মুরারি হেসে ফেলল।
চা সিগারেট খেতে খেতে মুরারী মানসীর মার আগমন থেকে প্রস্থান পর্যন্ত সব বিবরণ শোনাল। কেদার কিছু কিছু আগেই মানসীর চিঠিতে জেনেছে। তাকে বেশ উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল।
মুরারি শেষে বলল, “তুই না ওয়ার্ড অফ অনার দিয়েছিলি?”
“কিসের?”
“কিসের? শালা ন্যাকা সাজছিস?”
“ফর গডস্ সেক্, আমি কিন্তু ব্যাপারটা লিক আউট করিনি?”
“কে করেছে?”
“বোধ হয় মানসীর মাসির বাড়ি যাওয়া থেকেই সাম্ হাউ ওরা আন্দাজ করতে পেরেছিল। মানসী মাইরি এত মাসি-মাসি করত! তখনই বলেছিলাম, বেণী মাসির কান কেটেছিল, এই মাসিও তোমায় ডোবাবে…।”
“মানসী মাসির বাড়ি যেত না।”
“যেত না?”
“আবার শালা ন্যাকামি? তুই ওকে টেনে নিয়ে যেতিস!”
একটু চুপ করে কেদার একগাল হেসে বলল, “ভেরি ন্যাচারাল। বউকে টানব এর মধ্যে অন্যায় কী?”
“ভেরি ন্যাচারাল! এখন শালা ন্যাচারাল দেখাচ্ছিস! এরকম কথা কিন্তু ছিল না। তোর কনডিশান ছিল…”
“যা যা, কনডিশান রাখ। নিজে তে শালা বিয়ে করিসনি, কনডিশান দেখাচ্ছিস। একবার রাইট এসটাব্লিশড হয়ে গেলে কে কনডিশান মানে রে? প্র্যাকটিক্যাল বুদ্ধি তোর নেই মুরারি, তুই এখনও সাবালক হোসনি।”
মুরারি জোরে জোরে সিগারেট খেল, হাসল মনে মনে। পরে বলল, “তুই মানসীকে নিয়ে কোথায় যেতিস? থাকতিস কোথায়?”
কেদার বলল, “থাকতাম, থাকবার জায়গা কি পাওয়া যায় না? কত হোটেল-ফোটেল আছে?”
“হোটেলে থাকতিস? থাকতিস কি করে? মানসী তো মাথায় সিঁদুর দেয় না?”
“তুই অত এনকোয়ারি করিস না। বলছি ব্যবস্থা হত, ব্যাস।”
মুরারি কি ভেবে হঠাৎ হেসে ফেলে জিজ্ঞেস করল, “তোরা শালা পকেটে করে বিয়ের রেজিস্ট্রির সার্টিফিকেটটা নিয়ে যেতিস নাকি?”
কেদার মুচকি মুচকি হাসতে লাগল, তার হাসির মমোৰ্ধার অসম্ভব।
মুরারি বলল, “যাক গে, তোদের ধর্ম তোরা করেছিস, এখন বিয়ের কী হবে? ঘরবাড়ি কোথায় পাব, ব্যবস্থাই বা কী করা যাবে?”
কেদার খুব নিশ্চিন্তে সিগারেটে টান দিল চোখ বুজে আয়েস করে। ধোঁয়া উড়তে উড়োতে বলল, “ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে। ভাবছিস কেন।”
“কী ব্যবস্থা হবে সেটাই জানতে চাইছি।”
বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা দেখাল না কেদার, বলল, “চল না বিকেলে বেরোই, খোঁজাখুঁজি করলে একটা বেরিয়ে যাবে।”
ছুটির পর রাস্তায় নেমে কেদার বলল, “তোর নানুকে মনে আছে?”
“কে নানু?”
“আমাদের সঙ্গে বঙ্গবাসীতে পড়ত, লম্বা মতন দেখতে, মুখে বসন্তের দাগ।”
“ঠিক মনে পড়ছে না, মুখ দেখলে চিনতে পারব। নানুর কথা আসছে কেন হঠাৎ?”
“না, মানে—নানুর সঙ্গে একদিন দেখা হয়ে গিয়েছিল। নানুর ভগিনীপতি শিয়ালদার দিকে নতুন একটা হোটেল করেছে। সুরি লেনের কাছাকাছি। নানু সেখানে প্রায়ই থাকে। হোটেলটায় খদ্দের এখনও তেমন জোটে না। নানুর কাছে গেলে একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারে।”
মুরারি স্পষ্ট করে বন্ধুর মুখ দেখল। কেদারের মুখ দেখে সবই বোঝা যায়। মুরারির আর কিছু জানার দরকার হল না। বলল, “হোটেলে বিয়ে করবি?”
কেদার বলল, “তাতে ক্ষতি কি? আসল বিয়ে তো হয়েই গেছে। এটা জাস্ট লোক দেখানো। মানসীদের পাড়া থেকে সুরি লেন পাক্কা আড়াই মাইল দূরে, আমার শাশুড়িমশাই কিছু বলতে পারবেন না। কম খরচে টোপর পরা, গাঁটছড়া বাঁধা হয়ে যাবে।”
মুরারি হাঁ করে কেদারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। কেদার যে এত বুদ্ধি ধরে জানা ছিল না মুরারির। বলল, “তোর শাশুড়ি তোকে হারামজাদা বলে, ঠিকই বলে ; বুঝলি, তুই শালা সেন্ট পার্সেন্ট হারামজাদা।”
কেদার কথাটায় কান দিল না। হাসতে লাগল। হাসতে হাসতে বলল, “আমার শাশড়িমশাইকে বলবি, এটা ভাদ্র মাস, অরক্ষণীয়া কন্যার ভাদ্র মাসে বিয়ে হয়।”
চার
নানুর ভগিনীপতির হোটেলের দোতলার দুই ঘর বরপক্ষ আর কনেপক্ষ ভাগ করে নিল। তেতলার চিলেকোঠার পাশে ছাদনাতলা হল। মুরারির অফিসের রতন হল পুরুত। কেদারকে টোপর পরিয়ে দোতলা থেকে তিনতলায় হাজির করানো হল, মানসীকে কনের সাজ পরিয়ে তেতলায় তুলে আনল প্রণব। মানসীর মা দোতলায় থাকলেন, মাকে নাকি মেয়ের বিয়ে চোখে দেখতে নেই।
রতন তার বাবার পুঁথি আর পাঁজি খুলে খুলে বিয়ের মন্ত্র পড়িয়ে দিল। বামুনের ছেলে হলেও সংস্কৃত ভাষাটা তার মুখে আসে না। যতবার হোঁচট খায়, ততবার একবার করে শালা বলে। মধু বলল, “রতন, তুই কার বিয়ে দিচ্ছিস, তোর শালার নাকি?” হাসাহাসি, পুরুষালী গলায় উলুধ্বনি, মালা বদল, সিঁদুর পরা শেষ করে বিয়ের পর্ব চুকে গেল। আবার দোতলায়। মানসীর মা সামান্য মেয়েলী কাজ সারলেন। কনেপক্ষের একুনে জনা দশেক মাত্র এসেছিল। মানসীর বাবা আসেননি।
কেদার তার শাশুড়িকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়াতেই শাশুড়ি বললেন, “এবার বাছা তুমি তোমার বউ নিয়ে যেখানে খুশি যাও, আমার কর্তব্য শেষ হয়েছে।” বলে তিনি কেদারের মাথায় হাত রাখলেন একটু।
কেদার বলল, “আজ্ঞে, আমি ভাবছিলাম, আপনার মেয়ে এখন কলকাতাতেই থাক, আসানসোলে বাড়িটাড়ি খোঁজ করতে দেরি হবে। পরে না হয় নিয়ে যাব।”
মানসীর মা বললেন, “মেয়ে এখন তোমার কাছেই থাকবে। আসানসোলে বাড়ি যতদিন না পাচ্ছ, ওকে চুঁচড়োয় ওর মাসির বাড়িতে রেখে দিও। আমরা অন্য পাড়ায় বাড়ি দেখছি, বাড়ি পাই, তখন একবার মেয়েকে নিয়ে তোমার শ্বশুরমশাইকে প্রণাম করতে এস।”
