“রাখো—রাখো,” মানসীর মা মুখ বেঁকিয়ে বললেন, “দেখাশোনা কম আবার হয় কোথায়! এত বড় বজ্জাত কালকেউটে মেয়ে আমার, আজ ক’মাস ধরেই দেখছিলাম তার হঠাৎ মাসির ওপর দরদ বেড়ে গেছে। ছুটিছাটায় মাসির বাড়ি চুঁচড়ো যাচ্ছি বলে বাড়ি থেকে চলে যেত। তারপর দেখি ফি শনিবার। প্রথমটায় তো বুঝিনি বাবা, সন্দেহও করিনি। ভাবতাম আমার বোনটা বড় একটেরে আছে, যাচ্ছে যাক, আমার বোনঝি রয়েছে, মেয়েরই সমবয়সী। দুজনে বেশ ভাবসাব, ছুটিছাটায় বেড়িয়ে আসুক। পরে ফি শনিবার মাসির বাড়ি রায়না জুড়তেই সন্দেহ হতে লাগল। যেতে না দিলে অশান্তি করত। তা ছাড়া মেয়ের আমার চালচলন ভাল, বাপ মা’র ওপর ভয় ভক্তি রয়েছে, কি করে বুঝব, ভেতরে ভেতরে এত ছিল। ছি ছি, শুনে পর্যন্ত গলায় দড়ি দিতে ইচ্ছে করছে।”
মুরারি কৌতূহল বোধ করে বলল, “মাসির বাড়ি ও যেত না?”
“কোথায় যেত। বুড়ি ছুঁয়ে রাখার জন্যে দু-একবার গিয়েছে, তাও বড় একটা রাত কাটাত না। আমার বোনের কাছে খোঁজ করতেই সব ধরা পড়ে গেল।”
“আপনার নিজের বোন?”
“না না, জ্যাঠতুতো বোন, দেখাশোনা বছরে এক-আধবার।”
মুরারির শিস দিয়ে উঠতে ইচ্ছে করল। শালা কেদার, র্যাটকিলার খুব খেলা দেখিয়েছ। মানসীও তো আচ্ছা, অমন শান্ত, লাজুক, নরম-নরম দেখতে, তার ভেতর ভেতর এত বুদ্ধি! না ; মেয়েদের ওপর দেখে ভেতর বোঝা যায় না।
মুরারি আর পারল না, উঠে গিয়ে এক গ্লাস জল খেয়ে এল।
মানসীর মা বললেন, “এবার বলো, আমি কী করি?”
মুরারি ঘাড় চুলকোতে লাগল। “আমি কী বলব?”
“কেন বাপু, গেরস্থ বাড়ির সর্বনাশ করার সময় বন্ধুর কানে মন্ত্র দিতে পেরেছিলে, আর এখন বলছ আমি কী বলব?”
ঠোক্করটা হজম করে নিল মুরারি, বলল, “আপনি কী করতে চান?”
“আমার তো ইচ্ছে করে বঁটি দিয়ে মেয়েটার গলা কুপিয়ে দি। আর তোমার বন্ধু, সে জোচ্চোরটাকে হাতের কাছে পেলে তার শয়তানি আমি ভাঙতাম।…কিন্তু আমরা তো বুড়ো-বুড়ি হয়ে গিয়েছি। বাড়ির কর্তা সারাটা জীবন আহ্নিক জপতপ করে আর স্কুলে গাধা পিটিয়ে কাটালেন। বাড়িতে আরো তিনটে পোয্য। আমাদের সঙ্গতি কতটুকু, সামর্থ্যই বা কি! মেয়েটারও তো মুখ দেখাতে হবে। সমাজের লোকলজ্জাও বাঁচাতে হবে। আমি বড় দায়ে পড়ে এসেছি। বলো কী করি?”
মুরারির বাস্তবিকই এবার দুঃখ হচ্ছিল। কেদার বোধ হয় এভাবে বিয়ে করে ভাল করেনি। শালা একেবারে উল্লুক, হারামজাদা। মানসীও বা কেমন! রিফিউজ করলে পারত। র্যাটকিলারের প্যাকেট দেখে ভিরমি খেয়ে গেল। প্রেম-ফ্রেম এই জন্যেই এত বাজে।
মুরারি মাথা চুলকে বলল, “আমার তো মনে হচ্ছে, কেদারকে আপনি বাড়িতে ডেকে নিন, না হয় মেয়েকে আসানসোলে পাঠিয়ে দিন।”
“কি কথাই বললে—”, মানসীর মা নাক কুঁচকে বললেন, “—পাড়ায় এমনিতেই কানাঘুষো শুরু হয়েছে, লোকলজ্জায় মরছি, তার ওপর তোমার কেদারকে বাড়িতে এনে বসাই। ও-সব হয় না, আমাদের লোকলৌকিকতা আছে, সমাজ আছে। ওভাবে ফিরিঙ্গি বিয়ে আমাদের হয় না। ওদের আবার বিয়ে করতে হবে, আমাদের চোদ্দ পুরুষে যেমন হয়েছে, সেইভাবে।”
মুরারি চোখ তুলে বলল, “মানে, আপনি বলছেন, আবার টোপর মাথায় দিয়ে কেদারকে বিয়ে করতে যেতে হবে?”
“হ্যাঁ, আমাদের যেমনটি চলেছে এতকাল সেইভাবে।”
“কেদার কি রাজি হবে?”
“না হলে ওর বউ ও পাবে না। তুমি তোমার বন্ধুকে বলে দিও জেদ আমারও আছে?”
মুরারি আর কথা না বাড়িয়ে বলল, “কেদারের সঙ্গে আমার অনেকদিন দেখা হয়নি, তা সে ব্যবস্থা আমি করে নেব। ও যদি রাজি থাকে আপনাকে জানাব।”
“রাজি তাকে হতেই হবে। তুমি ওকে রাজি করাবে। ওকে বলো, মানসীর বাবাকে নয়ত আমি বাঁচিয়ে রাখতে পারব না। ”
মুরারি সামান্য চুপচাপ থেকে বলল, “বেশ, আমি চেষ্টা নিশ্চয় করব। মানসীরও কি তাই ইচ্ছে?”
“তোমার সঙ্গে তো চেনাশোনা আছে। জিজ্ঞেস করে দেখো?”
বোঝা গেল মানসীরও ওই মত।
মানসীর মা শেষ পর্যন্ত উঠলেন। বললেন, “আমাদের ঘরবাড়িতে, পাড়ায় বিয়ের ব্যবস্থা হবে না। অন্য কোথাও ছোট একটু জায়গায় ব্যবস্থা করো। আমাদের ক্ষমতা নেই, সামর্থ্য নেই। সেই বুঝে যা করার করো। আমি আজ চললাম। আবার আসব, কবে আসব মেয়ের মুখে জানিয়ে দিও।”
মানসীর মাকে রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে মুরারি আর অফিসে ফিরল না। মানসীর খোঁজ করতে তার অফিসে চলে গেল।
তিন
পরের শনিবারই নাচতে নাচতে কেদার এল মুরারির অফিসে। ফিটফাট চেহারা মুখ ভরতি হাসি। কেদারকে দেখে মুরারির গা জ্বলে গেল, প্রথম দর্শনেই মুরারি খেপে গিয়ে যাচ্ছেতাই গালাগাল দিল।
কেদার হাসতেই লাগল। “অত রাগ করছিস কেন মাইরি, নে নে সিগারেট খা, চা আনতে বল। বন্ধু লোককে এরকম করতে হয়! তোর কাছে আসতে পারি না, বাট আই অলঅয়েজ রিমেমবার ইউ। তুই একটা জুয়েল, এ ফ্রেন্ড ইনডিড।”
“চুপ কর শালা, আমি তোকে বিলক্ষণ চিনেছি। আমার কাছে এসেছিস কেন?”
“বাঃ বাঃ, মানসী আমায় আর্জেন্ট চিঠি লিখল, তোর সঙ্গে এসে দেখা করতে, তুই বলেছিস মানসীকে।”
“সঙ্গে সঙ্গে তুই আসানসোল থেকে চলে এলি?”
“এলাম, আজ শনিবার।”
“মানসী তোকে আর কিছু লেখেনি?”
“লিখেছে। মানে শুনলুম, তোর কাছে শাশুড়িমশাই এসেছিলেন…এই সব আর কি ।
“শাশুড়িমশাই?”
“আমার শাশুড়িকে মশাই বলাই কি ভাল নয়?”
