“দক্ষিণেশ্বর? সে কি রে! তুইও কি রামকেষ্ট করতে যাস?”
“না না, যাব একবার। একজনের সঙ্গে দেখা করতে হবে।”
“মানসী?”
“কোথায় মানসী? তোরা আমার চারপাশে ওই মানসী দেখছিস।”
কেদার চলে গেল। আবার যথারীতি তার খোঁজখবর নেই। গরম পড়েছিল সাঙ্ঘাতিক, সেই গরম কেটে বর্ষা নামল। প্রথম বর্ষাও কেটে যাচ্ছে, মানসীর সঙ্গে এর মধ্যে বার কয়েক দেখাও হয়ে গেল মুরারির। মানসীর শরীর সেরে যাচ্ছে, আগের তুলনায় গায়ে মাংস হয়েছে সামান্য, মুখটা ভরাট হয়ে এসেছে, রঙ আরও উজ্জ্বল মনে হয়। ভালই লাগে মানসীকে দেখতে। মুরারির মনে হল, মানসীর শাড়ি-টাড়িও আগের তুলনায় সরেস হয়েছে। দুজনে অল্প কথাবার্তা হয়। মুরারি রসিকতা করে। মানসী লজ্জা পেয়ে কথা এড়িয়ে যায়। মানসীই বলল, কেদার এখন অ্যাকাউন্টেসি পরীক্ষার জন্যে পড়াশোনা করছে, সপ্তাহে সপ্তাহে আসতে পারছে না।
আবার যখন বর্ষা নামল, প্রবল বর্ষা, তখন একদিন মুরারি দেখল, হ্যারিসন রোডের ওপর দিয়ে আধো অন্ধকারের বৃষ্টির মধ্যে রিকশায় চেপে যুগল মূর্তি চলেছে, কেদার আর মানসী। একজন অন্যজনের মুখে বৃষ্টির জল ছিটিয়ে দিচ্ছে।
ডাকব ডাকব করেও মুরারি ডাকতে পারল না। তার একটু হিংসেই হল, কেদার শালা দিব্যি আছে, মহা ফুর্তিতে।
এর কয়েকদিন পরেই মুরারির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।
অফিসে নিজের টেবিলেই ছিল মুরারি, বেয়ারা এসে বলল, এক মহিলা বাইরে বাবুর জন্যে দাঁড়িয়ে আছেন, ভেতরে আসতে চাইছেন না।
মুরারির প্রথমে সন্দেহ হয়েছিল, মানসীই এসেছে হয়ত। বাইরে এসে সে অবাক, বয়স্কা এক মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন।
মুরারি নানা রকম সন্দেহ নিয়ে মহিলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। “আপনি আমাকে খোঁজ করছিলেন?”
মহিলা একদৃষ্টে মুরারিকে দেখলেন কিছুক্ষণ। মুরারিও দেখল মহিলাকে। বেঁটে ধরনের গোল চেহারা, গায়ের রঙ ফরসা, তাঁতের সাদা খোলের শাড়ি, মাথায় কাপড়। চোখ মুখ দেখে মহিলাকে কড়া ধাতের মানুষ বলেই মনে হয়।
উনি বললেন, “ও, তুমিই সেই? আমি মানসীর মা।”
মুরারি চমকে গেল। সর্বনাশ! তার মনে হল, লালবাজার থেকে যেন পুলিশ এসে মুরারিকে ধরে ফেলেছে। শুকনো মুখে মুরারি ঢোঁক গিলল। “আজ্ঞে!” মর্মভেদী দৃষ্টি হানলেন মানসীর মা। “আমার মেয়েকে তুমি চেন না?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ, দেখেছি।”
“দেখেছ? আর কিছু করোনি?”
কথাটা মুরারির কাছে খুব অশ্লীল ঠেকল। বুঝতে আর বাকি থাকছে না যে, শালা কেদার তাকে ফাঁসিয়েছে। মুরারি ঘামতে শুরু করেছিল। বলল, “আপনার মেয়ের সঙ্গে আমার আলাপ-টালাপ আছে।” বলেই মুরারি তার ঘরের দিকে তাকাল, যেন ঘরটা অনেক নিরাপদ। “আপনি ঘরে গিয়ে বসবেন চলুন।”
মানসীর মা মাথা নাড়লেন। “না, আমি এই হট্টগোলের মধ্যে যাব না। লোকজন নেই এমন জায়গায় চলো, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।”
মুরারির রাগ হচ্ছিল, কেদার এসে বলবে, মানসীকে একটু ডেকে দিবি চল, তার শাশুড়ি এসে বলবে, তোমার সঙ্গে কথা আছে ফাঁকায় চলো। ব্যাপারটা কী? মুরারি কি জগৎসুদ্ধু লোকের বেগার খাটবার জন্য বসে আছে! অথচ এসব কথা বলা যায় না, অন্তত এই বয়স্কা মহিলার সামনে।
মুরারি বলল, “ফাঁকা জায়গা অফিসে নেই। তবে ক্যানটিনের দিকে যেতে পারেন, এখন হয়ত ভিড় কম।”
মানসীর মা বললেন, “যা করেছ—কেলেঙ্কারি—সেটা তো আর ঢাক বাজিয়ে বলা যাবে না।”
মুরারি আবার কেমন যেন চমকে গেল। মানসীর মা কী ভাবছেন? তিনি কি ভাবছেন, মুরারিই কিছু করে ফেলেছে? যাঃ বাব্বা, কারবার করছে কেদার, আর মুরারির মাথায় সাইনবোর্ড।
ভয়ে ভয়ে মুরারি বলল, “চলুন দেখি, নিচের ক্যানটিনে জায়গা না পেলে বাইরে যেতে হবে।”
মানসীর মাকে নিচে নিয়ে এসে মুরারি একটা ফাঁকা জায়গা পেয়ে গেল।
মানসীর মা বসলেন।
মুরারি আতিথ্য করে বলল, “একটু চা খাবেন?”
“থাক, যেখানে সেখানে আমরা খাই না। কতরকম ছোঁওয়া ছুঁইয়ি থাকে।”
মুরারি আর অনুরোধ করল না। মানসীর মা মাথার কাপড় সামান্য টেনে নিচু গলায় বললেন, “তোমরা লেখাপড়া শিখেছ, অফিসে চাকরি কর, ভদ্রলোকের ছেলেপুলে, তোমরা গরীব-গেরস্থ বাড়ির এত বড় একটা সর্বনাশ করলে?”
মুরারির আলজিব পর্যন্ত শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। “আজ্ঞে আমি…।”
“তুমি আমার সর্বনাশ করেছ, এত বড় সর্বনাশ মানুষ তার শত্তুরেরও করে না।”
প্রতিবাদ করে মুরারি বলল, “আপনি কী বলছেন? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না !”
মানসীর মা চোখ রাঙিয়ে ধমক দিলেন, “ন্যাকা, তুমি কিছু বুঝতে পারছ না, ভাজা মাছ উল্টে খেতে জান না। শয়তান সব। পরের বাড়ির মেয়েকে ভুলিয়ে ভালিয়ে এনে সর্বনাশ করে এখন ন্যাকা সাজছ!”
মুরারির চোখমুখ তেতে উঠল। মাথা দপ্ দপ্ করতে লাগল। কোনো রকমে নিজেকে সামলাতে সামলাতে সে বলল, “আপনি নিজের খুশিমত যা মুখে আসছে বলে যাচ্ছেন, এগুলো খুবই অপমানজনক। আমি কোনো ভদ্রবাড়ির মেয়ের সর্বনাশ করিনি।
“আমার মেয়ের সর্বনাশ কে করেছে?”
“আমি? কী বলছেন আপনি?”
“করেছে কে? আমি জানতে চাইছি, কে করেছে?”
মুরারি বেফসকা কিছু বলতে গিয়ে একেবারে শেষ মুহূর্তে সামলে নিল। বলল, “আপনার মেয়ের সর্বনাশ কে করেছে তার জবাব আমি দেব? আপনার মেয়েকেই জিজ্ঞেস করলে পারেন।”
“সে হারামজাদী আর এক কেউটে। কি মেয়েই জন্ম দিয়েছিলাম। বংশের মুখে কালি ঢেলে দিলে গো! তার চেয়ে মরল না কেন, বিষ জোটেনি হারামজাদীর?” মানসীর মা রাগের মাথায় হাতের ঝাপটা দিলেন।
