মুরারি রীতিমত ভয় পেয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তাদের কাছাকাছি কেউ না থাকলেও তফাতে দু-একজন আছে ; আসছে যাচ্ছে কেউ কেউ। মানসীর মা’র এই গার্হস্থ্য-ভাষণ কারুর কানে গেলে কেচ্ছা হয়ে যাবে।
মুরারি অবস্থাটা সামলাবার চেষ্টা করে বলল, “আপনি অনর্থক আমার উপর রাগ করছেন। আমি কিছু করিনি। বরং ব্যাপারটা যদি বলতেন—”
মানসীর মা বসে বসে হাঁপাতে লাগলেন। মোটা চেহারা, ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এই রাইটার্স পর্যন্ত ধাওয়া করতে পেরেছেন এতেই তো তাঁর দম ফুরিয়ে যাওয়া উচিত ছিল, তার ওপর এই উত্তেজনা ক্রোধ, ওপর নিচ, মহিলার এখন হার্ট অ্যাটাকও হয়ে যাওয়া বিচিত্র নয়।
বসে বসে খানিকটা জিরিয়ে নিয়ে মানসীর মা বললেন, “ব্যাপার আমি কী বলবো? তুমি বলবে।”
“আমি?”
“দেখ বাপু, মিচকিমি করো না। তুমি যাও ডালে ডালে, আমি যাই পাতায় পাতায়। সব আমি খোঁজ পেয়েছি। জানো, তোমায় আমি পুলিশে দিতে পারি?”
ঘাবড়ে গিয়ে মুরারি বলল, “আমায় পুলিশে দেবেন! আমার অপরাধ?”
“তুমি আমার মেয়েকে দিয়ে এই অধর্ম করিয়েছ।”
“আমি?…কী মুশকিল, আপনি ফরনাথিং আমার কাছে এসে ঝামেলা করছেন, আমি আপনাকে বারবার বলছি, আমি কিছু করিনি…।”
“করোনি?”
“না।”
“কেদার কে?”
“আমার নাম কেদার নয়, মুরারি।”
“জানি বাছা, জানি। তোমার নাম ঠিকানা না জেনে কি তোমার অফিসে খোঁজ করতে এসেছি? আমায় অত মুখ্য ভেবেছ?”
মুরারি এতক্ষণে একটু হাঁফ ছাড়ল। যাক্ বাবা, কেদারের নামটা শোনা গেল। এতক্ষণ শালা মনে হচ্ছিল, মুরারি যেন মেয়ে ভাগিয়ে নেবার অপরাধ করেছে।
মুরারি বলল, “কেদার আমার বন্ধু।”
“তোমার প্রাণের ইয়ার। সে হারামজাদা এখানে থাকে না। আসানসোলে থাকে, রেলের চাকরি করে।”
মুরারি চমৎকৃত হল। আগাথা ক্রিস্টির চেয়ে কম কি মহিলা!
মানসীর মা বললেন, “ওই হারামজাদা আমার মেয়েকে ভুলিয়ে ভালিয়ে বিয়ে করেছে।”
“বিয়ে করেছে?”
“তুমি কিছু জানো না, না? ন্যাকামি করছ? তুমি হলে পালের গোদা! তোমার সব খবর আমি পেয়েছি। তুমি ওদের কানে মন্ত্র দিয়েছ। দাওনি?”
মুরারি বুঝতে পারল, আত্মরক্ষার চেষ্টা বৃথা, মহিলা সমস্ত খবরই জানেন। কথাটা কে ফাঁস করে দিল বোঝা যাচ্ছে না। মানসী নিজেই দিল নাকি? কেদারের কোনো চিঠিপত্র কি মানসীর মার হাতে পড়েছে? অত কাঁচা কাজ কি করবে কেদার? মুরারি কোনো রকম আঁচ করতে পারল না—খবরটা কেমন করে জানাজানি হয়ে গেল। এই জন্যেই বোধ হয় বলে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।।
নিজেকে বাঁচাবার কোনো উপায় নেই দেখে মুরারি এবার বেপরোয়া ভাবে আক্রমণের পথ নিল। বলল, “আপনার মেয়ে কচি খুকি নয়, কেদারও খোকা নয়, আমার মন্ত্র দেবার তোয়াক্কা তারা করেনি। বিয়ের ব্যাপারটা তারাই ঠিক করেছিল, আমি শুধু রেজিস্ট্রির সময় সাক্ষী ছিলাম।”
“বিয়ে বিয়ে করো না, ওটা বিয়ে নয়।”
“বাঃ বিয়েকে বিয়ে বলবো না? সাবালক ছেলে মেয়ে নিজেরা পছন্দ করে আইনমতে বিয়ে করেছে।”
মানসীর মা চটে উঠে বললেন, “আইনের মুখে আগুন। অমন বিয়ে আমাদের চলে মা।”
মুরারি নিস্পৃহ মুখে বলল, “আপনাদের না চললে আমি কি করব বলুন, আইন আইনই। আপনার আমার করার কিছুই নেই। আপনি না মানলেও আইন তো আপনার মেয়েকে কেদারের স্ত্রী হিসেবেই স্বীকার করবে। চাই কি, কেদারই কোর্ট কাছারি পুলিশ করে তার স্ত্রীকে নিয়ে যেতে পারে আপনাদের কাছ থেকে।”
মানসীর মা কপালে হাত রেখে বসে বসে মুরারির কথা শুনলেন। তাঁর ঠোঁটে পানের রঙ শুকিয়ে খয়েরী হয়ে গিয়েছিল। মস্ত বড় এক নিঃশ্বাস ফেললেন। বললেন, “তোমাকে আর বক্তৃতা করে বোঝাতে হবে না। আমি সবই জেনেছি। তুমি ভদ্রলোকের ছেলে হয়ে আমার এ শত্রুতা কেন করলে?”
মুরারি কথার জবাব দিল না। জবাব কিই বা আছে। কেদার আর মানসীর ওপর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল।
মানসীর মা হঠাৎ বললেন, “তুমি তো নিজে বিয়ে-থা করোনি?”
“না ।”
“তা তুমি বাপু বামুনের ছেলে। বন্ধুর জন্যে দাতা কর্ণ না সেজে নিজেও তো কাজটা করতে পারতে, তবু জাত ধর্ম বাঁচত। যাকগে, মা বাপের দুঃখ বুঝতে পারবে না এখন, পরে বুঝবে, এখন ভাবছ খুব বাহবার কাজ করেছ, ছি ছি।”
মুরারি নীরবে ভৎসনা সহ্য করে নিল। কেদার বেটা যদি শোনে, তার শাশুড়ী মুরারিকে যেচে মেয়ে অফার করতে চেয়েছিলেন বেটা খেপে যাবে।
মানসীর মা চুপ করে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ কেঁদে ফেললেন। শব্দ হল না, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। মুরারি অপ্রস্তুত, তার ভীষণ অস্বস্তি হতে লাগল। ঘাবড়েও গেল বেশ।
শোক সামলে নিয়ে মানসীর মা আঁচলে চোখ মুছলেন। চোখ দুটি লাল হয়ে গিয়েছে। চোখের পাতা মুছতে মুছতে বললেন, “কেলেঙ্কারী যা হবার হয়েই গিয়েছে। লোক জানাজানি হতেও বাকি নেই। পাড়ায় পাঁচজনে সন্দেহ করছে, আত্মীয়-স্বজন জেনে ফেলেছে। মানসীর বাবা স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে নবদ্বীপ চলে গেছেন। এখন বলো আমি কী করি?”
মুরারি এবার খানিকটা সহানুভূতি বোধ করল। বলল, “কি করে লোক জানাজানি হল আমি তো বুঝতে পারছি না। কেদার আসানসোলে থাকে, অ্যাকাউন্টেসি পরীক্ষার পড়া তৈরি করছে। আপনার মেয়ে থাকে কলকাতার বাড়িতে। ওদের মধ্যে কথাই ছিল ব্যাপারটা এখন চাপা রাখবে। দুজনের মধ্যে দেখাশোনাও খুব একটা হয় বলে আমি জানি না।”
