“হয়েছে কী?” মুরারি জিজ্ঞেস করল।
মানসী বলল, “ওকে জিজ্ঞেস করুন। এমন অবুঝ, যা তা বলছে।”
মুরারি কেদারের দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেল।
“কিরে, কী হল?”
কেদার গম্ভীর মুখে বলল, “হবার কি আছে। আমার যা বলার ফাইন্যাল বলে দিয়েছি।”
মানসী পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল, বলল, “বলে দিলেই সব হয়ে যায়! আচ্ছা, আপনি বলুন, আমাদের সকলকেই বাপ মা ভাইবোন নিয়ে সংসারে বাস করতে হয়। একটা পাগলামী করে ফেললেই হল।”
কেদার গম্ভীর গলায় বলল, “একজনের কাছে যা পাগলামী মনে হচ্ছে, আমার কাছে সেটা লাইফ অ্যান্ড ডেথ…”
“কিন্তু ঝগড়াটা কোথায়,” মুরারি বলল, “কি নিয়ে ফাটাফাটি?”
কেদার সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল না, তার পকেটে হাত ঢুকিয়ে সিগারেট বের করতে লাগল। পকেট থেকে প্যাকেটটা বের করে চোখ না তুলেই বলল, “আস্ক দি আদার পার্টি?”
মানসী মাথা নেড়ে বলল, “না না, যে বলেছে তাকেই জিজ্ঞেস করুন।”
মুরারি বলল, “কেদার, অফিসের মধ্যে হই-হল্লা করে লাভ নেই, সিন ক্রিয়েট হবে। কী হয়েছে?”
কেদার প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠুকতে লাগল। “আমার কাছ থেকে জানতে চাও?”
“হ্যাঁ।”
“বেশ। আমি ওকে বলেছি, এভাবে চলতে পারে না, বিয়ে করতে হবে, রেজিষ্ট্রি ম্যারেজ ; পনেরো দিন টাইম।”
মানসী মুরারির হাত ধরে ফেলে আর কি! বিহ্বল মুখ করে বলল, “আচ্ছা বলুন এই ভাবে বিয়ে করা যায় নাকি! কথা নেই, বার্তা নেই, বিয়ে।”
“কথা নেই, বার্তা নেই মানে—?” কেদার যেন চার্জ করল মানসীকে, “তুমি আমাকে বিয়ে করবে না বলছ? আগে কোনোদিন তুমি একথা বলেছ? বরং তুমি আমায় এই অ্যাসুরেন্স দিয়েছ যে আমাকেই বিয়ে করবে।”
“কী মুশকিল! কী কথার কেমন মানে! আমি যা বলেছি তার থেকে না করছি না!”
“তা হলে কথা নেই, বার্তা নেই—এসব বাজে কথা বলবে না। কথা ছিল, কথা আছে, এখন আমি বিয়ে করতে বলছি,” কেদার গর্জে উঠল।
মানসী আর কথা বলতে পারল না, মানে—তার মাথায় এমন একটা যুক্তির কোনো জবাব আসছিল না।
মুরারি বন্ধুকে বলল, “কিন্তু তুই দুম করে একটা আলটিমেটাম দিচ্ছিস কেন?”
“দিচ্ছি, কারণ আমি আর পারছি না। এনডিওরেন্সের লিমিট ফুরিয়ে গেছে। আমায় একটা ফাইন্যাল করে নিতেই হবে।”
মানসী বলল, “এভাবে ফাইন্যাল হয়? আপনিই বলুন!”
মুরারি বলল, “কেদার, মাথা গরম করে কোনো ডিসিশন নেওয়া যায় না। স্কুল ফাইন্যালের মতন তুচ্ছ জিনিসই কতবার পেছোয়, আর বিয়ের মতন ভাইটাল ব্যাপারে এগিয়ে যাবার আগে ভাল করে ভেবে দেখা দরকার। মানসীর দিক থেকে নানা প্রবলেম থাকতে পারে।”
“ও প্রবলেম প্রবলেমই থাকবে,” কেদার কোনো আমল না দিয়েই বলল, “আমার বাবা খুব গোঁড়া, মা ভীষণ কড়া ; বামুনের মেয়ে কায়স্থ ছেলেকে বিয়ে করছি শুনলে বাবা কুরুক্ষেত্র করবেন—এসব বাজে ফাদার-মাদার প্রবলেম কোনো দিনই যাবে না। ধ্যুত্, ফ্যামিলি আজকাল কোনো প্রবলেম নাকি? সাহস একটু করতেই হবে, যার সাহস নেই সে কেন এতটা এগিয়ে আসে?”
মানসী আমার মুখের দিকে তাকাল। তার সমস্যাটা কেদার যেভাবে দেখছে, অত হাল্কা করে দেখায় সে রীতিমত ক্ষুন্ন। মানসী বলল, “বাঃ, আমাদের সংসারে আর কোনো ঝঞ্ঝাট নেই? বাবা স্কুলে মাস্টারী করে আর মাঝে মাঝে ছেলে পড়ায়। আমার কোনো বড় ভাই নেই, ভাইবোনেরা ছোট। আমার,চাকরিতে কত উপকার হয় সংসারের!”
“চাকরি ছাড়তে বলা হচ্ছে না—” কেদার জনান্তিকে উক্তি করার মতন করে বলল, বলে তার সিগারেট ধরিয়ে নিল।
মুরারি বন্ধুকে বলল, “ও যদি এখানে চাকরি করে আর তুই আসানসোলে থাকিস তা হলে বিয়ের জন্যে এখনই এই চাপ দিচ্ছিস কেন?”
কেদার নিস্পৃহ মুখ করে বলল, “আরে মেয়েদের আমি চিনি। আউট অফ সাইট্, আউট অফ্ মাইন্ড।”
মুরারি হেসে ফেলল।
মানসী ক্ষুব্ধ হয়ে বলল, “আমি কাউকে আউট্ অফ্ মাইন্ড করিনি!”
“তার প্রমাণ আমার কাছে আছে-” কেদার বলল, “যাক, এখন আন্নেসেসারী কথায় কাজ কি, আমি যা বলার বলে দিয়েছি, অ্যান্ড আই ওয়ান্ট মাই অ্যানসার।”
মানসী চুপ। মুরারিও নির্বাক। কেদার আচ্ছা প্যাঁচ কষেছে তো!
মুরারি মানসীকে সাহস দিয়ে বলল, “আপনি না হয় আরও একটু সময় নিন, ভেবেচিন্তে দেখুন।”
কেদার সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁঝিয়ে উঠল, “না, আর সময় নেওয়া চলবে না। আজ, এখনই আমাকে ডিসিশন জানাতে হবে, ইয়েস আর নো।”
মানসীর মুখের রঙ অনেকক্ষণ থেকেই ফ্যাকাসে দেখাচ্ছিল, কেদারের জেদ, গোঁ, গর্জনে তার কেঁদে ফেলার অবস্থা হল। মুরারিরও ভাল লাগছিল না, কেদারটা বড় বাড়াবাড়ি করছে, এরকম গোঁয়ারতুমির কোনো মানে হয় না।
মানসী চুপ করে দাঁড়িয়ে, আর মুখ তুলছে না। হয়ত অভিমান কিংবা দুঃখ সামলে নেবার চেষ্টা করছিল।
মুরারি বলল, “কেদার, তুই বড় বাড়াবাড়ি করছিস। একটু সেনসেবল হবার চেষ্টা কর।”
কেদার বলল, “আমি সেনসেবল, আমায় বলে লাভ নেই। আমি যা ডিসাইড করেছি তার থেকে এক পাও সরব না। কাউকে কোনো জোর করার প্রশ্ন এখানে নেই। ওর যদি আপত্তি থাকে ও আমায় স্পষ্ট বলে দিক, আমি আমার ব্যবস্থা করে নেব।”
মানসী মুখ তুলে বলল, “ব্যবস্থা করে নেবে মানে তুমি বিষ খাবে?”
“খাব।”
মুরারি অবাক হয়ে কেদারের দিকে তাকাল। “বিষ খাবি?”
মানসী ততক্ষণে সত্যি সত্যিই মুরারির হাত ধরে ফেলেছে, মুখ পাংশু। গাঢ়, কান্না-কান্না গলায় বলল, “জানেন, ও তখন থেকে বলছে, আমি বিয়ে করতে রাজি না হলে বিষ খাবে!”
