নিচে নেমে এসে মুরারি একটা সিগারেট ধরিয়ে দু-চার টান দিতে না দিতেই দেখল কেদার এসে গেছে।
রাস্তায় এসে মুরারি বলল, “বিয়েটা হবে কবে?”
“দেখি, একটা দিন ঠিক করে নিই। কাল সকালে তোর বাড়ি গিয়ে ফাইন্যাল করে নেব। ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের অফিস তো তোর জানা আছে, সৌমেনের বিয়ে দিয়েছিলি।”
“সৌমেন কেন, অনেকের দিয়েছি, তোদের মতন পার্টি আজকাল অঢেল।”
কেদার হাসতে লাগল।
“কি রে শালা, খুব আহ্লাদ, না?”
“তা তো একটু হবেই, ভাই।”
“কিন্তু, তুই কি বলে র্যাটকিলারের প্যাকেট পকেটে করে নিয়ে এলি? কী চিজ তুই?”
“আরে, ওটা প্রেসার ট্যাক্টিস। প্রেসার না দিলে মেয়েদের দিয়ে কোনো কাজ করানো যায় না।”
“মানসী যদি অরাজি হত কি করতিস?”
“জানি না। মরে যেতাম। ইন্যদি হয় নিজের ফ্যাকট আমি এভাবে ওকে কলকাতায় রেখে দিতে পারছিলাম না। বুঝছিস না, কোনো বাইন্ডিং নেই, হপ্তায় দু হপ্তায় একবার আসি, দেখা হয়, এতে কি আর ভাল লাগে? তা ছাড়া মেয়েদের ব্যাপার, কবে শালা অন্য খাপে ঢুকে যায়, নজর দেবার তো কম নেই।”
“এতে তোর খারাপ লাগছিল। কিন্তু শালা, বিয়ে করেও যখন দেখবি, বউ আর তোতে কোনো ইয়ে নেই, তখন কেমন লাগবে?”
“সে তখন দেখা যাবে। ফিউচার ইজ ফিউচার।…ওসব কথা যেতে দে, শোন—তোর সঙ্গে আমার অনেক দরকার। রেজিস্ট্রির ব্যাপারে একটা ফাইন্যাল করতে হবে। আজ সন্ধেবেলায় তোর সঙ্গে বসলে হত, কিন্তু মানসীর সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে ফেললাম। ছুটির পর অন্নপূর্ণার কাছে দেখা করব। আজ আর হবে না, কাল সকালে তোর বাড়ি যাব। এখন একবার বউবাজারে গিয়ে মামার বাড়িতে একটু ফ্রেশ হয়ে নিই।”
কেদার বউবাজারের ট্রাম ধরল। মুরারি অফিসে ফিরতে ফিরতে নিজের মনেই হাসছিল।
দুই
খুব গোপনেই কেদারের বিয়ে হয়ে গেল। শিয়ালদার দিকে এক ম্যারেজ রেজিস্ট্রি অফিসে সে পর্বটা চুকিয়ে দিল মুরারি। জনা তিনেক সাক্ষী ছাড়া কাউকে আনা হয়নি। সাক্ষীর একজন মুরারি, অন্যজন মুরারির বন্ধু, দিল্লিতে থাকে, কলকাতায় এসেছিল দিদির কাছে। মুরারি তাকে জুটিয়ে এনেছিল, বিয়ের পরের দিনই তার দিল্লি চলে যাবার কথা। তৃতীয়জন মুরারির অফিসের আর এক বন্ধু। বিয়ে হয়ে যাবার পর রেস্টুরেন্টে একটু চা-টা খাওয়া হয়েছিল, তারপর মুরারিরা চলে এল ; কেদার মানসীকে নিয়ে ক্যানিং বেড়াতে চলল।
বিয়ের পর প্রথম প্রথম কেদার কলকাতায় এলে মুরারির অফিস বা বাড়িতে গিয়ে দেখা করত। গল্পটল্প হত। এখন আর কেদার মুরারির অফিসে এসে মানসীর কাছে গিয়ে ডেকে দেবার জন্যে জ্বালাতন করে না। ভেতরে ভেতরে ওদের আগে থেকেই কথাবার্তা ঠিক করা থাকে, সেই মতন দেখা-সাক্ষাৎ হয়।
মুরারি একবার জিজ্ঞেস করেছিল, “মানসীর অফিসে তুই যাস না?”
“না। স্ট্রিক্টলি বারণ করে দিয়েছে।”
“কোথায় যাস তা হলে?”
“সে আছে। কলকাতায় জায়গার অভাব কি?”
“কলকাতায় এলেই দেখা করিস?”
“আলবাৎ। কলকাতায় কি আমি ছোলা ভাজতে আসি? এখন ও আমার বউ না? কত রকম গার্জেনগিরি করে! বেশ লাগে মাইরি, অন্য রকম একটা ফিলিং হয়। তুই এসব বুঝবি না, তোর তো এ লাইন নয়।”
মুরারি হো হো করে হেসে ওঠে। পরে বদমাইশি করে বলে, “তোর বউ এটা তুই বুঝিস কি করে?”
“কেন, বউকে বউ বুঝব না? কি বলছিস তুই?”
“না, মানে, ব্যাপারটা হল—বউ বোঝার একটা আলাদা ব্যাপার আছে, তোদের তো সে রকম করে বোঝার ব্যাপার নেই।”
কেদার হেসে ফেলে। “বলেছিস বেশ, মানসীকে বলব।” বলে চা খেতে খেতে লম্বা করে সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে রহস্যময় হাসি হাসে কেদার, তারপর গানের সুরে বলে, ‘যদি হয় নিজের নারী, তার গড়ন পেটন চিনতে পারি।’
মুরারি হাসতে হাসতে বলল, “খুব সুখেই আছিস তা হলে।”
“ওই আছি।” কেদার আর কিছু বলে না।
কেদারের আসা-যাওয়া ক্রমশই কমতে লাগল। কোনো পাত্তাই আর পাওয়া যেত না। মানসীর সঙ্গে আচমকা অফিসপাড়ায় দেখা হয়ে গেলে মুরারি কেদারের খোঁজ করত।
“র্যাটকিলারের খবর কী?”
মানসী সলজ্জ হাসত। “আপনার সঙ্গে দেখা হয়নি?”
“না, মাসখানেকেরও বেশি তার মুখ দেখিনি।”
“ওমা, আমায় যে বলল, আপনার বাড়ি যাবে!”
“কবে?”
“এই তো এবার যখন এসেছিল,” মানসী দিন তারিখ ভাঙতে চাইল না।
মুরারি ঠাট্টা করে বলল, “এবার মানে কি সেবার? কেমন আছে র্যাটকিলার?”
“এমনি ভালই। হোটেল মেসের খাবার খেয়ে খেয়ে পেট নিয়ে ভোগে।”
“তাই নাকি! বিয়ের পর পেট একটু ভোগায়।” মুরারি আড়চোখে মানসীর দিকে তাকাল।
মানসীর চোখ মুখ হঠাৎ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল।
কথাটা বেফসকা বলে ফেলে মুরারিরই জিব কাটতে ইচ্ছে করছিল। কোনো রকমে সামলে নিয়ে বলল, “কেদার এলে একবার দেখা করতে বলবেন, যদি অবশ্য সময় পায়।”
মানসী মাথা এলিয়ে সায় দিল।
কেদার অবশ্য পরের সপ্তাহে এল। গল্প-গুজব করল। বলল, “ভাই, আমি একেবারে সময় পাই না। শনিবার দিন রাত্রে আসি, রবিবার একটু ঘোরাফেরা করি, আবার সোমবার ভোরের গাড়িতে চাপি। শরীরটাও ভাল যাচ্ছে না।”
“মানসী বলছিল, তোর পেটের গোলমাল হচ্ছে?”
“ইন ফ্যাকট্, সেই রকমই। আসানসোলের জল সহ্য হচ্ছে না।”
“কলকাতার জল নিয়ে যাস্ না?”
কেদার রসিকতাটা বুঝতে পেরে চোখ মটকে হাসল।
খানিকটা বসেই কেদার উঠল। “চলি, একবার দক্ষিণেশ্বর যেতে হবে।”
