গোরুটা সত্যিই অতি সাহসী ও নির্বিকার। তাড়া খেলেও নড়ে না। নড়লেও অন্য পাশে সরে যায়।
মেয়েটি বিরক্ত হয়ে বলল, “আপনি গোরু তাড়াতেও ভয় পান! আশ্চর্য বাবা !”
গোরুর সঙ্গে রঙ্গলালের নকল একটা লড়াই চলল খানিকক্ষণ, তারপর দু চার টুকরো আধলা ইট পাওয়া গেল।
তাতেই কাজ হল ; গোরু চলে গেল বাগান ছেড়ে।
রঙ্গলালও নিশ্বাস ফেলল।
“ফটকটা ঠিক করে লাগিয়ে দিন ! কে যে এভাবে ফটক খুলে রেখে আসে।” মেয়েটি বলল।
রঙ্গলাল সকালে চা খেতে গিয়েছিল জানকী কেবিনে। ফেরার সময় সে ফটক বন্ধ করেই এসেছে। তবু কথাটা কানে লাগল। অসন্তুষ্ট হল।
ফটক বন্ধ করে দিয়ে এসে রঙ্গলাল বলল, “আমি নয়।”
“তবে চৈতন্যদা। খানিকটা আগে বাজারে গেল!”
“তবে তাই— !” বলে রঙ্গলাল নিজের বারান্দার দিকে পা বাড়াল।
“এই যে শুনছেন। আমি এ-বাড়ির মেয়ে—।”
দাঁড়িয়ে পড়েছিল রঙ্গলাল। দেখল মেয়েটিকে।
মেয়েটি বলল, “সাত আট দিন ছিলাম না এখানে। বড় মাসির বাড়ি গিরিডি গিয়েছিলাম বিয়েতে। কাল রাত্তিরে ফিরেছি। মার কাছে সব শুনলাম।”
“ও!…আমি এখানে দিন তিনেক হল এসেছি।”
“মা বলল। আপনার নাম রঙ্গ!”
“রঙ্গলাল সেন।”
“ওই একই। রঙ্গ। মা রঙ্গ বলল।”
“তোমার কথা শুনেছিলাম। উনি বলেছিলেন। তোমার নাম?”
“ডাকনাম ডুমুর! ভাল নাম, কৃষ্ণা।”
“ডুমুর! বাব্বা, এমন নাম তো আগে শুনিনি। বেশ নাম তো।”
“রঙ্গও আমি শুনিনি।…তবে নতুন নতুন। আয় রঙ্গ হাটে যাই, দু খিলি পান কিনে খাই ; সেই রঙ্গ!” ডুমুর খিলখিল করে হেসে উঠল।
রঙ্গলাল ডুমুরকে দেখল। রোগা ছিপছিপে গড়ন, গায়ের রং শ্যামলাও বলা যাবে না, তার চেয়েও ময়লা। মুখটি একেবারে ঝুরঝুরে। কাটাকাটা। বড় বড় দুটি চোখ। চকচক করছে। নাক একেবারে বাঁশির মতন। ধবধবে দাঁত। এক মাথা চুল, গালে আঁচিল।
ডুমুরের পরনে ছিল ছাপা শাড়ি। হালকা নীল জমির ওপর সাদা হলুদ ফুল-নকশা।
রঙ্গলালের মনে হল, ডুমুরের বয়েস বেশি নয়, হয়তো উনিশ কুড়ি, কি একুশ।
“আচ্ছা, আমি যাই, দেরি হয়ে যাচ্ছে…” রঙ্গলাল আবার পা বাড়াল।
ডুমুর হাসতে হাসতে বলল, “চৈতন্যদা বাড়িতে থাকলে আপনাকে গোরু তাড়াতে ডাকতাম না। ওই গোরুটা ভীষণ শয়তান, পাটনাইয়া, কিছু পরোয়া করে না, নয়ত আমি তাড়িয়ে দিতাম। আমার বড় ভয় করছিল বলে আপনাকে ডাকলাম। তবে কলকাতার লোকরা গোরুছাগল তাড়াতে পারে না দেখলাম।”
ঘাড় ঘুরিয়ে রঙ্গলাল বলল, “আমি তো গোরুছাগল তাড়াবার বাগাল নই।”
“এমা! ছিঃ!” ডুমুর যেন লজ্জা পেয়ে লম্বা করে জিব বার করে দিল।
রঙ্গলাল আর দাঁড়াল না।
দুই
অফিসে দুপুরবেলায় সিধুবাবুর সঙ্গে দেখা রঙ্গলালের। সিধুবাবু বয়েসে বড়। বছর চল্লিশের ওপর বয়েস। ছোকরারা সবাই তাকে সিধুদা বলে। সিধুবাবু কারখানার খোঁজখবর সেরে দুপুরে অফিসে এসে বসে। অর্ডারের কাগজপত্র দেখে।
রঙ্গলাল বলব কি বলব না করে সকালের ঘটনাটা সিধুবাবুকে বলল। রাগ করে বা অপমান বোধ করেছে বলে নয়, এমনি বলল, গল্পচ্ছলে।
সিধুবাবু হেসে বলল, “আরে রাম রাম। আপনি কিছু মনে করবেন না। ডুমুরটা খেপি!।”
“খেপি! মানে খেপা?”
“সেরকম নয়, সেরকম নয়। ওই ওর ধাত। মাথায় ছিট আছে। মেয়ে কিন্তু বড় ভাল। আপনি দেখবেন।”
“তা না হয় বুঝলাম। তবে কথা কী জানেন সিধুবাবু, গোরু তাড়াবার শর্তে একুনে দুশো টাকা দিয়ে আমি ঘরভাড়া নিইনি।”
“ছি ছি, এ কী বলছেন। ছেলেমানুষের কাণ্ড, মাপ করে দেবেন। …আমি বরং একবার গিয়ে বড়দির সঙ্গে দেখা করব। বলব।”
“আরে না না, মশাই! পাগল নাকি আপনি! আমি এমনি বলেছি আপনাকে—কিছু মনে করে বলিনি। ভদ্রমহিলাকে বলতে হবে না।”
সিধুবাবু সামান্য চুপ করে থেকে বলল, “আসলে কী জানেন সেনবাবু, জামাইবাবুর জন্যে ফ্যামিলিটা কেমন ছত্রখান হয়ে গেল। বড়দি আমার নিজের কেউ নয়। ডাকি বড়দি বলে বরাবর। সেই সূত্রে বড়দির স্বামী জামাইবাবু। জামাইবাবু বিচিত্র লোক। এই সেইবার পূর্ণ কুম্ভের মেলায় গিয়ে আর ফিরলেন না। কী হল কী হল করে আমরা যখন উদ্ব্যস্ত, নানান দুশ্চিন্তা, তখন জামাইবাবুর চিঠি এল, তিনি সাধু সন্ন্যাসী হয়ে কুলুমুখীতে যোগীরাজবাবার আশ্রমে বসে পড়েছেন। সাধনভজন করছেন। আর ফিরে আসবেন না সংসারে।”
“সে কী! উনি আর আসেননি?”
“দু বছর আগে একবার এসেছিলেন। চলে গেছেন আবার। তবে চিঠিপত্র ন’মাসে ছ’মাসে দেন।”
“অদ্ভুত মানুষ তো!”
“ডুমুর মেয়েটা তখন থেকে কেমন হয়ে গেছে। খেপি!”।
রঙ্গলাল সামান্য চুপ করে থেকে বলল, “আপনাকে কিছু বলতে হবে না সিধুবাবু। আমি কোনও কমপ্লেন করছি না। বরং, সত্যি বলতে কী— মজাই পেয়েছি। হাজার হোক মেয়েটি ছেলেমানুষ। কত বয়েস হবে?”
“একুশ টেকুশ।”
“সেই রকমই মনে হয়েছিল।….ঠিক আছে, আমি এখন দু-একটা কাজ নিয়ে বসি, পরে কথা হবে।”
সিধুবাবু উঠে গেল।
পরের দিন গোরু এল না। তার পরের দিন আবার একই কাণ্ড। সেই সকালে। এবার একটা নয়, চার পাঁচটা ছাগল ঢুকে পড়েছিল বাগান।
যথারীতি চৈতন্য গরহাজির। রঙ্গলালের ডাক পড়ল। “ও রঙ্গবাবু, শিগগির। ছাগল ঢুকেছে। চার পাঁচটা।”
রঙ্গলাল মাঠে নামল। দুটো বড় ছাগল, তিনটে ছোট। মনে হল, সপরিবারে প্রবেশ। মনের সুখে ফুলগাছ খাচ্ছে। জবাগাছের নীচের দিকের পাতাগুলো শেষ। ছোটগুলো বেলঝাড়ের পাতা চিবোচ্ছে।
