কেদার নিরীহের মত মুখ করে বলল, “আমার জন্য আপনাদের বড় কষ্ট হল।”
“আর ন্যাকামি করো না, তোমায় আমি খুব চিনেছি।”
কেদার অধোমুখে দাঁড়িয়ে থাকল।
নানুর ভগিনীপতি ইয়ার-দোস্ত টাইপের লোক; হোটেলের খাবার ঘরে কলাপাতা পেতে খুরি গেলাস সাজিয়ে সকলকে খাইয়ে দিলেন।
সব পাট চুকে গেলে মুরারি বিদায় নেবার সময় দেখল, ঝিরঝির করে বৃষ্টি নেমেছে।
কেদার সিগারেট ফুকতে যুঁকতে বলল, “বৃষ্টি নেমে গেল যে রে?”
“তাতে আর তোর কি? তুই তো এখন ফুলশয্যা করবি।”
“দূর শালা, আবার ফুলশয্যে কি? সে সব কবে হয়ে গেছে।”
মুরারি চোখ টিপে বলল, “এই হোটেলে?”
কেদার হাসতে হাসতে বলল, “হোটেল কি রে—এ আমার শ্বশুরবাড়ি, এখানে আমার স্পেশ্যাল ঘর আছে, তক্তপোশ, বিছানা আর একটা আলনা পর্যন্ত—”
মরারি বলল, “সত্যি, তুই একটা জিনিয়স!”
বিয়ের পর মুরারির সঙ্গে কেদারের একবার দেখা হয়েছিল, তারপর আর পাত্তা নেই। মানসীর সঙ্গেও মুরারির দেখা হয় না। একদিন কয়লাঘাটায় গিয়ে খোঁজও করেছিল মুরারি, শুনল—মানসী ছুটি নিয়েছে।
মাস কয়েক পরে আবার এক শীত ফুরিয়ে আসার সময় মুরারি বাড়ি ফিরতেই তার মা বললেন, “ওরে, কেদার এসেছিল।”
“কেদার? কখন?”
“অনেকটা বেলায়, তুই অফিস চলে যাবার অনেক পরে।”
“কী বলল?”
“ও যে কী বলল আমি বুঝতে পারলাম না। ঠাকুরঘরে ছিলাম, বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী-যে বলে গেল হাউমাউ করে, আমার মাথায় ঢুকল না। কিসের একটা কথা তোকে বলতে বলল, আট পাউন্ড করে।”
“আট পাউন্ড?”
“তাই তো বলল।”
হাসতে হাসতে মুরারি ঘরের দিকে পালাল। বেদম হাসি পাচ্ছিল তার। কেদারের বাচ্চা হয়েছে নিশ্চয়। সাবাস কেদার, তুই দেখালি বাবা। কিন্তু, ছেলে না মেয়ে? কেদার কিছু বলে যায়নি। হে ভগবান, ওর যাতে ছেলে না হয়—ছেলে হলেই তো আর একটা কেদার। জ্বালিয়ে মারবে। তার চেয়ে ও শালার মেয়ে হোক, ঠেলাটা বুঝতে পারবে।
রঙ্গলাল
সকালটি বেশ চমৎকার লাগছিল রঙ্গলালের।
সবেই ভাদ্রমাস পড়ল, তাতেই শরৎ-শরৎ ভাবটি ফুটে উঠেছে। ঝকঝকে রোদ, নীলে-সাদায় মেশামেশি আকাশ। সামনের মাঠে অজস্র ঘাস গজিয়েছে বর্ষায়। ওরই এ পাশ ও পাশে মামুলি দু চারটে ফুল গাছ, করবী ঝোপ, কলকে ফুল ; তফাতে এই শিউলি।
জানকী কেবিন থেকে এই মাত্র চা খেয়ে ফিরেছে রঙ্গলাল।
চা আর গরম কুচো নিমকি। খাসা! শেষ সিগারেটটাও। এইবার দাড়ি কামাতে বসবে।
ঘরের মধ্যে বসে দাড়ি কামাতে ইচ্ছে করছিল না। এখনও ঘরের মধ্যে তেমন করে আলো আসেনি। মানে পশ্চিম আর উত্তরমুখো জানলা হওয়ায়, রোদ ঢোকেনি ঘরে, সকালের আলোও ঝাপসা। বেলা বাড়লে অবশ্য এমন থাকবে না।
নিজের মনে ‘কাম সেপ্টেম্বর’-এর শিস দিতে দিতে রঙ্গলাল একটা পুরনো টুল জুটিয়ে নিল। নিয়ে বারান্দায় এনে রাখল। ঢাকা বারান্দা। সামনে মাঠ। বারান্দার এ-পাশটা তার, মানে একটা শোবার ঘর, আর এই বারান্দাটুকু। স্নানটানের ব্যবস্থা ওপাশে। কুয়াতলার দিকে। বারান্দার সিকি ভাগ তার, বাকিটা বাড়িউলির। পুরনো কাঠের কয়েকটা ভাঙা ফাটা তক্তা আর হাত দুই আড়াই চওড়া এক জাফরি উঠিয়ে বারান্দাটিকে দু-ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ভাগাভাগিটা পলকা, মাথায় তেমন উঁচুও নয়।
টুলের ওপর আয়না রেখে রঙ্গলাল তার দাড়ি কামাবার উপকণগুলো নিয়ে এসে সাজিয়ে বসল।
এখন প্রায় আট। দাড়ি কামাতে কামাতে সোয়া আট। তারপর স্নানাদি। সেজেগুজে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়বে কালাচাঁদের হোটেলে। খাওয়া-দাওয়া সেরে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে একটা শেয়ারের সাইকেল রিকশা ধরবে। অফিস পৌঁছতে পৌছতে দশ সোয়া দশ।
কলকাতার ছেলে রঙ্গলাল। নারকেলডাঙায় বাড়ি। গত সাত আট বছর সে কলকাতার হেড অফিসেই ছিল। দিব্যি ছিল। বন্ধুবান্ধব আচ্ছা, সিনেমা থিয়েটার, অফিসের অঞ্জলি, পাড়ার হোমসায়েন্সের রীতা দিদিমণি— একটু শখ শৌখিনতার বান্ধবীদের নিয়ে মনের সুখেই ছিল। শালা ঘোষালসাহেব, উইদাউট এনি ওয়ার্নিং তাকে দুম করে বদলি করে দিল। বলল, ‘সেন, তোমাকে ছাড়া কাউকে ভাবতে পারছি না ইউ নো দ্য জব ভেরি ওয়েল। মাই বেস্ট চয়েস। নপাহাড়িতে আমাদের যে ইউনিট সেখানে তোমাকে পাঠাচ্ছি। ইউনিটটা ছোট, কিন্তু পোটেনশিয়ালিটি প্রচুর। কারখানাটাকে আমরা শিঘ্রি এক্সটেন্ড করব। ওখানের অফিস আর স্টোরে নানা ধরনের ম্যালপ্র্যাকটিস শুরু হয়েছে। তুমি হবে সিনিয়ার অ্যাসিসটেন্ট অফিস আর স্টোরের। তোমায় আমরা লিফট দিচ্ছি। দুটো বেশি ইনক্রিমেন্ট, প্লাস একটা অ্যালাওয়েন্স। উইশ ইউ লাক। আসছে মাসেই চলে যাও।’
রঙ্গলাল বারেন্দ্রি না হলেও বদ্যি। আসলে তো সেনগুপ্ত। সেন বলেই চালায়। সে বুঝতে পারল, ঘোষালসাহেবের সঙ্গে বদ রসিকতা করার ফল এটা। মাত্র কদিন আগে সে এসপ্ল্যানেড পাড়ায় ইভনিং শো শেষ করে, চা-টা খেয়ে সামান্য রাত করই মিনিবাসে বাড়ি ফিরছিল। এমনই কপাল তার সেই মিনিবাসে ঘোষাল ছিল। কোনও মক্কেলের পয়সায় পান-ভোজন বেশিই করে ফেলেছে। ফলে মাতলামির মাত্রাটাও বেশি। ব্যাটা একটা ট্যাক্সি করে চলে গেলেই পারত। তা না করে ভুল মিনিবাসে চেপে মাতলামি শুরু করল। কলকাতার নাইট মিনিবাসগুলো মাতাল-মিনি। তা সে যাই হোক, ঘোষালের মাতলামিতে চটে গিয়ে প্যাসেঞ্জাররা তাকে নামিয়ে দিতে বলছিল কন্ডাক্টাবকে। এই নিয়ে যখন বচসা চরম, তখন পিছনের সিট থেকে রঙ্গলাল বদরকম গলা করে আওয়াজ মারল, ‘ব্যাটাকে কান ধরে নামিয়ে দাও!’…জাত মাতালরা বড় চালাক হয়। ঘোষাল পাদানি থেকে প্রায় পড়তে পড়তে লাফিয়ে উঠল, “কে ব্যা-টা বলল। কে বলল! হোয়ার ইজ দ্যাট ব্লাডি ফাদার! কাম অন। কাম অন রাস্কেল। চলে আয়, আমি মদ খেয়েছি— তোর কী! তুম কোন হো বোলনেওয়ালে।’
