কেদার এবার হাত বাড়িয়ে মুরারির কব্জি ধরে ফেলল। করুণ মুখ করে বলল, “এই শেষ বার, দিস ইজ্ দি লাস্ট্ টাইম ; মাইরি, আমি প্রমিস করছি, আর তোকে বলব না, আই উইল্ অ্যারেঞ্জ মাই ওউন ফিউন্যারেল।”
মুরারি বেশ উঁচু গলায় হেসে উঠল। তার হাসির শব্দে আশপাশের টেবিল থেকে অন্যরা তাকে লক্ষ্য করতে লাগল। মুরারি কেদারকে বলল, “তোর ফিউন্যারেলই বটে।”
“ঠাট্টা কোরো না ভাই,” কেদার বলল, “আমার এখন সেই অবস্থা।”
মুরারিকে উঠতে হল। কেদারও উঠে দাঁড়াল।
চেয়ার ছেড়ে যাবার সময় মুরারি পাশের সহকর্মীকে বলল, “প্রণব আমি একটু আসছি ; মিনিট কুড়ি।”
ঘর থেকে বেরিয়ে প্যাসেজ দিয়ে আসতে আসতে কেদার বলল, “মানসীদের সেক্শন ইনচার্জটা মহা হারামি ; ও বেটা সেক্শনের মেয়েদের নাড়িনক্ষত্রের খবর রাখে, শালা আমায় দেখেছে দু-চার বার, মানসীদের পাড়ার কাছাকাছিই থাকে, বুঝলি না। মানসী স্পটেড হতে চায় না, ভয় পায়। না হলে আমি নিজে গিয়েই স্ট্রেট্ ডাকতে পারতাম।”
মুরারি হাসিমুখে জবাব দিল, “তোমার মানসী ভাই তুমিই জানো। তবে ওদের বড়বাবু আমাকেই না দাগী করে দেয়।”
‘য়াঃ যাঃ, তোকে কী করবে? তোর ক্যারেকটারই আলাদা। তুই হলি মিস্টার ক্যারেকটার। জাস্ট লাইক মিস্টার ইউনিভার্স। এ সব ব্যাপারে পার্টি দেখলেই চেনা যায়। তুই সে-রকম পার্টি নয়, নট্ ইন্ দিস কেস।”
সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় আরও কটা কথা হল। তারপর রাস্তা। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কেদার তার মনের উচাটন অবস্থাটাকে বোঝাতে লাগল, আসানসোলে গিয়ে পর্যন্ত তার খাওয়াদাওয়া ঘুম সুখ স্বস্তি সবই গিয়েছে ; নিদারুণ অবস্থা, এক মুহূর্তও থাকতে ইচ্ছে করে না। দারুণ অগ্নিবাণে দিন কাটছে।
“চিঠি-ফিটি লিখিস না?” মুরারি জিজ্ঞেস করল।
“কোথায় লিখব? অ্যাড্রেস কী? মানসীদের বাড়ির ঠিকানায় চিঠি লেখা চলে না, সেখানে ওর মনুমার্কা বাপ, তেমনি একখানা ফায়ারিং মা। অফিসের ঠিকানায় চিঠি লিখলে হাওয়া হয়ে যাবে, দু-চারটে পাজি টাইপের ছেলে আছে। বুঝলি মুরারি, মেয়ে দেখলেই কাটা ঘুড়ির মতন লটকে নিতে চায়। বলেছিলুম কোনো বন্ধুর ঠিকানা দিতে, তাও দেবে না, লজ্জা করে, ভয় করে। মেয়েদের মাইরি সব ব্যাপারে লজ্জা আর ভয়। মেজাজ খারাপ করে দেয়।…”
“তা মানসী তো তোকে চিঠি লিখতে পারে!”
“গোটা দুয়েক দিয়েছে। দূর, ওর দ্বারা চিঠি লেখা হবে না। এ সব কলাবিদ্যা ওর জানা নেই। ড্রাই মার্কা চিঠি লেখে, যেন শালা রেল অফিসের বাঁধাগত কয়েক লাইন লিখে ক্লেম রিপোর্ট ফেরত দিচ্ছে। থার্ড ক্লাস।”
লালদিঘি দিয়ে শর্টকাট করে এগিয়ে যাবার সময় কেদার বলল, “আজ আমি একটা ফাইন্যাল করে ফেলব। এই ছুটোছুটি আর ভাল লাগে না। আমি ডিটারমিন্ড হয়ে এসেছি, আজ একটা ডিসিশন চাই, ইয়েস অর নো। তুই ভাই একটু প্রেসার দিবি।”
মুরারি ট্যারা চোখে বন্ধুর দিকে তাকাল, বলল, “তোর মানসী, আমার প্রেসার দেওয়াটা কি উচিত হবে?”
কেদার প্রথমটায় ধরতে পারেনি। পরে বুঝে ফেলল। হেসে উঠে বন্ধুর কাঁধে ধাক্কা দিল, “যাঃ শালা, কী বলিস?”
মানসীর অফিস কাছেই, কয়লাঘাটায়। মুরারিকে কেদারের পাল্লায় পড়ে অনেকবারই আসা-যাওয়া করতে হয়েছে। চেনাশোনাও দু চারজন আছে মুরারির। এখান ওখান দিয়ে পথ করে গলে গিয়ে, হই-হল্লা শুনতে শুনতে কাগজপত্রের গন্ধের মধ্যে দিয়ে দোতলায় চলে এল মুরারি। মানসীদের বসবার ঘরের গায়ে-গায়ে বিরাট করিডোর, মোটামুটি ফাঁকা। কেদার ঘরে ঢুকল না, করিডোরের এক প্রান্তে নিরিবিলি দেখে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে লাগল। মুরারি ঘরে ঢুকে গেল।
খানিকটা পরে মানসীকে দেখা গেল, তার পিছনে পিছনে মুরারি। কেদার চোখ মুখ ভয়ঙ্কর গম্ভীর করে তাকিয়ে থাকল।
মানসীকে দেখলেই মনে হয়, শান্ত লাজুক ধরনের মেয়ে। রোগাটে চেহারা, গায়ের রঙ ফরসা, ছোটখাট মুখ, মাথাতেও মোটামুটি। সুন্দরী না হলেও সুশ্রী। ঘাড়ে মস্ত বিনুনি দুলছে, শাড়ির রঙটা কমলা, হাতে সরু সরু বালা।
মুরারি মানসীকে কেদারের কাছে পৌঁছে দিয়ে বলল, “তোরা কথা বল, আমি যাই।”
কেদার মাথা নেড়ে বলল, “না না তুই থাক। তোর সঙ্গে দরকার আছে।”
“আবার কি দরকার?”
“আছে, ইম্পর্টেন্ট কথা আছে, তুই একটু ওয়েট কর কোথাও।”
মানসী একবার কেদারের মুখের দিকে তাকাল, তারপর মুরারির দিকে। অগত্যা মুরারি এক মুহূর্ত ভেবে বলল, “আমি তা হলে একজনের খোঁজ নিয়ে আসছি, মিনিট দশ পনেরো দেরি হবে।”
মুরারি চলে যাবার সময় মানসীকে একবার দেখল, কেদারের কাছাকাছি মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রেম তরঙ্গের এও এক রঙ্গ। তার হাসি পাচ্ছিল।
আর-এক বন্ধুর সঙ্গে সামান্য আড্ডা মেরে ফিরে এসে মুরারি দেখল, কেদার আর মানসীর মধ্যে একটা প্রচণ্ডরকম অশান্তি চলছে। কেদার ভীষণভাবে হাত পা ছুঁড়ছে, মাথা নাড়ছে, আর মানসী যেন কিছু একটা বোঝাবার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে।
মুরারি দেখতে পেয়েই মানসী তর তর করে এগিয়ে এল। তার চোখ মুখ বেশ ব্যাকুল, শুকনো, খানিকটা যেন ভীত।
কাছে এসেই মানসী করুণভাবে বলল, “আপনি ওকে একটু বোঝান তো। কেমন পাগলামি করছে!”
মুরারি কেদারের দিকে তাকাল। কেদার উঁচু আলসেয় হেলান দিয়ে বেঁকে নাটকের নায়কের মতন দাঁড়িয়ে আছে।
