শম্ভু হালদার তাঁর দলবল নিয়ে উঠে এলেন মঞ্চে। দলে পুরনোরা প্রায় সবাই, নতুন আরও দু-তিনজন। হারমোনিয়াম মেরামত হয়ে গিয়েছে। ডুগি-তবলা অবশ্য নেই। তার বদলে একটা ঢাক নিয়ে নেমেছেন তারক পালিত। মৃদঙ্গ, খঞ্জনি, কাঁসর-ঘণ্টা সবই রয়েছে।
পাশাপাশি দাঁড়ালেন সবাই। শম্ভু হালদার থিয়েটারি কায়দায় নমস্কার জানিয়ে বললেন, “আমাদের এই গানটি অনেক পুরনো। একালে তেমন শোনা যায় না। আমরা ছেলেবেলায় দু-চারবার শুনেছি। বিখ্যাত এই গানটি আমি এঁদের নিয়ে গাইব। সুর তাল নিয়ে আপনারা ভাববেন না। সুরে কী যায় আসে, প্রাণই তো আসল! আমরা প্রাণমন ভরে গাইব। নেচে নেচে। আপনারাও আমাদের সঙ্গে গাইতে পারেন। তবে নাচতে যাবেন না। চেয়ারে পা লেগে পড়ে গিয়ে বুড়ো বয়েসে হাত-পা-কোমর ভাঙতে পারেন। শুরু করছি। নাও হে হারমোনিয়াম ধরো, মৃদঙ্গ রেডি, নাও হে তারক, বোল দাও।”
বোল উঠল। মৃদঙ্গও বাজল। কাঁসর ঘন্টা। খঞ্জনি।
শম্ভু গলা ছেড়ে গান ধরলেন, “আর যে কদিন আছিস বেঁচে ওরে মন, হরিনাম নিতে ভুলিস না।/ একলা এসেছিস একলা যেতে হবে সঙ্গে তো কেউ যাবে না।”
গানের সঙ্গে সঙ্গে নাচ। একেবারে উর্ধববাহু হয়ে। দশ বারো জনের গলা এবং নাচের চোটে মঞ্চ কাঁপতে লাগল।
মণ্ডপে অট্টরোল। কেদারহরিও নীচে দাঁড়িয়ে নাচতে শুরু করেছেন।
শম্ভুর তখন হুঁশ নেই। গেয়ে চলেছেন, “বাল্যকালে খেলা করে কাটালে/ যৌবনে কামিনী ছাড়লে / বুড়ো হয়েও তবু টাকা টাকা টাকা/ টাকাগুলি তোমার ঘুচলো না…/তাই বলি ওরে মন… যে কটা দিন আছিস বেঁচে হরিনাম নিতে ভুলিস না…।”
গানের তাণ্ডবের মধ্যেই হাততালি, তুবড়ি, পটকা চলতে লাগল। সে-এক মহাদৃশ্য। মৃদঙ্গ ঢোল দুইই ফেঁসে গেল।
গান শেষ হল।
সব যখন প্রায় শান্ত, উদয় ঘোষ বললেন, “এবার আমাদের সজ্জন মণ্ডলের সভাপতি শ্রী জয়গোপাল মিত্র দুটি কথা বলবেন। তারপর সভা শেষ।”
জয়গোপাল একসময় আদালত কাঁপিয়ে দেওয়ানি ফৌজদারি দুই মামলাই লড়েছেন। তাঁর গলা বুজে আসার কোনও কারণ ছিল না। তবু আজ বৃদ্ধের গলা বুজে আসছিল। কোনও রকমে বললেন, “তোমরা আমার কনিষ্ঠ। তুমি করেই বলছি। আজকের দিনটি আমার জীবনে হয়ত আর ফিরে আসবে না। তোমাদের সকলকে আমার আশীর্বাদ আর শুভেচ্ছা জানাই। তোমাদের যেন মঙ্গল হয়।…একটা কথা বলি। উদয় না থাকলে, এমন একটা অনুষ্ঠান হত না। তাকে বাহবা দিতে হবে।…আমার শেষ কথা হল, অখিলমাস্টার যা বলল— প্রায় তাই। একই। দেখো ভাই, জীবন হল সত্যিই এক বস্ত্রের মতন। আমাদের পরনে রয়েছে। এখানে ধুলোময়লা লাগবে, নোংরা হবে, তা বলে জীবন তো ফেলে দেবার নয়! যা মন্দ, যা ময়লা, তা যতটা পারা যায় সাফসুফ করে নিয়ে বাঁচতে হবে। তোমরা সেই ভাবেই বাঁচো, ঈশ্বরের চরণে আমার তাই প্রার্থনা।” বলতে বলতে থামলেন জয়গোপাল। চোখে পড়ল, মঞ্চের পঞ্চাশটি প্রদীপের অনেকগুলিই নিবে গিয়েছে। বাকিগুলোও প্রায় নিবে এল।
জয়গোপাল একটু যেন হাসলেন নিজের মনে।
সভা ভঙ্গ হল। বাইরে তখন শেষ কার্তিকের হিম পড়ছে।
র্যাটকিলার
ক্যানটিন থেকে ফিরে এসে মুরারি দেখল, তার টেবিলের সামনে কেদার বসে আছে। কলকাতায় শীত নেই, শীতের ধুলোটুকুই পড়ে আছে। কেদারের গায়ে তবু করকরে জহরকোট, গলায় মাফলার, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। কেদার বেশ অধৈর্য হয়ে অপেক্ষা করছিল। তার চোখ মুখ ময়লা, মাথার চুল উস্কোখুস্কো, রুক্ষ।
মুরারি বলল, “কিরে? তুই?”
কেদার বিরক্ত হয়ে বলল, “কোথায় গিয়েছিলি? কখন থেকে বসে আছি।”
চেয়ার টেনে বসতে বসতে মুরারি বলল, “ক্যানটিনে।”
কেদার কেমন আক্ষেপের মুখ করে বলল, “তোদের রাইটার্সে গভর্নমেন্ট যে কত বেকার-ভাতা দেয়!” বলে মুরারির আশপাশের টেবিলের দিকে তাকাল।
বেকার-ভাতা কথাটায় মুরারি হেসে ফেলল। “চা খাবি?”
“না না, এখন চা-ফা নয়। নে নে ওঠ্…অনেক লেট হয়ে গেল।”
মুরারি ইচ্ছে করেই টেবিলের ওপর রাখা কাগজপত্র টানতে লাগল, যেন তার অনেক কাজ, এখন আর ওঠার সময় নেই। সিগারেটের প্যাকেটটা কেদারের দিকে এগিয়ে দিল, অর্থাৎ কেদার বসে বসে সিগারেট খেতে পারে কিন্তু মুরারি এখন উঠতে পারবে না।
কেদার মুরারির ভাবভঙ্গি দেখে আরও অধৈর্য হয়ে বলল, “কী রে, ওঠ।”
“এখন কী করে উঠি, অনেক কাজ,” মুরারি নিরীহের মতন মুখ করে জবাব দিল।
“যা যা, কাজফাজ রেখে দে, তোদের রাইটার্সে আবার কাজ, নে নে উঠে পড় ; তিনটে বাজতে চলল, গিয়ে হয়ত দেখব, ও কেটে পড়েছে।”
মুরারি বেশ আরাম করে একমুখ ধোঁয়া টেনে নিয়ে তারপর আস্তে আস্তে নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া বার করতে করতে বলল, “তোমার ও তুমি বোঝ, আমার কী?”
কেদার দু মুহূর্ত বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “যাঃ, এ রকম করিস না। আমি শালা আসানসোল থেকে কত ঝামেলা করে আসছি, কী রকম হেলপ্লেস্। মাইন্ডের কী অবস্থা, আর তুই মাইরি আমায় স্ট্রেট্ কাটিয়ে দিচ্ছিস।”
মুরারি হেসে ফেলল। কেদার কেন এসেছে, তার এত ব্যস্ততা কিসের, ওর মাইন্ডের অবস্থাটাই-বা কেমন—কিছুই মুরারির অজানা নয়। তবু কেদারকে আরও একটু জব্দ করার জন্যে মুরারি বলল, “দেখো যাদু, তুমি করবে প্রেম; আর আমি গিয়ে তোমার ইয়েকে ডেকে দেব—তা হয় না। ইট্ ইজ্ ইওর বিজনেস… !”
