুর একটা করে পুরনো বাঁধানো পত্রিকা এনে দিতে লাগল রঙ্গলালকে। ভাদ্রমাস শেষ হয়ে আশ্বিনের মাঝামাঝি চলছে।
সামনে পুজো।
রঙ্গলাল সকালে কিছু জামা প্যান্ট মাটিতে ফেলে সরস্বতীকে বলছিল, এই যাবার সময় এগুলো ধোপার বাড়িতে দিয়ে যাস। বলবি আসছে হপ্তায় দিতে। বাবুর দরকার।
এমন সময় ডুমুর এল। হাতে চায়ের কাপ। আজকাল সে মাঝে মাঝে সকাল সন্ধেতে রঙ্গলালকে চা এনে দেয়। নিজেদের চা হয় যখন তখন বাড়তি এক কাপ তৈরি করে নেয়। মনোরমাই হয়তো বলে দিয়েছেন।
চা রেখে ডুমুর বলল, “আপনি বালতি তুলতে পারেন?” রঙ্গলালকেই বলল, সরাসরি।
“বালতি?”
“কুয়ায় বালতি পড়ে গেছে।”
“কেমন করে?”
“দড়ি ছিঁড়ে। পারেন তুলতে?”
“কেমন করে তুলব। আমি কি কুয়ার মধ্যে নামতে পারি?”।
“না মশাই বালতি তুলতে কুয়ায় নামতে হয় না। কলকাতার বাবুলোক—কিছুই জানেন না। বালতি তোলার কাঁটা আছে। কাঁটা দিয়ে তুলতে হয়।”
“ও। তা চৈতন্য..”
“তার জ্বর। জ্বর হয়ত একশো, কম্বল মুড়ি দিয়ে পড়ে আছে—আর ভবতারার গান গাইছে।’’
রঙ্গলাল চা খেতে খেতে বলল, “তুমি যদি দেখিয়ে দাও—আমি একবার ট্রাই করতে পারি। আমার আবার অফিস। তবে আজ শনিবার। দুপুর দুপুর ছুটি। বিকেলে অনেক সময় পাব।”
“তা পাবেন। তবে তখন অন্ধকার হয়ে আসবে।”
“আরে না না, অত অন্ধকার হবে না। আমার চোখ খুব ব্রাইট। দারুণ ভিশন। তবে তোমার চোখ আরও ঝকঝকে।”
ডুমুর আড়চোখে দেখল রঙ্গলালকে। মুচকি হাসল। “দেখা যাক।”
বিকেলের গোড়াতেই রঙ্গলাল ডুমুরকে নিয়ে কুয়াতলায় বালতি তুলতে গেল। দড়িতে অন্য একটা বালতি বাঁধা। বালতি খুলে ভারি কাঁটাটা বাঁধল। তারপর ঝুঁকে পড়ল। এমন সময় বৃষ্টি এল। আশ্বিনের বৃষ্টি। হঠাৎ এল এবং জোরেই। কুয়াতলার পাশে কলাগাছের পাতায় বৃষ্টি পড়ার শব্দ। হরীতকী গাছের পাতা উড়তে লাগল। দেখতে দেখতে ঘোর হয়ে গেল আকাশও।
রঙ্গলালদের পালিয়ে আসতে হল। দু’জনেই ভিজে গিয়েছে। জামা পাজামা শাড়ি লেপটে রয়েছে শরীরে।
ডুমুর নিজেদের দিকে চলে গেল। রঙ্গলাল তার ঘরে।
জামাটামা বদলাবার সময় রঙ্গলালের ভালই লাগছিল। কুয়াতলার পারে শুয়ে বুক ঝুঁকিয়ে কাঁটা নিয়ে সে যেন চমৎকার এই খেলা শুরু করেছিল। পাশে ডুমুর। মাথার ওপর আশ্বিনের আকাশ কখন আচমকা মেঘ এনে দিল বৃষ্টি নামিয়ে। এ একেবারে ঝাপটা মারা এলোমেলো বৃষ্টি, যেন দোলনায় দুলে আসছিল বৃষ্টি, এই এল, গেল, আবার এল। কলাগাছের সবুজ পাতাগুলোও দুলে দুলে উঠছিল।
বৃষ্টি থামল। সন্ধে হল।
ডুমুর এল আরও খানিকটা পরে। মাথার চুল পিঠে ছড়ানো। ভেজা চুল তো আর বিনুনি করে রাখা যায় না। পরনে ডুরে শাড়ি। গায়ের জামাটা সাদা।
