মিনিবাসের মধ্যেই রঙ্গলাল ততক্ষণে মুখ লুকিয়েছে।
হলে হবে কী! জাত মাতাল ঘোষাল তাকে চিনে ফেলল।
পরিণাম এই। ট্রান্সফার। কোথায় কলকাতা আর কোথায় এই নপাহাড়ি। তিনশো পঁচিশ কিলোমিটার তফাতে বদলি।
রঙ্গলালদের এখানকার কারখানায় তারকাঁটা তৈরি হয়। বড় কাঁটা, ছোট কাঁটা, তিন মুখ— চার মুখ খোঁচা। মিলিটারিতেও সাপ্লাই যায়।
তা রঙ্গলালের কিছু করার ছিল না। বন্ধুদের শুধু দুঃখ করে বলল, শালা আমায় একবার আগে বলল না, কাঁটায় গেঁথে দিল। ঠিক আছে, আমার নামও রঙ্গলাল। ঘোষালকে আমি দেখে নেব। আর অফিসের অঞ্জলিকে বলল, ‘জম্আ করতে হো কিউ রাকিবোঁ কো, ইক তামশা হুয়া গিলা না হুয়া।’ অঞ্জলি এসব শায়েরির কিছুই বুঝল না।
তা রঙ্গলাল আজ মাসখানেকের বেশি এখানে। এসেছিল যখন তখন ঘন বর্ষা। এখন বৃষ্টিবাদলা একটু কমের দিকে। তবে ভাদ্রমাস বলে কথা! কবে কোনদিন ভাসায় কেউ বলতে পারে না। ভরা ভাদর তো পড়েই আছে।
আসার পর প্রথম মাসটা ‘তারা হোটেলে’ ছিল। তারা মানে ‘নবতারা হোটেল’। এখানে হোটেল মেস নেই বললেই চলে। তারা হোটেলে এক মাসেই রঙ্গলালের অবস্থা কাহিল হয়ে পড়ায়— অফিসের সিধুবাবু তাকে একটা ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। মানে এই বাড়িটি জুটিয়ে দিয়েছেন দয়া করে। পাড়াটা ভাল, ফাঁকা ফাঁকা, বড়লোকদের উৎপাত নেই, আবার গলিঘুঁজি মাছের আঁশ কুমড়োপচার জঞ্জালও পড়ে থাকে না। মধ্যবিত্ত পাড়া, খানিকটা ছিমছাম ভাবও আছে এখানে।
আজ তিনদিন হল রঙ্গলাল এই বাড়িটায় এসেছে। মানে বাড়ির একটা পাত্তা পেয়েছে। ভাড়া একশো পঁচাত্তর, তিনটে আলো একটা পাখার জন্যে ইলেকট্রিক বাবদ পঁচিশ। মানে দু শোতে হয়ে যাচ্ছে। তক্তপোশ আর টুলের জন্যে অবশ্য ভাড়া গুনতে হয় না। একটা চেয়ার একজোড়া মোড়া রঙ্গলাল নিজেই কিনে এনেছে। খাওয়া দাওয়া বাইরে। জানকীর কেবিনে চা নিমকি জিলিপি সিঙ্গাড়া থেকে মাখন রুটিও পাওয়া যায়। কালাচাঁদের হোটেলটাও ভাল, পরিচ্ছন্ন, যা খাওয়ায় যত্ন করেই পাতে তুলে দেয়। ঘরদোর ঝাটমোছ করার জন্যে একটা বাচ্চা মেয়ে আছে— সরস্বতী।
কলকাতা থেকে আসার সময় রঙ্গলালের মেজাজ যতটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল, এখন তার মাত্রা অনেক কমেছে। ভালই লাগছে তার নপাহাড়ি।
টুলের ওপর আয়না জল সাবান সাজিয়ে, সেফটি রেজারে নতুন ব্লেড লাগিয়ে রঙ্গলাল দাড়ি কামাতে বসে পড়েছিল। কোনও তাড়া নেই। কেমন একটা আলসেমিও লাগছিল। দাড়ি কামাতে কামাতে শরৎশোভাও দেখছিল মাঝে মাঝে। না, আর যাই হোক, কলকাতায় এসব পাওয়া যেত না। এমন রোদ, নীল-সাদা মেঘ, পড়ো মাঠ, অল্পস্বল্প বাগান, করবী কলকে…।
রঙ্গলাল গুনগুন করে একটা গানও ভাঁজছিল, আমার রাত পোহাল, শারদপ্রাতে আমার..’, হঠাৎ একেবারে আচমকাই এক চিল চিৎকার। গেল গেল রব তুলে চকিত আর্তনাদ যেন। রঙ্গলালের হাত কেঁপে গেল। লাগল গালে।
“এই যে—শুনছেন। শুনছেন নাকি—” বলতে বলতে জাফরির ফাঁক থেকে কে যেন বলল, “মাঠে একটা গোরু ঢুকে পড়েছে। সব খেয়ে গেল। একটু তাড়িয়ে দিন না।”।
জাফরির ওপারের মুখ এপার থেকে দেখা গেল না স্পষ্ট করে, শুধু চোখ, নাক আর শাড়ির একটা আভাস। রঙ্গলালের তখন পয়লা নম্বর শেভ শেষ হয়েছে, দু নম্বর সাবান লাগানো চলছে গালে।
“একটু তাড়াতাড়ি করুন না! সব যে গেল বাগানের।”
বিরক্ত হলেও রঙ্গলালকে সাবান-লাগানো মুখ নিয়ে উঠতে হল।
এ পাশ থেকে রঙ্গলাল আর ও পাশ থেকে মেয়েটি বারান্দার নীচে নামল। মাঠে।
“ওই যে দেখুন—, দেখুন! এ মা। পটপট করে কচি দোপাটিগুলো এবার খেয়ে ফেলছে!”
রঙ্গলাল গোরুটাকে দেখতে পেল। খয়েরি রং। সাইজ মিডিয়াম তবে গাঁট্টাগোট্টা। শিং আধাআধি। গোরুটা পরমানন্দে যা পাচ্ছে চিবিয়ে যাচ্ছে। কোনও ভূক্ষেপ নেই। অমন সবুজ ঘাস, লতাপাতা!
“যান না একটু তাড়াতাড়ি যান…। এবার ডাঁটাগুলো খাবে। সর্বনাশ হয়ে গেল।”
রঙ্গলাল হ্যাট হ্যাট করতে করতে এগিয়ে গেল।
গোরু নির্বিকার। দোপাটি শেষ না করেই পাশের ছোট সবজিবাগানে কোনও একটা লতানো ডাঁটা চিবোতে শুরু করেছে।
“একটু পা চালিয়ে যান! ইস বাবা, কী পাজি রে!”
পাজি! কে পাজি? গোরু না সে? তবু রঙ্গলাল পা চালিয়ে গোরুর কাছে যেতেই জীবটি মুখ তুলে দেখল। শুধু দেখল না, মুখে সাবান লাগানো মানুটিকে সে অন্য কিছু ভেবে দু কদম এগিয়ে এল। মাথাটায় গোঁতানোর ভঙ্গি।
রঙ্গলাল পিছিয়ে এল। পিছিয়ে এসে হ্যাট হ্যাট করতে লাগল ডান হাত তুলে, যেন এই বুঝি ইট পাটকেল ছুঁড়ে মারবে।
গোরুদেরও বুদ্ধি থাকে। নকল ব্যাপারটা আঁচ করে এবার সে তেড়ে এল প্রায়।
পিছিয়ে গেল রঙ্গলাল। “গুঁতোতে আসছে!”
“আসবেই তো! ঢিল মারুন। ওটা ভীষণ পাজি।”
“কোথায় ঢিল?”
“মাটিতে। দেখুন খুঁজে।”
আশেপাশে কোনও ঢিল দেখতে পেল না রঙ্গলাল। ইটের টুকরো জমানো আছে। একপাশে অবশ্য, কিন্তু কম পক্ষে বিশ গজ দূরে। বাগানের যত্রতত্র হাত বাড়াতে নেই। ইটের গাদায় তো নয়ই। সাপ বিছে— কত কী থাকতে পারে। সময়টাও বর্ষাকাল।
“লাঠি নেই? একটা লাঠি? …স্টিক বা বাঁশ—!”
“খুঁজে আনতে হবে। লাঠি খুঁজে আনতে আনতে বাগান শেষ। ইস্—কী কাণ্ড করছে গোরুটা!”
“ইট পাটকেলওতো পাচ্ছি না।…এই হ্যাট হ্যাট, যাঃ— ভাগ !”
