“বিষ, না না, বিষ খাবে কেন?”
“খাবে। ও বলছে খাবে। ওর পকেটে বিষ রয়েছে।”
মুরারির মনে হল, তার মাথাটা হঠাৎ বোঁ করে ঘুরে গেল। কী সর্বনাশ, কেদার আবার বিষটিষও পকেটে করে নিয়ে এসেছে নাকি! ঘাবড়ে গিয়ে মুরারি কেদারকে বলল, “তুই পকেটে করে বিষ নিয়ে এসেছিস?”
কেদার আস্তে আস্তে মাথা দোলাল। “ইয়েস, এনেছি।”
“যাঃ, বাজে কথা!”
মানসী বলল, “না না বাজে কথা নয়, পকেটে আছে, আমায় দেখিয়েছে।”
“কী বিষ?” মুরারি কোনো রকমে বলল।
“কী বিষ যেন, আপনি দেখুন না। আমাকে তখন থেকে শাসাচ্ছে।”
মুরারি কেদারকে কিছু বলবার আগেই কেদার তার প্যান্টের পকেট থেকে ছাপ মারা একটা প্লাস্টিকের ছোট প্যাকেট বের করল। হাতের মুঠোয় প্যাকেটটা বার দুই নাচিয়ে বলল, “এটা দারুণ পয়জেনাস, খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে দু’ঘণ্টার মধ্যে ফিনিশ।”
“বলিস কি। পটাসিয়াম সায়নয়েড নাকি?”
“না, পটাসিয়াম সায়নয়েডে ডেথটা বোঝাই যায় না। ওটা পিসফুল ডেথ। আমি কত কষ্ট করে মরেছি, এটা দেখাতে চাই।”
“ওটা তা হলে কী?”
“এটা র্যাটকিলার।”
মুরারি অট্টহাস্য হেসে ফেলেছিল আর কি। সামলে নিল। তার গা ঘিন ঘিন করে উঠল। প্রায় শিউরে উঠে সে বলল, “মাই গড, তুই শেষ পর্যন্ত মানুষ হয়ে ইঁদুরের বিষ খাবি? ছি ছি!”
“ইঁদুরের বিষে যন্ত্রণা বেশি, নাড়িভুড়ি জ্বলে পুড়ে যায়, মিনিটে মিনিটে বমি, ভেরি ডেনজারাস। বীভৎস।”
কেদার বোম্বাই ফিল্মের শয়তানদের মতন দাঁড়িয়ে ট্যারা চোখে আমাদের দেখতে লাগল।
মানসীর হঠাৎ কি যেন হয়ে গেল, মুখ নিচু করে নিল, হাতের আঙুলে চোখের পাতা মুছল। কেদারের হৃদয়হীনতার পরিমাপ করছিল বোধ হয়, কিংবা বিষ খাওয়া কেদারের বীভৎস চেহারাটা কল্পনা করে কেঁদে ফেলছিল। মৃদু, অস্পষ্ট গলায় মানসী বলল, “বেশ, এতই যখন অবিশ্বাস, আমি বিয়ে করব। কিন্তু…”
কেদার অপেক্ষা করতে লাগল, মুরারিও।
একটু সামলে নিয়ে মানসী বলল, “কিন্তু—এ কথা আমরা ছাড়া এখন আর কেউ জানবে না।” বলে মানসী মুরারির দিকে তাকাল। “আপনার সামনে ও বলুক বিয়ের কথা কাউকে জানাবে না।”
কেদার বলল, “আমার জানাতে বয়ে গেছে।”
মানসী এবার মুরারির জামার হাত ধরে একটু টানল, টেনে কয়েক পা তফাতে চলে গেল। মুরারিকেও কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াতে হল। মানসী বলল, “আমার বাড়ির কথা আপনি সব জানেন না। কথাটা একবার যদি কেউ জানতে পারে আমার যে কী অবস্থা হবে, কেউ বুঝতে পারছে না। আপনি আপনার বন্ধুকে একটু বুঝিয়ে বলুন, বিয়ে আমি করছি তবে কাকপক্ষীও যেন এখন কথাটা জানতে না পারে। ও এমন কিছু করতে পারবে না যাতে লোক জানাজানি হয়ে যায়। আপনি একটু বলুন। ওর কাছ থেকে কথা নিয়ে নিন।”
ভেবেচিন্তে মুরারি বলল, “চলুন, ওর কাছে যাই, কথাবার্তা হয়ে যাক।”
মুরারি সরে আসছিল, মানসী হঠাৎ বলল, “শুনুন।”
দাঁড়াল মুরারি।
গায়ের আচলটা অকারণে কোমরের কাছে গুঁজতে গুঁজতে মানসী বলল, “আপনি ওকে ওসব খেতে বারণ করবেন। আমি তো বিয়ে করতে রাজিই হয়ে গেলাম। আপনি ওটা ওর কাছ থেকে নিয়ে নেবেন।”
মুরারি ঠোঁট বন্ধ করে হাসল।
কেদারের কাছে এসে দাঁড়াল দুজনে।
মুরারি বলল, “কেদার, তুমি তোমার জবাব পেয়ে গিয়েছ। এখন মানসীর তরফে কয়েকটা শর্ত আছে। সেগুলোর কী হবে?”
“কী শর্ত শুনি?”
“বিয়েটা একেবারে সিক্রেট রাখতে হবে। কেউ জানবে না।”
“আমি আগেই বলেছি, বিয়ের কথা অন্তত আমার মুখ থেকে কেউ জানতে পারবে না। আই প্রমিস।”
“বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরই যে তুমি ওকে জ্বালাতে শুরু করবে, বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে বলবে—তা হবে না। সেরকম করলে ও বিপদে পড়ে যাবে। ব্যাপারটা এখন একেবারেই গোপন থাকবে ; পরে সময় এবং অবস্থা বুঝে যা করার মানসী করবে।”
“সেটা কতদিন?”
মুরারি মানসীর মুখের দিকে তাকাল। জবাবটা মানসীরই দেবার কথা। মানসী অন্যমনস্কভাবে বলল, “এখনই আমি কি করে বলব কতদিন। বছর দেড়-দুই কি তারও বেশি হতে পারে। ওই জন্যেই আমি বলছিলুম এখন থাক।”
কেদার বলল, “আমিও বলেছি, বিয়ে করেই আমি কাউকে লিগ্যালি ক্লেম করছি না। এক দেড় বছর যদি কারও নিজের বাবা-মাকে সামলাতে লাগে আমি তাতে পরোয়া করি না।”
মুরারি দুজনকে এক পলক দেখে নিল। বলল, “পরোয়া না করলেই হল। তুমি পরে কোনো ঝামেলা করতে পারবে না। ওয়ার্ড অফ অনার।”
কেদার মাথা নেড়ে ওয়ার্ড অফ অনার দিল।
মুরারি মানসীর দিকে তাকাল, জানতে চাইল আর কিছু শর্ত থাকবে কি না।
মানসী মৌন থাকল। মানে তার অন্য কোনো শর্ত নেই।
ঝামেলাটা মিটে যাওয়ায় মুরারি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ঘড়ি দেখল, অফিস থেকে পালিয়ে এসেছে ঘণ্টাখানেক হয়ে গেল। না, আর দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। মুরারি অফিস ফিরে যাবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। “আমি চলি, বড় দেরি হয়ে গেল।”
কেদার বলল, “দু মিনিট দাঁড়া, আমিও যাব। তুই একটু এগো, আমি আসছি।”
মুরারি মানসীকে বলল, “আমি চলি, সেই কখন অফিস থেকে এসেছি।” বলেই তার মনে পড়ল, মানসীর আর-একটা অনুরোধ রাখা হয়নি। কেদারের দিকে তাকিয়ে মুরারি বলল, “ভাল কথা, তোর র্যাটকিলারের প্যাকেটটা আমায় দিয়ে দে।”
কেদার বলল, “রাস্তায় আমি ফেলে দেব তোর সামনে। আচ্ছা তুই এগো, আমি আসছি।”
মুরারি আড়চোখে একবার মানসীকে দেখে নিয়ে প্যাসেজ দিয়ে হাঁটতে লাগল। কেদার আর মানসী কাছাকাছি দাঁড়িয়ে কথা বলছে।
