অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিতে লাগল রঙ্গলাল।
সামান্য পরে বিছানা ছেড়ে উঠে হাতড়ে হাতড়ে টর্চটা পেল। কিন্তু মোমবাতির টুকরোটা শেষ। নতুন আর কেনাও হয়নি। ভুলে গিয়েছে। টর্চ জ্বেলে কতক্ষণ বসে থাকা যায়!
বৃষ্টি জোরেই পড়ছে। একটা জানলা আধাআধি খোলা। বিদ্যুতের ঝলকানি চোখে পড়ছিল। বাতাসও ঠাণ্ডা।
টর্চ জ্বেলে জানলার কাছে গিয়ে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করল। জল আর জল, আতাঝোপে পাতায় বৃষ্টির ঝাপটা লেগে সব দুলছে।
ফিরে এল রঙ্গলাল। বিছানাতেই বসল আবার। টর্চ জ্বালিয়ে অকারণ ব্যাটারি খরচের কোনও মানে হয় না। তার চেয়ে অন্ধকারে বসে থাকাই ভাল।
একলা অন্ধকার ঘরে বৃষ্টির মধ্যে বসে থাকতে থাকতে তার গান এসে গেল। রঙ্গলাল প্রথমে নিচু গলায় সামান্য রিহার্সাল দিয়ে নিয়ে ক্রমশই গলা চড়িয়ে গাইতে লাগল : ‘এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘন ঘোর বরিষায়…।’
রঙ্গলাল একটু আধটু গাইতে পারে। গাইতে পারে বলে অফিস থিয়েটারে মাঝারি গোছের একটা পার্টও পেয়ে যায়। সেবার তো স্টেজে ‘ব্যাপিকা বিদায়ের’ গান গাইতে গাইতে ঘোষালের কোমরে এক গুঁতোই মেরেছিল। কেন মারবে না! ওই শালা ঘোষাল হিরোইন অঞ্জলিকে আজেবাজে জায়গায় টাচ করছিল।
গান গাইতে গাইতেই রঙ্গলাল শুনল, বারান্দার দিক থেকে গলা ফাটিয়ে কে যেন চেল্লাচ্ছে।
গান থেমে গেল রঙ্গলালের। তাড়াতাড়ি টর্চ জ্বালিয়ে বারান্দায় এল।
“কে?”
“আমি। দেখুন তো আপনার বারান্দায় সাপ ঢুকল নাকি?” জাফরির ফাঁক থেকে ডুমুর বলল। তার হাতে লণ্ঠন।
“সাপ! বারান্দায়!” রঙ্গলাল লাফিয়ে উঠল।
“দেখুন আগে।”
টর্চের আলো ফেলে ফেলে বারান্দা দেখল রঙ্গলাল। সাপ দেখতে পেল না, তবে ব্যাঙ উঠে পড়েছে দু একটা মাঠ থেকে। আগেও উঠেছে। সিঁড়ি দিয়ে লাফাতে লাফাতে দিব্যি উঠে আসে।
“কই, সাপ তো নেই”—রঙ্গলাল ভয়ে ভয়ে বলল।
“তা হলে ঘরটা দেখুন।”
“ঘর! কী সর্বনাশ।”
“দেখুন আগে।”
“তুমি সাপ দেখলে কোথায়?”
“বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছি। হঠাৎ দেখি একটা সাপ সরসর করতে করতে পাশের বারান্দায় চলে গেল।”
সাপে রঙ্গলালের ভীষণ ভয়। কলকাতায় সে যেসব সাপ দেখেছে সেগুলো বেদেদের ঝুড়ি থেকে মুখ বাড়ায়, বাঁশির সুরে দোল খায়। আসল সাপ সে দেখেনি। চিড়িয়াখানাতেও সে সাপের দিকে পা বাড়ায় না।
রঙ্গলাল বলল, “ঘরে আমার মোমবাতিও নেই। একেবারে অন্ধকার। টর্চ জ্বেলে জ্বেলে ঘরের কোথায় সাপ খুঁজব!”
“টর্চ দিয়েই দেখুন! তাতে ভাল দেখা যায়।”
“দেখতে গিয়ে যদি কিছু হয়ে যায়। সাপে আমার ভীষণ ভয়। সাপ শুনেই গায়ে কেমন করছে! সিরসির।”
“কী লোক রে বাবা! গোরুতে ভয়, ছাগলে ভয়, সাপে ভয়। ভয়ের পুঁটলি!” “আলো যে নেই! কী করব!”
“জ্বালাতন! কলকাতার বাবু!.আসছি আমি—”
ডুমুর বাহাদুর মেয়ে! ওই বৃষ্টির মধ্যে হাতে লণ্ঠন ঝুলিয়ে বারান্দার সিঁড়ি টপকে ভিজতে ভিজতে এপাশে চলে এল। বৃষ্টি বাঁচাতে মাথায় একটু কাপড় তুলেছিল।
ঘরে এসে ডুমুর লণ্ঠনের আলোয় ঘরটা ভাল করে যেন দেখে নিল। “না, দেখতে পাচ্ছি না। ও তবে মাঠেই নেমে গেছে।’’
রঙ্গলাল নিশ্চিন্ত হল। “সাপ তুমি দেখেছিলে?”
“না দেখলে বলি?”
“কী সাপ? বিষাক্ত!”
“বা রে মশাই, আমি কেমন করে জানব! হতে পারে বিষাক্ত!”
“মহা মুশকিলে পড়া গেল! এখানে সাপও আসে।”
“মেঠো জায়গায় বর্ষাকালে সাপ আসবে না।”
“আমার হয়ে গেল। ঘুম বন্ধ।”
“ঘুম বন্ধ কেন! কাল খানিকটা কার্বলিক অ্যাসিড ছড়িয়ে দেব। সাপ আসবে না। অ্যাসিডের গন্ধ ওরা সহ্য করতে পারে না।”
কী মনে করে রঙ্গলাল বলল, “তুমি না মাথার যন্ত্রণা নিয়ে শুয়েছিলে বিছানায়, হঠাৎ বৃষ্টির মধ্যে বারান্দায় এলে কেন?”
“বা রে! মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছিল তো কী হল! মার একটা ওষুধ খেলাম। যন্ত্রণা কমে গেল। গা মুখ ধুয়ে চা খেলাম, বৃষ্টি এল। কী সুন্দর বৃষ্টি। আলো নিয়ে বারান্দায় এলাম একবার বৃষ্টি দেখতে। কানে গেল, কে একটা চেঁচাচ্ছে। বারান্দার এপাশে এসে কান পেতে শুনি আপনি গান চড়িয়েছেন…”
রঙ্গলাল থতমত খেয়ে গেল। “গান চড়িয়েছি মানে?”
“ওই হল!…দম না থাকলে পুরনো রেকর্ড চাপালে ওই রকম শব্দ হয়।”
“আচ্ছা! তুমি গান জান?”
“না। নকল করতে জানি।”
“শুনি তো একটু নকল।”
“না। আপনার ঘরে বসে আমি রাত্তির বেলায় গান গাইব কেন? আমি অসভ্য?”
রঙ্গলাল হেসে ফেলল। পরে বলল, “আমি তোমায় অসভ্য বলেছি। তুমি খুব সভ্য। দারুণ। …বেশ, কাল সকালে না হয় মাঠে দাঁড়িয়ে গান শুনিয়ে দিও।”
ডুমুর ঘাড় হেলিয়ে বলল, “কালকের কথা কাল, যদি পড়ে তাল বড়াভাজা খাবে জাদু এখন খাও গাল…”
রঙ্গলাল হো হো করে হেসে উঠল।
ডুমুর বলল, “আমি যাই। আলোটা থাকল। …একটা লণ্ঠন কিনে আনবেন মশাই কাল, মোমবাতিতে কিছু হয় না।”
“তাই দেখছি।…কিন্তু সাপ! সেটা কোথায় গেল?”
“নিজের জায়গায় চলে গেছে। আর যদি কামড়ায় কী হবে! পায়ে দড়ি বেঁধে দেব। এখানে শিশিরজেঠা ভাল ইনজেকশান দেয় সাপের। পটাপট দু চারটে দিয়ে দেবে। মরবেন না।”
আলো রেখে চলে যাচ্ছিল ডুমুর। রঙ্গলাল বলল, “দাঁড়াও।” বলে আলো হাতে করে তাকে সিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিল।
“সাপ কামড়ালে তোমায় কিন্তু ডাকব”, রঙ্গলাল হাসতে হাসতে বলল।
তিন
রঙ্গলালের সঙ্গে ডুমুরের ভাবসাব জমে গেল। এখন দুজনে গল্পগুজব হয় নানারকম। বাড়ির গল্প, নিজেদের গল্প। হাসিতামাশা। আবার অন্য গল্পও হয়। যেমন ডুমুরের বাবার গল্প। বাবাকে ডুমুর পছন্দ করে না। একটা বয়স্ক মানুষ কুম্ভমেলায় গিয়ে রাতারাতি ভোল পালটে ফেলল কেমন করে ডুমুর ভাবতেই পারে না! সাধু সন্ন্যাসী হওয়া অত সহজ! হাজারটা সাধুর মধ্যে ন’শো নিরানব্বইটা হল ‘ভেকধারী’, খায়-দায় গাঁজা চড়ায় আর বগল বাজায়। বাবা স্বার্থপর ; মাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মেরেছে। এ-বাড়ি কি বাবার নাকি? দিদিমার বাড়ি—মা পেয়েছিল। বাবা তো চুনসুরকি ইটের দোকান করতে করতে একদিন পালিয়ে গেল। যাবার সময় মায়ের ছ’গাছা চুড়ি আর একটা হার নিয়ে পালিয়েছে। … ভাগ্যিস—দিদিমার কিছু টাকাপয়সা মায়ের নামে জমানো ছিল, নয়ত—ডুমুররা না খেয়েই মরত।
